ইউক্রেনের মিরোৎসকে গ্রামের কাছে, রাজধানী কিয়েভ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, একদল মাইন অপসারণকারী সারিবদ্ধভাবে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন। তারা হাতে ধরা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে জমি স্ক্যান করছেন। দৃশ্যটা অনেকটা যেন ধান কাটার সময় কাস্তে চালানোর মতো।
তাদের কাজ হলো বন ও মাঠকে নিরাপদ করা। কারণ চার বছর আগে রাশিয়ার দখলদারত্বের সময় এখানে পুঁতে রাখা মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ এখনো রয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের বিশাল এলাকা এসব বিপজ্জনক বিস্ফোরকে ভরে গেছে।
ডিমাইনিং সংস্থা হালো ট্রাস্টের মিডিয়া ম্যানেজার ওলেনা শুস্তোভা বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে ইউক্রেন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাইন আক্রান্ত দেশ। পুরো দেশকে মাইনমুক্ত করতে ১০ বছরের কম সময় লাগবে না।’
দুই বছর আগে কাছাকাছি একটি ইউনিটের এক ইউক্রেনীয় সেনা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি অ্যান্টি-পারসোনেল মাইনে পা দেন। সেই ঘটনার পরই হালো ট্রাস্ট এখানে মাইন অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে। এটি প্রমাণ করে, যুদ্ধক্ষেত্র অন্যত্র সরে গেলেও বিপদ থেকে যায়।
শুস্তোভা বলেন, ‘যেখানে যেখানে দখলদারত্ব ছিল, সেখানেই মাইনফিল্ড ও বিস্ফোরক রয়েছে।’ বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মাইন অপসারণ সংস্থা হালো ট্রাস্ট ইউক্রেনে ১ হাজার ৩৫০ জন স্থানীয় কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা ডিমাইন ইউক্রেনের তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা এখনো মাইন ও বিস্ফোরকে দূষিত, যা প্রায় গ্রিস বা যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের সমান। এর মধ্যে প্রায় ৪২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন পর্যন্ত নিরাপদ করা হয়েছে।
এত বড় কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে হালো ট্রাস্ট এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে। তারা উচ্চ রেজ্যুলিউশনের ড্রোন চিত্র বিশ্লেষণ করে মাইন ও বিস্ফোরক শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ নির্ভুলতা পাওয়া গেছে।
শুস্তোভা বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি দশকের পর দশক সময় নিতে পারে, তবে প্রযুক্তির উন্নতি কাজকে দ্রুততর করছে।’ কিয়েভের উত্তরের আরেকটি এলাকায়, ওলেক্সান্দর লিয়াতসেভিচ একটি শক্তপোক্ত স্টিলের খাঁচার ভেতরে বসে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি চশমা পরে একটি কাস্টমাইজড খননযন্ত্র পরিচালনা করছেন। তিনি জয়স্টিক দিয়ে কয়েক মিটার দূরের যন্ত্রটি নিয়ন্ত্রণ করেন, যা মাটি খুঁড়ে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদসহ মাটি তুলে একটি বিশেষ গ্রাইন্ডারে ধ্বংস করে।
এ ধরনের মানববিহীন যন্ত্র মাইন অপসারণকে আরও দ্রুত ও নিরাপদ করছে। যুদ্ধের এই সময়ে অটোমেশন, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুদ্ধ ও পরবর্তী পুনর্গঠনের ধরনই বদলে দিচ্ছে।
৩৯ বছর বয়সী লিয়াতসেভিচ আগে একজন সরকারি কর্মচারী ও কৃষক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ক্যাবিনে বসে চালানো আর দূর থেকে জয়স্টিক দিয়ে চালানোর মধ্যে অনেক পার্থক্য। ছোটবেলায় বেশি ভিডিও গেম খেলিনি, তাই শুরুতে কঠিন ছিল।’
এদিকে কাছের বনাঞ্চলে, মাইন অপসারণকারী ওলহা কাভা সুরক্ষামূলক পোশাক ও ভিসর পরে মাটির কাছে ঝুঁকে হাতে খুঁজে দেখছেন সম্ভাব্য মাইন। আগে তিনি একজন ট্রাভেল এজেন্ট ছিলেন এবং তিন সন্তানের মা।
বন্ধুরা যখন রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, তখন তিনিও মাইন অপসারণের কাজে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ভয় আছে। কিন্তু সেই ভয়ই আপনাকে দায়িত্বশীল ও সঠিকভাবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।’
সূত্র: রয়টার্স