ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব দেখা যাচ্ছে বর্তমানে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, জাপানসহ অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে পারাপারে নৌ-সহযোগিতা দিতে আহ্বান জানান।
ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালালেও হোয়াইট হাউস পরবর্তী পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে। ইরানের সামনে সরাসরি সামরিকভাবে পাল্টা আঘাতের সুযোগ সীমিত থাকলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, তার মিত্র দেশগুলো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা পশ্চিমাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
ইরান দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি আশঙ্কা করেছিলেন যে তাকে ও শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হতে পারে। তাই তিনি উত্তরসূরি নির্ধারণে একাধিক স্তরের পরিকল্পনা করে রাখার জন্য অধস্তনদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দুই সপ্তাহের বোমা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে হুমকি পুরোপুরি দূর করা যায়নি। লয়েডস লিস্ট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৬টি জাহাজে হামলা হয়েছে। ফলে তেলবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
প্রায় ১০ দিন আগে ট্রাম্প ট্যাংকার মালিকদের ‘সাহস দেখাতে’ বলেছিলেন এবং যাত্রা অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তবে মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই সরাসরি এগিয়ে দিতে আগ্রহী ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সহজেই দূর থেকে আঘাত হানতে পারায় সরাসরি ঝুঁকি নিতে চাইছে না। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত সপ্তাহে বলেন, আরও কিছু বিমান হামলার পর মাসের শেষ নাগাদ মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাংকারগুলোকে দিতে সক্ষম হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে ইরানের হাতে ছোট আকারের বিভিন্ন হামলার কৌশল রয়েছে। যেমন: ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের স্পিডবোট, ড্রোন এবং প্রায় ৫ হাজার সমুদ্র মাইন।
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ইরান সমুদ্র ড্রোন ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সফল হচ্ছে। এগুলো চালকবিহীন নৌযান, যা স্পিডবোটের মতো দেখতে। গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের একটি জাহাজ এতে আঘাত পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প মূলত সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন এবং ইসরায়েল ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সমন্বয়ে আগ্রহী ছিলেন না। ফলে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কোনো নৌ প্রস্তুতি ছিল না। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন বা জাপানের কোনো যুদ্ধজাহাজই এসকর্ট মিশনের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর এসকর্ট অপারেশন চালাতে ৮ থেকে ১০টি ডেস্ট্রয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এতেও প্রতিদিন মাত্র ৫ থেকে ১০টি জাহাজ নিরাপদে পারাপার নিশ্চিত করা সম্ভব, যা যুদ্ধের আগের মোট বাণিজ্যিক চলাচলের প্রায় ১০ শতাংশ।
এদিকে ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া খুবই সীমিত। জাপান জানিয়েছে, তারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পায়নি। চীনও কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। ফলে ট্রাম্পের বেইজিং সফর পিছিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সপ্তাহান্তে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটো মিত্রদের এতে অংশ নেওয়া উচিত। তিনি সতর্ক করেন, তারা সাহায্য না করলে জোটের ভবিষ্যৎ ‘খুব খারাপ’ হতে পারে। যদিও ন্যাটোর কার্যপরিধি মূলত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সীমাবদ্ধ এবং এর আগে যুক্তরাষ্ট্রই ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তায় মনোযোগ দিতে বলেছিল।
ফ্রান্স পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আটটি যুদ্ধজাহাজ পাঠালেও জানিয়েছে, তীব্র লড়াই চলাকালীন তারা হরমুজ প্রণালিতে যাবে না। যুক্তরাজ্যও একটি ডেস্ট্রয়ার প্রস্তুত করতে হিমশিম খাচ্ছে এবং তড়িঘড়ি করে এইচএমএস ড্রাগনকে মেরামত শেষে মোতায়েন করেছে, যা সাইপ্রাসে পাঠানো হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সমালোচনার মুখে পড়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র যখন দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ প্রস্তুত করছিল, তখন তারা আগেভাগে অঞ্চলে কোনো যুদ্ধজাহাজ রাখেনি। রয়্যাল নেভি তখন এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসকে উত্তর আটলান্টিকে পাঠানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল, যা আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা মিশনের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত ছিল। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান