শান্ত ও ছিমছাম শহর হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার টোরেন্সের বেশ সুনাম। স্থানীয়রা আদর করে এর নাম দিয়েছেন ‘বোর-অ্যান্স’, কারণ এখানে সচরাচর রোমাঞ্চকর বা চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটে না। কিন্তু গত শনিবারের একটি ঘটনা সেই নিস্তরঙ্গ জনপদকে মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টায় অভিযুক্ত ৩১ বছর বয়সী কোল থমাস অ্যালেন এই শহরেরই বাসিন্দা। প্রতিবেশী এক যুবকের এমন ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ায় এখন পুরো শহরজুড়ে আতঙ্ক আর বিস্ময় বিরাজ করছে।
অভিযুক্ত অ্যালেন তার বাবা-মায়ের সঙ্গে এই এলাকায় থাকতেন। শনিবারের সেই ঘটনার পর যখন গণমাধ্যমে তার হ্যান্ডকাফ পরা এবং মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ছবি দেখা যায়, তখন প্রতিবেশীরা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ভিন্স তেরাজিনো নামের এক প্রতিবেশী বলেন, ‘নিজের বাড়ির মাত্র দুই ব্লক দূরে এমন একজন মানুষ থাকে ভাবলেই অদ্ভুত লাগে।’ তার ১০ বছর বয়সী মেয়ে আলেসান্দ্রা কৌতূহলবশত এফবিআই এজেন্টদের কাছে খবরাখবর জানতে চাইলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
শনিবার রাতে অ্যালেনের গ্রেপ্তারের পর থেকেই টোরেন্সে শুরু হয় পুলিশের তৎপরতা। সারা রাত হেলিকপ্টারের শব্দে কারও চোখে ঘুম ছিল না। এফবিআই অ্যালেনের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। প্রতিবেশীরা জানান, অ্যালেনের পরিবার বেশ অমায়িক ছিল। সোমবার (২৭ এপ্রিল) অ্যালেনকে আদালতে তোলা হলেও তিনি এখনো কোনো স্বীকারোক্তি দেননি। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, অ্যালেন তার আত্মীয়দের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা লিখে পাঠিয়েছিলেন। ডিনারের নিরাপত্তা চৌকি ভেঙে ঢোকার সময় তার কাছে একটি সেমি অটোমেটিক হ্যান্ডগান, একটি শটগান এবং তিনটি ছুরি ছিল। নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট আহত হন।
কোল টোমাস অ্যালেনের বসবাসের শহর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের টরেন্স। ছবি: সংগৃহীত
অ্যালেন সম্পর্কে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা মিশ্র। কেউ বলছেন তিনি আইরিশ বারে যেতেন, আবার কেউ বলছেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত অন্তর্মুখী। একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন অ্যালেন। পাশের দোকানের কর্মী সেসিলিয়া পেরাল্টা জানান, অ্যালেন লাঞ্চের সময় একাকী খাবার খেতেন এবং কারও সঙ্গে চোখে চোখ রাখতেন না। সেসিলিয়ার ১১ বছর বয়সী মেয়েও তার কাছে পড়েছে। সেসিলিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আপনি জানেন না আপনার চারপাশে আসলে কারা আছে। এটি সত্যিই বড় এক ধাক্কা।’
অ্যালেনের অতীত ঘেঁটে জানা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালটেকে পড়াশোনা করেছেন। সেই সময় তিনি পাসাডেনা ইউনাইটেড রিফর্মড চার্চে যেতেন। চার্চের যাজক মভসেস জানবাজিয়ান তাকে শান্ত স্বভাবের ছাত্র হিসেবে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘অ্যালেন শুধু প্রার্থনার জন্য আসতেন এবং চলে যেতেন। ক্যালটেকের পড়াশোনার চাপ অনেক বেশি ছিল, তাই তিনি পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।’ অ্যালেনের রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে যাজক কিছু জানাতে পারেননি।
বর্তমানে অ্যালেনের বাড়ির সামনে গণমাধ্যমকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও পরিবারের কাউকে দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তল্লাশির পর তারা অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছেন। প্রতিবেশীরা এই পরিস্থিতির অবসান চান। একজন ক্ষুব্ধ প্রতিবেশী বলেন, ‘এই মানুষগুলোকে শান্তিতে থাকতে দিন।’ এরই মধ্যে এলাকাটি নিয়ে এক অদ্ভুত তথ্য দিলেন অন্য এক প্রতিবেশী। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, এই একই রাস্তায় অলিম্পিক দৌড়বিদ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক লুই জাম্পেরিনি একসময় থাকতেন। সেই বীরের পাড়ায় আজ একজন হামলাকারীর নাম চাউর হওয়ায় স্থানীয়দের মনে বিষণ্ণতা আর বিস্ময় যেন কাটছেই না। সূত্র: বিবিসি