গত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়া চলমান বিক্ষোভে যখন বিক্ষোভকারীরা ইরানের রাস্তায় নেমেছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে দাবি করেছেন যে তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘সাহায্য’ করতে চান।
গত শনিবার তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে লিখেছেন: ‘‘ইরান স্বাধীনতার দিকে তাকাচ্ছে, সম্ভবত আগের চেয়ে বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত!!!’’ পরবর্তীকালে অন্যান্য জনসমক্ষ বিবৃতিতে তিনি এই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি করেছেন।
তবে ইরানীদের সাহায্য করার এই দাবির আড়ালে একটি সত্যকে উপেক্ষা করা হচ্ছে: ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনৈতিক সংকটে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে, যা বর্তমান বিক্ষোভের প্রাথমিক কারণ। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ট্রাম্পের অধীনে কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলোও অন্তর্ভুক্ত।
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এবং সে দেশে সাহায্যের নামে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত দেখে নেওয়া যাক
ইরানে কী ঘটছে?
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়, যখন মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান রেকর্ড পরিমাণ কমে যায়। ক্রমবর্ধমান দামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দোকানদাররা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। এই বিক্ষোভ তখন থেকে অন্যান্য প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশের নেতৃত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
গত সোমবার প্রতি মার্কিন ডলার ১৪ লাখ ইরানি রিয়ালেরও বেশি দরে লেনদেন হচ্ছিল, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৭ লাখ এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৯ লাখ ছিল। মুদ্রার এই পতন তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছে, যেখানে খাদ্যমূল্য গত বছরের তুলনায় গড়ে ৭২ শতাংশ বেশি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো কী কী?
ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী নির্বাসন থেকে ফেরার পর ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে ইরানি ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে আমেরিকানদের জিম্মি করার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব সম্রাট মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করেছিল। এছাড়া ১৯৫৩ সালে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য করেছিল।
১৯৭৯ সালেই ওয়াশিংটন ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দেয় এবং ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ জব্দ করে। ছোট উপহার বা কার্পেট ছাড়া সব ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মার্কিন কোম্পানিগুলোর ইরানের তেল-গ্যাস এবং বাণিজ্যে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করেন। ১৯৯৬ সালে কংগ্রেস আইন পাস করে যে, কোনো বিদেশি কোম্পানি বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করলে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
২০০৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পরমাণু শক্তি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০১২ সালের পর থেকে ইইউ এবং অন্যান্য দেশও এতে যোগ দেয়। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান এবং পুনরায় সব ধরণের কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ আবারও পরমাণু কর্মসূচির কারণে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেয়।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইরানের ওপর কীভাবে পড়েছে?
আয়: বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ইরানের মাথাপিছু জিডিপি (GDP) ছিল ৮ হাজার ডলারের বেশি, যা ২০১৭ সালে কমে ৬ হাজার ডলার এবং ২০২৪ সালে ৫ হাজার ডলারের একটু ওপরে নেমে আসে।
তেল রপ্তানি: ২০১৮ সালের পর ইরানের তেল রপ্তানি ৬০-৮০ শতাংশ কমে গেছে, যা সরকারকে কয়েক দশ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছে। ২০২০ সালে রপ্তানি দিনে মাত্র ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছিল।
মুদ্রার মান: মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আগে ১ ডলারে কয়েক দশ হাজার রিয়াল পাওয়া যেত, যা এখন বেড়ে ১৪ লাখে (১.৪ মিলিয়ন) দাঁড়িয়েছে। এতে আমদানি খরচ বেড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি তুঙ্গে পৌঁছেছে।
বিমান চলাচল: ১৯৭৯ সাল থেকে নতুন বিমান আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিমান খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিমান দুর্ঘটনায় ২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে।
দুর্নীতি: নিষেধাজ্ঞার কারণে একটি ‘নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতি’ তৈরি হয়েছে যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কালোবাজারি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মুনাফা লুটছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে।
মানুষের ওপর এর প্রভাব কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের মধ্যবিত্ত এবং সাধারণ মানুষ এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় শিকার। গবেষক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগানের মতে, নিষেধাজ্ঞার কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়েছে। রিয়ালের পতনের ফলে শিক্ষক বা সরকারি কর্মচারীদের মতো নির্দিষ্ট বেতনের কর্মীরা দারিদ্র্যের নিচে নেমে গেছেন।
এছাড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে ওষুধের দাম ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সংকট তৈরি করেছে। পরিবেশের ওপরও প্রভাব পড়েছে; নিষেধাজ্ঞার ফলে উন্নত মানের জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তির উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেহরানের মতো শহরগুলোতে বায়ুদূষণ বেড়েছে, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোতে গড় আয়ু ১.২ থেকে ১.৪ বছর কমে যায়। ১৯৭০ সাল থেকে মার্কিন ও ইইউ নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/