যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ব্রিটেনের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গেও সৌদি আরবের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এমনকি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার পেছনেও এই যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। এই পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আগে সৌদি আরবের নীতি ছিল ধীর ও গতানুগতিক। সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো সবার মতামত নিয়ে। নীতিগুলো বেশির ভাগ সময়ই অনুমান করা যেত। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্স ক্ষমতায় এসে দেশের ভেতরে পরিবর্তনের সূচনা করেন এবং আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। মাঝেমধ্যে তার কিছু অভাবনীয় সিদ্ধান্ত সৌদি আরবকে বিপদেও ফেলেছে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ সৌদি নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের গতি আবারও কমিয়ে দিয়েছে। তারা এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবছে। তারা বুঝতে পারছে, এই যুদ্ধের ফলাফল ফলাফল যা-ই হোক না কেন, এটি আগামী ২০ বছর এই অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগর
সৌদি আরবের নতুন ভাবনার মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। এটিকেই এখন তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ দেশটির বেশির ভাগ তেল ও পণ্য এই পথ দিয়েই যায়। আগে থেকেই এই পথকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে, এটি খুব কমই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে, হরমুজ প্রণালি সৌদি আরবের জন্য বড় দুর্বলতার জায়গা। এটি বন্ধ থাকলে বাণিজ্যের পাশাপাশি তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনাও সফল হওয়া অসম্ভব।
যেহেতু একবার এই পথ বন্ধ হয়েছে তাই ভবিষ্যতে আবারও এমন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এটি সৌদি আরবের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য বড় হুমকি। বারবার বা দীর্ঘ সময় ধরে এই পথে বাধা সৃষ্টি হলে আয় কমবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হবে। দেশটি স্থিতিশীল বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারবে না। অথচ ভিশন ২০৩০ সফল করতে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপদ সমুদ্রপথ জরুরি।
এ কারণে সৌদি আরব এখন তাদের ‘অর্থনৈতিক ভূগোল’ বা বাণিজ্যের পথগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। তারা হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে লোহিত সাগরের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। লোহিত সাগরের তীরের বন্দর, শিল্প এলাকা ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। দেশটির দুই দিকে দুটি উপকূল থাকায় প্রতিবেশীদের তুলনায় সৌদি আরব ভৌগোলিক সুবিধায় এগিয়ে। তারা এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চলের প্রধান রপ্তানি ও লজিস্টিক হাব (কেন্দ্র) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিজেদের এগিয়ে নিতে চায়।
এই পরিবর্তনের ফলে দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোকে তেল রপ্তানির দিক বদলাতে হবে। প্রতিদিন প্রায় ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যা যুদ্ধের আগের রপ্তানির সমান। বর্তমানে তারা পূর্ব দিক থেকে পাইপলাইনে দিনে প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পশ্চিমে নিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি হচ্ছে। যদিও বর্তমানে রপ্তানি কম, তবু সৌদি আরব তার উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ তাদের প্রতিবেশীদের তেল রপ্তানি এখনো পারস্য উপসাগরেই আটকে আছে। বর্তমানে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলার, যা যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ফলে তাদের অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে সৌদি আরব যদি নিজেকে এই অঞ্চলের একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র (হাব) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে এমন অবকাঠামো দরকার, যাতে লোহিত সাগর থেকে দেশের বড় শহরগুলোতে সহজেs পণ্যসহ, বিশেষ করে তেল আনা-নেওয়া করা যায়। যদিও এতে সময় বেশি লাগবে এবং খরচও বাড়বে। কিন্তু হরমুজ সমস্যার কারণে সৌদি আরবের সামনে অন্য বিকল্প খুব কম।
লোহিত সাগরের পথটিও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরা এই পথে প্রায়ই জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। ফলে হরমুজ থেকে সরে লোহিত সাগরে গেলেও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি এড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
ইউএই-এর সঙ্গে নতুন টানাপড়েন
লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় সৌদি আরব সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চায় না। তারা যুদ্ধ আরও বাড়ানোর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিচ্ছে। কারণ শক্তিশালী হামলা হলে তাদের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে হুথিরা আরও সক্রিয় হতে পারে। তখন বিকল্প রপ্তানি পথও হুমকির মুখে পড়বে।
এ কারণে ইরান যুদ্ধ নিয়ে সৌদি আরব ও ইউএইর অবস্থান ভিন্ন। আবুধাবি বর্তমানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের খুব ঘনিষ্ঠ এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ইউএইর কর্মকর্তারা ইরানের সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অংশীদারদেরও দোষ দিয়েছেন শক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখানোর জন্য।
অন্যদিকে সৌদি আরব এখন ইসরায়েলকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। তাই আরব আমিরাতের অবস্থান তাদের কাছে অস্বস্তিকর। এই ভিন্ন অবস্থানের কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এমনকি আরব আমিরাতের ‘ওপেক’ ত্যাগ করাকেও সৌদি আরব ভালো চোখে দেখছে না। যদিও সৌদি আরব এখনো ওপেকের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ থাকবে, তবুও ইউএই উৎপাদন বাড়ালে ভারসাম্য রাখতে ভবিষ্যতে সৌদিকে উৎপাদন কমাতে হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার সৌদি আরবের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমিরাত এরই মধ্যে লোহিত সাগর ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে বন্দর ও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। এর মাধ্যমে তারা বাণিজ্য পথ ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে।
কৌশলগত পুনর্বিবেচনা
এই যুদ্ধকে সৌদি আরব ব্যয় পুনর্বিন্যাসের সুযোগ হিসেবে দেখছে। যুদ্ধের আগেই দেশটির মেগা প্রজেক্টগুলো পর্যালোচনা শুরু হয়েছিল। এখন যুদ্ধকে কারণ দেখিয়ে তারা বিনিয়োগ কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে। এতে ব্যর্থতার অভিযোগ এড়ানো যাচ্ছে।
এখন দেশীয় শিল্প খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য জরুরি। সৌদি আরবের সার্বভৌম তহবিল (পিআইএফ) এখন বিদেশি বড় বড় প্রকল্প থেকে সরে আসছে। লিভ গলফ এবং নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন অপেরার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ কমানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশটি তাদের অন্যতম প্রধান ফুটবল ক্লাব ‘আল হিলাল’-এর একটি অংশের শেয়ার বিক্রিতেও সম্মত হয়েছে। অন্য তিনটি ক্লাব আল নাসর, আল আহলি ও আল ইত্তিহাদও বিক্রির তালিকায় আছে। এতে বোঝা যায়, তারা এখন খরচে আরও সতর্ক হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কমাচ্ছে।
যুবরাজ সালমান সম্ভবত ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে বড় শিক্ষা পেয়েছেন। প্রথমত, হঠকারী সিদ্ধান্তের ফল ভালো হয় না; দ্বিতীয়ত, ‘দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়া’ বলে আসলে কিছু নেই। এ কারণেই তিনি ইরান যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চান না। এমনকি জোরালো সমর্থনও দিচ্ছেন না। বরং সৌদি আরব এখন আবার সতর্কতা, ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছে।
লেখক: ড. নিল কুইলিয়াম জ্বালানিনীতি, ভূ-রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো হিসেবে কর্মরত।