মানুষের মস্তিষ্কেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর আগে শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গেই, এমনকি রক্তের প্রবাহ ও ধমনিতে এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল।
গত সোমবার জামা নেটওয়ার্ক ওপেন জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, নাকের ওপরের অংশের মস্তিষ্কের টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এটি মানবদেহের প্রায় প্রতিটি অঙ্গে ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্রকণা ও ফাইবারগুলো নাকের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করার সম্ভাব্য পথ নির্দেশ করে।
গবেষকরা ১৫টি মরদেহের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও তিনজন নারীর মরদেহ ছিল। তাদের বয়স ৩৩ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে ছিল। গবেষণায় বলা হয়েছে, এর মধ্যে আটটিতে অলফ্যাক্টরি বাল্ব বা ঘ্রাণ বাল্বের টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ঘ্রাণতন্ত্র হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা গন্ধ প্রক্রিয়া কাজ করে।
অলফ্যাক্টরি বাল্বে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য একটি সম্ভাব্য পথ নির্দেশ করে, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষকরা জানান।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও ব্রাজিলের ‘ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলো মেডিকেল স্কুল’-এর প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. থাইস মাউয়াদ বলেন, ‘মানুষ ও প্রাণীর ওপর করা আগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণের বিষয়টি মস্তিষ্কে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সেই কণা পাওয়া গেছে অলফ্যাক্টরি বাল্বে। আর এ কারণেই আমাদের ধারণা, সম্ভবত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মস্তিষ্কে পৌঁছানোর কয়েকটি পয়েন্টের মধ্যে একটি অলফ্যাক্টরি বাল্ব।’
মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, মস্তিষ্কে অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় ২০ গুণ বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এটি মস্তিষ্কের ওজনের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যদিও এটি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি যে এটি কোথায় জমা হচ্ছিল।
গবেষকরা জানান, গবেষণার এই ফলাফল উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আটটি মস্তিষ্কে ১৬টি প্লাস্টিকের ফাইবার এবং কণা পাওয়া গেছে। এগুলো মানব রক্তকণিকার ব্যাসের চেয়ে ছোট, যার আকার ৫ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার থেকে ২৬ দশমিক ৪ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এটি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়, কেন বা কীভাবে কিছু মরদেহের মস্তিষ্কের টিস্যু মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে এসেছে ও অন্যদের তা হয়নি।
ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টক্সিকোলজিস্ট ম্যাথিউ ক্যাম্পেন বলেন, ‘মস্তিষ্কের অলফ্যাক্টরি বাল্বে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়টি অনন্য হলেও খুব আশ্চর্যজনক নয়। এমন প্রমাণ রয়েছে, খুব ছোট বায়ুবাহিত বিভিন্ন কণা অলফ্যাক্টরি বাল্বের মাধ্যমে মস্তিষ্কে যেতে পারে। তবে এটি মস্তিষ্কে উপাদান পাঠানোর প্রধান পথ হিসেবে তেমনভাবে পরিচিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অনুমান, ব্যাকটেরিয়া যদি এই পথ দিয়ে যেতে পারে। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিকও এ পথ দিয়ে যেতে পারবে। রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করার সম্ভাবনা বেশি ন্যানোপ্লাস্টিকের, যা অলফ্যাক্টরি বাল্বের পরিবর্তে দেহের ফুসফুস বা পাচনতন্ত্র থেকে প্লাস্টিকের কণা তুলে নেয়। তবে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করা কণার পক্ষে, এমনকি ফার্মাসিউটিক্যালসের জন্যও অত্যন্ত কঠিন। কারণ ‘ব্লাড-ব্রেইন-ব্যারিয়ার’ নামে একটি অর্ধভেদ্য ঝিল্লির মাধ্যমে বেষ্টিত থাকে মস্তিষ্ক। আর শরীরের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণার বিষয়টি এখনো নতুন। প্লাস্টিকের এসব ক্ষুদ্র কণা মানুষের ব্লাড-ব্রেইন-ব্যারিয়ার ভেদ করতে পারে কি না, তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন।
প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত ৪ হাজার রাসায়নিক উপাদান ও বিভিন্ন টুকরা কীভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যা অনুমান করেন তার বেশির ভাগই প্রাণী গবেষণার মধ্যে সীমিত রয়েছে।
আশ্চর্যজনক তথ্য
মস্তিষ্কের টিস্যুতে পাওয়া সবচেয়ে সাধারণ ধরনের প্লাস্টিক ছিল পলিপ্রোপিলিন, এরপর পলিঅ্যামাইড, নাইলন এবং পলিইথিলিন ভিনাইল অ্যাসিটেট। পলিপ্রোপিলিন প্রায়শই আসবাবপত্র, পোশাক, কার্পেট বা পরিষ্কারের পণ্যের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। পলিঅ্যামাইড ও নাইলন একই ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক। উভয়ই প্রায়শই পোশাক ও কার্পেটের মতো টেক্সটাইলের জন্য ব্যবহৃত হয়। পলিইথিলিন ভিনাইল অ্যাসিটেট আঠালো, পেইন্ট বা প্লাস্টিকের মোড়কের মতো পণ্য তৈরির জন্য নমনীয় প্লাস্টিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সমুদ্র ও ভূমিতে সমাহিত মানবদেহ অনুসরণ করে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের টুকরা। এটি ওয়ানটাইম বা একবার ব্যবহারযোগ্য বোতল, খাবারের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের থালা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। প্যাকেজিং, অটো পার্টস, খেলনা এবং অন্যান্য আইটেম এটি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফসল ও মাছের মাধ্যমে মানুষ সরাসরি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করতে পারে। প্লাস্টিকের খাবারের পাত্রের মাধ্যমেও মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছর ঘোষণা করেছে, তারা নতুন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করবে। যেন মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ রোধ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ রোধের একটি অনুরূপ প্রচেষ্টা ২০২০ সালে শুরু হয়েছে। যদিও এটির কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মানব রক্ত, ধমনি, পুরুষদের প্রজননতন্ত্র, ফুসফুস এবং লিভারের টিস্যু, মায়ের দুধসহ অন্যান্য অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অন্যান্য গবেষণায় ফুসফুসের প্রদাহ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার, নিউরোটক্সিসিটি, ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন প্রতিরোধ ও প্রজনন স্বাস্থ্য হ্রাসের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিককে দায়ী করা হয়। এ বছরের শুরুতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধমনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা বেশি থাকলে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতি বছর গড়ে ৫০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করে মানুষ। অন্যান্য গবেষণা ইঙ্গিত করে, মানুষ প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫ গ্রাম প্লাস্টিক গ্রহণ করে। সূত্র: এনবিসি নিউজ


