ভারতের রাজনীতির অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গে (বৃহস্পতিবার) শুরু হচ্ছে ২৯৪ আসনবিশিষ্ট বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট গ্রহণ।
প্রথম দফায় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ১৫২টি আসনে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এবারের নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূলের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।
নির্বাচনে বিজেপি জিতলে বর্তমান বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। তাই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের মসনদে আবারও কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বসবেন, নাকি বিরোধী দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে বিজেপি প্রথমবার নবান্ন দখল করবে–এই প্রশ্নই এখন পশ্চিমবঙ্গের অলিগলি থেকে দিল্লির দরবার পর্যন্ত ঘুরপাক খাচ্ছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে যেমন হ্যাটট্রিক পরবর্তী ক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, তেমনি নরেন্দ্র মোদির কাছে এটি সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারী নিজেকে বিজেপির পক্ষ থেকে ছায়া মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরায় লড়াইটি এখন ব্যক্তিগত স্তরেও পৌঁছেছে।
প্রথম দফা ভোটের গুরুত্ব
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচন হচ্ছে দুই দফায়। প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোট নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের একাংশ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দফার এই ১৫২টি আসনই নির্ধারণ করে দেবে আগামীর ঝোড়ো হাওয়ার অভিমুখ।
২০২১ সালের ফলাফল
এবারের নির্বাচনের সমীকরণ বুঝতে হলে ২০২১ সালের ফলাফলকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা প্রয়োজন। সেবার ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৫টি আসনে বিশাল জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। অন্যদিকে, বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে গত পাঁচ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা তৃণমূলের জন্য কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও মমতার জনমোহিনী প্রকল্পগুলো এখনো তার বড় শক্তি।
ভোটের জরিপ কী বলছে?
বিভিন্ন জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে তীব্র হবে, তা স্পষ্ট। কিছু জরিপে বলা হয়েছে, তৃণমূল ভোট পেতে পারে প্রায় ৪১-৪৩ শতাংশ এবং বিজেপি পেতে পারে ৩৪-৪১ শতাংশ। আসন পূর্বাভাস অনুযায়ী তৃণমূল ১৮৪ থেকে ১৯৪টি আসন পেতে পারে, যেখানে বিজেপি পেতে পারে ৯৮ থেকে ১০৮টি আসন। ফলে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তৃণমূলের সামনে।
মুখ্যমন্ত্রী পদে পছন্দের নিরিখেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৬-৪৮ শতাংশ মানুষ তাকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, যেখানে শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থন ৩৩-৩৫ শতাংশের মধ্যে।
ভারতের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সমীক্ষক সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের লড়াই গতবারের চেয়েও বেশি ‘হাড্ডাহাড্ডি’ হবে। জরিপগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে তিনটি মূল বিষয় উঠে আসে–
১. মমতার ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বনাম বিজেপির ‘পরিবর্তন’
নারীদের ভোট মমতার সবচেয়ে বড় ঢাল। জরিপে দেখা গেছে, গ্রামের মহিলা ভোটারদের একটি বড় অংশ তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ওপর আস্থাশীল। বিপরীতে, বিজেপি কর্মসংস্থান এবং রাজ্যে বিনিয়োগের অভাবকে হাতিয়ার করে পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে।
২. শুভেন্দু ফ্যাক্টর
বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী গত কয়েক বছরে নিজের ভিত্তি মজবুত করেছেন। বিশেষ করে মেদিনীপুর এবং জঙ্গলমহল এলাকায় তার ব্যক্তিগত প্রভাব বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
৩. বাম-কংগ্রেসের ভোটব্যাংক
গতবার বাম-কংগ্রেস কার্যত ধুয়ে-মুছে গেলেও এবার তারা কিছু আসনে ভোট বাড়াতে পারলে তা সরাসরি তৃণমূল বা বিজেপির জয়ের ব্যবধানে প্রভাব ফেলবে।
মমতা নাকি শুভেন্দু
বিজেপি এবার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা না করলেও শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরেই তাদের প্রচারণা আবর্তিত হচ্ছে। শুভেন্দু বারবার দাবি করছেন, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ না এলে বাংলার উন্নয়ন সম্ভব নয়। ডাবল ইঞ্জিন সরকার বলতে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারকে বলা হচ্ছে। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার রয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার হলে উন্নয়ন বেশি হবে বলে দাবি করেন শুভেন্দু। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল অস্ত্র ‘বাঙালিয়ানা’ এবং ‘বহিরাগত তত্ত্ব’। ‘এখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নিজেদের মেয়েকেই চায়, নাকি দিল্লির ইশারায় চলা প্রতিনিধিকে চায়–তার ফয়সালা হবে এই ভোটে।’ ফল জানা যাবে আগামী ৪ মে। তবে প্রথম দফার এই ১৫২ আসনের ট্রেন্ডই বলে দেবে নবান্নে কি ফিরবেন ‘দিদি’, নাকি শুভেন্দুর হাত ধরে পদ্মফুল ফুটবে বাংলায়–সে দিকেই তাকিয়ে গোটা ভারত।
এসএন/