ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার যুদ্ধ এক ভয়াবহ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ওয়াশিংটনে এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক দিন এই যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণে ‘নির্ণায়ক’ ভূমিকা রাখবে।
তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, ইরান যদি অবিলম্বে শান্তি চুক্তিতে না আসে, তবে এই সংঘাত আরও বহুগুণ তীব্রতর হবে।
মার্কিন এই হুমকির পরপরই পাল্টা কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি)। তারা ঘোষণা করেছে যে, বুধবার (১ এপ্রিল) থেকে ইরানে হামলার প্রতিশোধ নিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। তেহরানের তালিকায় মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল, ইন্টেল, আইবিএম, টেসলা এবং বোয়িং-এর মতো ১৮টি বড় প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
এদিকে, পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দুবাই উপকূলের কাছে সৌদি ও কুয়েতি তেলবাহী একটি বিশাল ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ‘আল-সালমি’ নামক ওই ট্যাংকারটিতে ১২ লাখ ব্যারেল সৌদি এবং ৮ লাখ ব্যারেল কুয়েতি অপরিশোধিত তেল ছিল, যা চীনের দিকে যাচ্ছিল। যদিও দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, তবে এই হামলার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ৪.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৮ ডলার ছাড়িয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। গতকার সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় খুচরা মূল্য গত তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গ্যালন প্রতি ৪ ডলার অতিক্রম করেছে। রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে থাকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয় এবং চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে দেশটির বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তেল শোধনাগারগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত এক মাসে মার্কিন হামলায় ইরানের অন্তত ১৫০টি নৌযান এবং অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। মার্কিন জেনারেল ড্যান কেইন দাবি করেছেন, লাগাতার হামলার ফলে ইরানি বাহিনীতে ব্যাপক দলত্যাগের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং প্রয়োজনে স্থল অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত ‘৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন’-এর হাজার হাজার সৈন্য ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধ এখন আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে তুরস্ক ও ইয়েমেনের দিকেও মোড় নিচ্ছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলে আক্রমণ শুরু করেছে এবং ইরান থেকে উৎক্ষিপ্ত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে তা গুলি করে নামানো হয়। লেবানন সীমান্তেও হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে, যেখানে চার ইসরায়েলি সৈন্য এবং তিন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে চীন ও পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও ইরান এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রস্তাবগুলোকে ‘অবাস্তব ও অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
তেহরানের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়লেও তাদের অনড় অবস্থান এবং মার্কিন আইটি ও এভিয়েশন জায়ান্টদের ওপর হামলার হুমকি পুরো বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সূত্র: রয়টার্স
মাহফুজ/