ভারতের আসাম রাজ্যে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার পর দেশজুড়ে তীব্র নিন্দা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা মুসলিমদের ছবির দিকে গুলি ছুড়ছেন। ভিডিওতে ইংরেজিতে লেখা ছিল— “Why did you not go to Pakistan?” অর্থাৎ, ‘তোমরা কেন পাকিস্তানে চলে যাও না?’
স্থানীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে আসামে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মুসলিম বসবাস করেন।
‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট’ শিরোনামে পোস্ট, পরে মুছে ফেলা হয়
১৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট’ শিরোনামে শেয়ার করা হয়েছিল। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়লে ব্যাপক জনরোষ এবং বিরোধী নেতাদের সমালোচনার মুখে তা ডিলিট করে দেওয়া হয়।
ভিডিওটিতে মুখ্যমন্ত্রী শর্মার রাইফেল চালানোর একটি বাস্তব ফুটেজের সঙ্গে এআই-প্রসূত ছবি যুক্ত করা হয়েছিল। সেখানে তাকে ‘নো মার্সি’ (কোনো ক্ষমা নেই) শিরোনামের নিচে দু’জন মুসলিম ব্যক্তির ছবির দিকে গুলি করতে দেখা যায়।
নির্বাচনের আগে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণার অভিযোগ
আগামী মার্চ বা এপ্রিল মাসে আসামে রাজ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদেশি-বিদ্বেষী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভিডিওতে থাকা ছবির একজন ব্যক্তি বিরোধী দল কংগ্রেসের একজন সংসদ সদস্য। একই ভিডিওতে শর্মাকে কাউবয় পোশাকে পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা যায়, যেখানে লেখা ছিল— ‘বিদেশিমুক্ত আসাম’।
বিজেপির আনুষ্ঠানিক মন্তব্য নেই
ভিডিওটি নিয়ে আসাম বিজেপির বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠলেও দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। স্থানীয় বিজেপি নেতা রঞ্জিব কুমার শর্মা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেন, “কোনো মন্তব্য নেই। এটি ডিলিট করা হয়েছে, তাই বলার কিছু নেই।”
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শর্মার বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের বিরুদ্ধে বক্তব্য আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি তাদের অপরাধ ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে গত মাসে আসামবাসীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে তারা ‘মিঞা মুসলিম’—(বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের প্রতি ব্যবহৃত অবমাননাকর শব্দ)—দের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।
তিনি বলেছিলেন, “ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন, যেমন রিকশা ভাড়া কম দেওয়া। তারা যদি ৫ টাকা চায়, ৪ টাকা দিন। কষ্টে পড়লেই তারা আসাম ছাড়বে।”
আগেও এআই ভিডিও প্রকাশ করেছিল বিজেপি
এর আগে গত সেপ্টেম্বরেও আসাম বিজেপি ‘বিজেপি ছাড়া আসাম’ শিরোনামে একটি এআই ভিডিও প্রকাশ করেছিল। সেখানে দাবি করা হয়, রাজ্যটি মুসলিমরা দখল করে নিয়েছে এবং তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
ভারতের মধ্যে কেবল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল কাশ্মীর ও লাক্ষাদ্বীপেই আসামের তুলনায় বেশি শতাংশ মুসলিম বসবাস করেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও অনেক মুসলিমকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত জুলাইয়ে জানিয়েছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত বাঙালি মুসলিমকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কংগ্রেসের অভিযোগ: সহিংসতায় উসকানি
আসামের কংগ্রেস নেতা আমান ওয়াদুদ ভিডিওটিকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “বিজেপি বারবার প্রমাণ করছে, আইন বা সাধারণ সৌজন্যের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। এটি তাদের মরিয়া অবস্থাও প্রকাশ করে। আসামের সচেতন মানুষ এই ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি পরাজিত করতে প্রস্তুত।”
কংগ্রেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভিডিওটি গণহত্যা এবং ব্যাপক সহিংসতার উসকানির শামিল। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন তুলেছেন— বিচার বিভাগ জেগে ওঠার জন্য এই লোকটির আর কী করা বাকি আছে?
ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ বৃদ্ধির অভিযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, আসামে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব এমন এক সময়ে আরও বেড়েছে, যখন ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের প্রায় ১৪ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজেপির এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ চলমান। বিজেপির আদর্শে মুসলিমদের প্রায়ই ‘বহিরাগত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বাংলাদেশ ও মায়ানমার থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে টার্গেট করা হয়।
২০১৯ সালে ভারত নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান যুক্ত করে, যেখানে মুসলিমদের বাদ রাখা হয়েছে।
এছাড়া ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে গরুর মাংস খাওয়া বা গরু পরিবহনের সন্দেহে ডজনখানেক মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সহিংসতা বহুগুণ বেড়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া হেট ল্যাব জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতে ১ হাজার ৩১৮টি ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার ৯৮ শতাংশই মুসলিমদের লক্ষ্য করে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও নির্বাচনি প্রচারণায় মুসলিমদের নিয়ে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে সেখানকার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একসময় মোদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল। ওই দাঙ্গায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই মুসলিম ছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মোদি একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/