পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রহস্যময় ও বিস্ময়কর ধারণা ‘টাইম ক্রিস্টাল’ বা ‘সময় স্ফটিক’, যা প্রথমবার খালি চোখে দৃশ্যমান করতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তরল স্ফটিকের ওপর আলো ফেলে তারা এই যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছেন। এই উদ্ভাবন শুধু পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে না, বরং যোগাযোগ প্রযুক্তি থেকে শুরু করে জাল নোট প্রতিরোধ এবং ডেটা সংরক্ষণের মতো ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে ১০০ ডলারের মতো উচ্চমূল্যের নোটে এর ব্যবহার দেখা যেতে পারে।
চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বখ্যাত ‘নেচার ম্যাটেরিয়ালস’ জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ও গবেষণার প্রধান লেখক হানকিং ঝাও বলেন, ‘এই টাইম ক্রিস্টালগুলো সরাসরি মাইক্রোস্কোপের নিচে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে খালি চোখেও দেখা সম্ভব।’
‘টাইম ক্রিস্টাল’ কী?
পদার্থবিজ্ঞানের জগতে টাইম ক্রিস্টালের ধারণাটি বেশ নতুন। ২০১২ সালে নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্র্যাংক উইলচেক প্রথম এর ধারণা দেন। সাধারণ ক্রিস্টাল বা স্ফটিকের অণুগুলো যেমন একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে স্থান জুড়ে বারবার নিজেদের পুনরাবৃত্তি করে, টাইম ক্রিস্টালের কণাগুলো তেমনি একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার নিজেদের পুনরাবৃত্তি করে।
সাধারণ স্ফটিকগুলো পদার্থের প্রতিসাম্য বা সিমেট্রির নিয়ম ভাঙে। একইভাবে টাইম ক্রিস্টাল সময়ের প্রতিসাম্যকে ভাঙে। এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে থেকেও দুটি ভিন্ন অবস্থার মধ্যে অবিরাম দুলতে থাকে। তবে এর শক্তি ক্ষয় হয় না। এই অদ্ভুত আচরণের কারণে অনেকে একে ‘পারপেচুয়াল মোশন মেশিন’ বা চিরস্থায়ী গতিযন্ত্র বলে ভুল করেন। তবে এটি তাপগতিবিদ্যার কোনো সূত্র লঙ্ঘন করে না। কারণ এটি নিজে থেকে শক্তি তৈরি করে না, বরং আলোর মতো কোনো বাহ্যিক উৎস থেকে শক্তি গ্রহণ করে এবং সেই শক্তি সিস্টেমে আটকে রেখে অবিরাম দুলতে থাকে।
এর আগে বিজ্ঞানীরা হীরা, কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও রুবিডিয়াম পরমাণুর মধ্যে টাইম ক্রিস্টাল তৈরি করতে পারলেও সেগুলো সরাসরি দেখা যেত না। লেজারের আলোর ওঠানামা দেখে সেগুলোর অস্তিত্ব বোঝা যেত।
যেভাবে তৈরি হলো
নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এলসিডি স্ক্রিনে ব্যবহৃত তরল স্ফটিক ব্যবহার করেছেন। তারা দুটি কাচের পাতের মধ্যে রঞ্জক পদার্থের প্রলেপ দিয়ে তার মাঝে তরল স্ফটিককে আবদ্ধ করেন। এরপর নির্দিষ্ট উপায়ে চাপ প্রয়োগ করলে স্ফটিকের অণুগুলোর মধ্যে এক ধরনের মোচড় বা ‘কিংক’ তৈরি হয়, যা কণার মতো আচরণ করতে শুরু করে।
গবেষকরা যখন কাচের ওপর আলো ফেলেন, তখন রঞ্জক পদার্থের অণুগুলো নড়ে ওঠে এবং তরল স্ফটিককে চেপে ধরে। ফলে হাজার হাজার নতুন কিংক তৈরি হয়, যারা একটি নির্দিষ্ট ছন্দে ও সময়ে বারবার নড়াচড়া করতে থাকে। এই পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া দৃশ্যমান টাইম ক্রিস্টাল তৈরি করে। এটি অনেকটা ‘সাইকেডেলিক বাঘের ডোরাকাটা দাগের’ মতো দেখায়। গবেষকরা তাপমাত্রা কমানো বা বাড়ানোর পরও এই নড়াচড়ার ছন্দে কোনো পরিবর্তন দেখেননি।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ইভান স্মালিউখ বলেন, ‘সবকিছু যেন শূন্য থেকে তৈরি হচ্ছে। আপনি শুধু আলো ফেলবেন, আর সঙ্গে সঙ্গে টাইম ক্রিস্টালের এক নতুন জগৎ আবির্ভূত হবে।’
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
এই উদ্ভাবন পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু প্রায়োগিক সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে এটিকে ‘টাইম ওয়াটারমার্ক’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর স্বতন্ত্র ও পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন উচ্চমূল্যের ব্যাংক নোট বা গুরুত্বপূর্ণ নথি জাল করা প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। এ ছাড়া এই ক্রিস্টালগুলোকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে আরও জটিল প্যাটার্ন তৈরি করা সম্ভব, যা বিপুল পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণে কাজে লাগতে পারে।
অধ্যাপক স্মালিউখ বলেন, ‘এখন এর সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে চাই না। আমি মনে করি, এই প্রযুক্তিকে সব দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’


