উনিশ শতকের শেষ ভাগ। লুই পাস্তুর ও রবার্ট কোখের মতো দিকপাল বিজ্ঞানীদের হাত ধরে অণুজীববিজ্ঞান তখন সবেমাত্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জেনে গেছেন, কলেরা, যক্ষ্মা বা অ্যানথ্রাক্সের মতো ভয়ংকর সব রোগের পেছনে দায়ী ব্যাকটেরিয়া নামের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক জীব। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে তাদের দেখা যায়, বিশেষ ফিল্টারে ছেঁকে আলাদা করা যায়। রোগের কারণ হিসেবে ব্যাকটেরিয়া তত্ত্ব তখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।
তবে এমনও কি কিছু থাকতে পারে, যা ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও শতগুণ ক্ষুদ্র? এমন কোনো শত্রু, যা সবচেয়ে সূক্ষ্ম ফিল্টারকেও ফাঁকি দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে? এই যুগান্তকারী প্রশ্নের উত্তর আসে এক তরুণ রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি ইভানোভস্কির হাত ধরে। তিনি সরাসরি ভাইরাস আবিষ্কার না করলেও এমন এক ‘অদৃশ্য কণার’ সন্ধান দেন, যা আজ আমরা ‘ভাইরাস’ নামে চিনি। তার সেই পর্যবেক্ষণই জন্ম দেয় বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন এক শাখা ‘ভাইরোলজি’ বা ভাইরাসবিদ্যা।
তামাক পাতার রহস্যময় রোগ
দিমিত্রি ইভানোভস্কির গবেষণার শুরু কৃষকদের এক বড় সমস্যাকে ঘিরে। ১৮৮০-এর দশকে রুশ সাম্রাজ্যের (বিশেষত ইউক্রেন ও ক্রিমিয়া অঞ্চল) তামাকচাষিরা এক অদ্ভুত রোগে দিশেহারা ছিলেন। তামাকগাছে ছোপ ছোপ হলদেটে দাগ তৈরি হতো, পাতা কুঁকড়ে যেত এবং এক সময় পুরো গাছটি মরে যেত। এই ছোপ দাগ দেখতে মোজাইক পাথরের মতো হওয়ায় একে বলা হতো ‘টোব্যাকো মোজাইক রোগ’।
রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক ছিল। একটি গাছ আক্রান্ত হলে পুরো খেত নষ্ট হয়ে যেত। তৎকালীন বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, এটি নিশ্চয় কোনো ব্যাকটেরিয়ার কাজ। ১৮৮৭ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তরুণ ইভানোভস্কিকে রোগটির কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার লক্ষ্য ছিল সেই নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে শনাক্ত করা এবং তা থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা।
‘ব্যর্থ’ পরীক্ষার ফলেই আবিষ্কার
বিজ্ঞানের অনেক বড় আবিষ্কারের মতো ইভানোভস্কির আবিষ্কারও আসে এক অপ্রত্যাশিত ফলাফল বা আপাত ‘ব্যর্থ’ পরীক্ষা থেকে। তিনি রোগাক্রান্ত তামাক পাতার রস সংগ্রহ করলেন। পরিকল্পনা ছিল, এই রস থেকে সেই ‘কালপ্রিট’ ব্যাকটেরিয়াকে ছেঁকে আলাদা করা।
এ জন্য তিনি ব্যবহার করলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ‘চেম্বারল্যান্ড ফিল্টার’। এটি এক ধরনের পোরসেলিন ফিল্টার, যার ছিদ্রগুলো এত সূক্ষ্ম যে পরিচিত কোনো ব্যাকটেরিয়া এর মধ্য দিয়ে যেতে পারে না। লুই পাস্তুরের সহকর্মী চার্লস চেম্বারল্যান্ড এটি উদ্ভাবন করেছিলেন। ব্যাকটেরিয়ামুক্ত তরল তৈরিতে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত ছিল।
ইভানোভস্কি সংক্রামিত তামাকের রস এই ফিল্টারের মধ্য দিয়ে চালালেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, ব্যাকটেরিয়াগুলো ফিল্টারে আটকে যাবে এবং নিচে যে স্বচ্ছ তরল জমা হবে, তা হবে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত।
তবে এর পর ঘটল বিস্ময়কর ঘটনা। ইভানোভস্কি সেই ফিল্টার করা ব্যাকটেরিয়ামুক্ত রস একটি সুস্থ তামাক পাতায় প্রয়োগ করলেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, গাছটির সুস্থ থাকার কথা ছিল। কিন্তু ঘটল উল্টোটা, সুস্থ গাছটিও কয়েক দিনের মধ্যে ভয়াবহভাবে টোব্যাকো মোজাইক রোগে আক্রান্ত হলো।
তিনি বারবার পরীক্ষাটি করলেন। ফল একই। তিনি বুঝলেন, রোগের কারণ যাই হোক, তা ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম ফিল্টারকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম।
ভাইরাস নামের উৎস
১৮৯২ সালে ইভানোভস্কি তার এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তবে মজার বিষয় হলো, তিনি নিজে একে ‘ভাইরাস’ বলে চিহ্নিত করেননি বা নতুন কোনো জীবাণুর তত্ত্ব দেননি। তিনি ছিলেন সতর্ক বিজ্ঞানী। গবেষণাপত্রে তিনি দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেন, এটি হয়তো ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত কোনো ‘বিষাক্ত পদার্থ’ (টক্সিন), যা ফিল্টার ভেদ করতে পারে। অথবা এমন ক্ষুদ্র জীব, যা তৎকালীন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়ে না। তিনি একে বলেন ‘ফিল্টারযোগ্য জীবাণু’।
ইভানোভস্কির এই গবেষণার প্রায় ছয় বছর পর ১৮৯৮ সালে ডাচ অণুজীববিজ্ঞানী মার্টিনাস বাইজেরিংক একই পরীক্ষা করে একই ফল পান। তবে বাইজেরিংক ইভানোভস্কির চেয়ে একধাপ এগিয়ে চিন্তা করেন। তিনি বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ রাসায়নিক বিষ নয়, বরং জীবন্ত সত্তা। কারণ এটি জীবন্ত কোষের ভেতরে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
বাইজেরিংক এই সংক্রামক তরলের নাম দেন ‘Contagium Vivum Fluidum’ বা ‘সংক্রামক জীবন্ত তরল’। তিনিই প্রথম এই জীবাণুর বর্ণনা দিতে প্রাচীন ল্যাটিন শব্দ ‘ভাইরাস’ (Virus) ব্যবহার করেন, যার অর্থ ‘বিষ’ বা ‘বিষাক্ত তরল’। এভাবেই অদৃশ্য এই শত্রুর নামকরণ হয়।
নতুন দুয়ার
যদিও বাইজেরিংক ‘ভাইরাস’ শব্দকে জনপ্রিয় করেন, তবুও দিমিত্রি ইভানোভস্কিকে ভাইরাসবিদ্যার জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারণ তিনিই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করেন, ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ভিন্ন ধরনের সংক্রামক অস্তিত্ব রয়েছে।
ইভানোভস্কির সেই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানে নতুন এক দুয়ার খুলে দেয়। বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেন, রোগের কারণ শুধু ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক নয়; আরও এক সম্পূর্ণ ভিন্ন শত্রু প্রকৃতিতে বিদ্যমান। ১৯০১ সালে প্রথম মানব ভাইরাস (ইয়েলো ফিভার ভাইরাস) এবং ১৯১১ সালে প্রথম ক্যানসার সৃষ্ট ভাইরাস (রাউস সারকোমা ভাইরাস) আবিষ্কৃত হয়। প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে ছিল ইভানোভস্কির মূল ধারণা, এটি এমন এক জীবাণু- যা ব্যাকটেরিয়া ফিল্টারেও আটকায় না।
আজ আমরা ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, পোলিও, ইবোলা, এইচআইভি থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ পর্যন্ত অসংখ্য ভাইরাসজনিত রোগের সঙ্গে পরিচিত। ভাইরাস শনাক্ত করা, এর গঠন বোঝা, টিকা আবিষ্কার ও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ তৈরির যাত্রার সূচনা হয়েছিল দিমিত্রি ইভানোভস্কির সেই সহজ কিন্তু ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি দিয়ে। হয়তো তিনি নিজে তার আবিষ্কারের গভীরতা তখন পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। তবে তার পথ ধরে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তৈরি করতে পেরেছে।


