যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে চলেছে দখলদার ইসরায়েল। একই সঙ্গে দেশটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে গাজার আরও এলাকা দখল এবং ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলের এসব পদক্ষেপে গাজার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে–এসব প্রশ্ন নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই বছর ধরে টানা বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান চালানোর পর গাজায় ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর একটা সুরাহা হয়েছিল বলে মনে হয়েছিল। সেদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার এক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলি বাহিনীর ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে সরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে তা হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতির সময়ও হামলা চালিয়ে অন্তত ৯২২ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। এ ছাড়া তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা আরও প্রায় ১১ শতাংশ বাড়িয়েছে।
মার্চের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, অস্থায়ী সীমারেখা ধরে ইসরায়েল অন্তত ৩২টি সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। একই সময়ে অক্সফামসহ বিভিন্ন সংস্থা অভিযোগ করেছে, ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিয়ে গাজার মানবিক সংকটকে আরও বেশি জটিল ও তীব্র করে তুলছে ইসরায়েল।
এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, গাজার আরও এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে ইসরায়েল। এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন হামাসকে চাপে রাখছি। গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আগে ছিল ৫০ শতাংশ। আমি নির্দেশ দিয়েছি আমরা এগোব...।’ এ সময় উপস্থিত একজন চিৎকার করে বলেন, ‘১০০ শতাংশ!’
জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আসুন আমরা ধাপে ধাপে এগোই। আগে ৭০ শতাংশে যাই। সেখান থেকেই শুরু করি। আমরা চারদিক থেকে তাদের চাপে রাখছি। বাকি যা আছে, সেটাও সামলে নেব।’
ইসরায়েল কি চাইলেই গাজার আরও জমি দখল করতে পারে?
ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েলের চূড়ান্ত পরিকল্পনা যদি পুরো গাজা উপত্যকার ওপর স্থায়ী ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে তা হবে একটি অবৈধ ভূখণ্ড দখল।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের পরামর্শমূলক রায়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) আবারও স্পষ্ট করেছেন, ‘বল প্রয়োগ করে কোনো ভূখণ্ড দখল করা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির চরম লঙ্ঘন।’
তবু বাস্তবতা হলো, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজায় অন্তত ৭২ হাজার ৮১৯ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ থাকা আরও হাজারও মানুষকে মৃত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের মধ্যেই ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে এবং একই সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত সব করেও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক কোনো বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়নি। এমনকি বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও তারা এখনো নানা রকম আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিয়ে যাচ্ছে।
অনেকে আশা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইসরায়েলকে নিজস্ব শর্ত মানতে বাধ্য করবে। কিন্তু সেই আশাও বাস্তব হয়নি। গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় ইসরায়েলের উপস্থিতি বিস্তার ও স্থায়ী করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এর ফলে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে গাজার বাসিন্দাদের জন্য প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে আল জাজিরা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দপ্তরও এ বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে দায় হামাসের ওপর চাপিয়েছে।
গাজার মানুষ কি এত ছোট জায়গায় টিকে থাকতে পারবে?
এর উত্তর দেওয়া কঠিন। জাতিসংঘের মানবিক বিষয় সমন্বয় দপ্তরসহ (ওসিএইচএ) বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে ক্রমেই ছোট হয়ে আসা এলাকায় গাজার অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী কীভাবে বেঁচে থাকবে। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান স্পষ্ট। চলতি সপ্তাহের বুধবার হামাস নেতা মোহাম্মদ ওদেহকে হত্যার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ লিখেছেন, ‘গাজা থেকে স্বেচ্ছায় অভিবাসনের পরিকল্পনাও যথাসময়ে এবং যথাযথ পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হবে।’
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আল জাজিরাকে কোনো উত্তর দেয়নি।
এসব কি আইনসম্মত?
সংক্ষিপ্ত উত্তর–না। অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, ‘গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার ধারণা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শামিল। এটি ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও লঙ্ঘন করবে।’ তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ সনদের অন্যতম ভিত্তিমূলক নীতিই হলো জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।’
তবে অধ্যাপক বেকারের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ এখন গাজা সংকট থেকে সরে গিয়ে অন্য দিকে চলে গেছে। বিশ্ববাসীর নজর এখন ইরান ও লেবাননে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের দিকে, যেখানে ইসরায়েল ইতোমধ্যেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের এক বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে বিধ্বংসী ও অবৈধ যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার সমাধান খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো কিছু ক্ষেত্রে স্বার্থের বাইরে গিয়ে ভিন্ন পথ নিতে পারে। কিন্তু গাজার বিষয়ে বা নেতানিয়াহু সরকারের ওপর সংযম আরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেকটাই হারিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। গাজার ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ আদৌ কী ভূমিকা রাখতে চায়, সেটিও এখন স্পষ্ট নয়।’