ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যেই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য সামরিক শক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এমনটাই জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ।
পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতি, বিশ্ব বাণিজ্য ও নিরাপত্তাসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা খনিজ সমৃদ্ধ দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিক যুক্তরাষ্ট্র- যেকোন মূল্যে এমনটা চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব সরকার দুই পক্ষই দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের জনগণ তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
কিন্তু গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজ জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দাবি করছে, ডেনমার্কের অধীন আধা-স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটি অধিগ্রহণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অগ্রাধিকার। রয়টার্সের খবর।
হোয়াইট হাউজের এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন ইউরোপের একাধিক দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করেছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প আবার দাবি করেছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকার দিকের আর্কটিক সাগর এবং উত্তর আটলান্টিকের দিকে আরো অগ্রসর হতে পারবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের জবাবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে জানান, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও আক্রমণ হলে তা ন্যাটো জোটের সমাপ্তি ডেকে আনবে।
এদিকে, হোয়াইট হাউজ আরও জানায়, প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসন এই গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন। কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহারও সব সময় একটি বিকল্প হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও ডেনমার্ক দেশের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড শুধু ডেনমার্কের জনগণের এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ছাড়া অন্য কেউ তাদের সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
তাদের ভাষ্য, ন্যাটোর কাঠামোর মাধ্যমে যৌথভাবে আর্কটিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং জাতিসংঘ সনদের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত অখণ্ডতার নীতির ওপর জোর দিতে হবে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন যৌথ বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান রেখে সম্মানজনক সংলাপ হওয়া জরুরি।
প্রসঙ্গত,২০১৮ সালে, চীন এই অঞ্চলে আরও প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে নিজেকে "আর্কটিকের কাছাকাছি একটি রাষ্ট্র" হিসাবে ঘোষণা করে। চীন তার বৈশ্বিক বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে "পোলার সিল্ক রোড" নির্মাণের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরি করেছে।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও চীনের সেই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন: "আমরা কি চাই যে, আর্কটিক মহাসাগর সামরিকীকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক দাবিতে পরিপূর্ণ একটি নতুন দক্ষিণ চীন সাগরে রূপান্তরিত হোক?"
এছাড়াও ইতোমধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা, ডেনমার্ক এবং নরওয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে রাশিয়া আর্কটিকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। মস্কো মেরু অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টাও করেছে, সেখানে দেশটির উত্তর নৌবহর অবস্থিত। এখানেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছিল।
রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রয়োজন হলে পরীক্ষা পুনরায় শুরু করার জন্য সাইটটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটিও যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য এত মরিয়া হওয়ার নেপথ্যে একটি বড় কারণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ান সামরিক বাহিনী আর্কটিক অঞ্চলে পুরনো সোভিয়েত অবকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং নতুন সুযোগ-সুবিধা নির্মাণ করছে। ২০১৪ সাল থেকে, রাশিয়ান সামরিক বাহিনী আর্কটিক অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি খুলেছে এবং বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণের কাজ করছে।
উপরন্তু, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রায় আক্রমণের পর ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। গত বছর, ভ্লাদিমির পুতিন উল্লেখ করেছিলেন যে, রাশিয়া আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর কার্যকলাপ নিয়ে তিনি চিন্তিত। এবং সেখানে তার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা জোরদার করে তিনি পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাবেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসনের কোনও পরিকল্পনা নেই।
সুলতানা দিনা/