কবি কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগর থেকে ১৯২৬ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের শামসুন নাহারকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন–‘ফুল ফোটার জন্যে অপেক্ষা করতে জানে যে সে-ই ফুল পায়।’ কথাটা যে এভাবে আমার ক্ষেত্রে সত্যি হয়ে যাবে, তা কখনো ভাবিনি। একটি ফুলকে বাস্তবে দেখার জন্য বহুদিন ধরে অপেক্ষা করে ছিলাম। অবশেষে সে ফুলের দেখা পেলাম ভিনদেশে। গত ৫ জানুয়ারি নিউইয়র্ক থেকে কাতারের দোহা পর্যন্ত এক লম্বা বিমানভ্রমণ। ঢাকায় ফেরার পথে দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো। কী আর করা? চমৎকার সে বিমানবন্দরটি ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে বিমানবন্দরের মধ্যে কাচের ছাদের নিচে এক মনোরম জীবন্ত উদ্যান, ঝরনাধারার কাছে হাজির হলাম। সে উদ্যানে পেলাম ট্রি ফার্ন, অ্যানথুরিয়াম, রেড ড্রেসিনা, চায়না ডল, পিচার প্ল্যান্ট ইত্যাদি বাহারি গাছপালা। তবে এসব গাছকে ছাপিয়ে একটি ফুল যেন আমার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিল। অনেকগুলো ঝোপ ঝোপ গাছে ফুটে আছে বার্ড অব প্যারাডাইস ফুল। এ ফুলের বাংলা নামকরণ করা হয়েছে স্বর্গের পাখি বা বেহেশতের বুলবুলি ফুল। শামসুন নাহারকে লেখা সেই চিঠিতে নজরুল এই স্বর্গের পাখির কথা লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন–‘ওরা স্বর্গের পাখি, ওদের যেন পা নেই, ধুলার পৃথিবীতে যেন ওরা বসবে না, ওরা যেন ভেসে আসা গান। তাই ওরা অজানা ব্যথার আনন্দে পাগল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে দেশে-বিদেশে, বসন্ত-আসা বনে, ফুল-ফোটা কাননে, গন্ধ-উদাস চমনে। ওরা যেন স্বর্গের প্রতিধ্বনি, টুকরো-আনন্দের উল্কাপিণ্ড!’
বিমানবন্দরের সান্ধ্য আলোতেও উদ্যানের সেই হলদে ফুলগুলো যেন আগুনের উল্কার টুকরোর মতো এক নীরব ছন্দময় সংগীত। এ ফুল বিদেশে তো আছেই, এ দেশেও কারও কারও সংগ্রহে আছে, তবে সুলভ নয়।
এ ফুল গাছের ইংরেজি নাম বার্ড অব প্যারাডাইস বা ক্রেন ফ্লাওয়ার। এর উদ্ভিতাত্ত্বিক নাম Strelitzia reginae ও গোত্র স্ট্রেলিজিয়েসি। ১৭৭৩ সালে ব্রিটেনে এ ফুলের প্রবেশ ঘটে। আর ১৭৮৮ সালে ইংরেজ প্রকৃতিবিদ ও উদ্ভিদবিদ জোসেফ ব্যাঙ্কস প্রথম এ ফুলের বর্ণনা দেন।
ইন্দোনেশিয়ায় বার্ড অব প্যারাডাইস নামে একটি পাখিও আছে। পাখিটি দেখতে এত সুন্দর যে সেখানকার লোকেরা বলে সৃষ্টিকর্তা সে পাখিকে স্বর্গ থেকে পাঠিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা এ ফুলটিও যেন সেই পাখিটির মতো সুন্দর। ফুলটি দেখতে পাখির মতো বলেই এর নামও রাখা হয়েছে বার্ড বা প্যারাডাইস। এ ফুলের এরূপ নামকরণের কারণ হলো এর গুচ্ছাকৃতির উন্মুক্ত ফুল, যা বার্ড অব প্যারাডাইস পাখির ভঙ্গি ও পালকের মতো। আর ক্রেন ফ্লাওয়ার নামটি দেওয়া হয়েছে মূলত ক্রাউনড ক্রেন পাখির মাথা ও চঞ্চুর সঙ্গে তুলনা করে।
ফুলটির অনন্য সৌন্দর্য ও গুরুত্বের কারণে একে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের অফিশিয়াল প্রতীক করা হয়েছে। এই ফুল আভিজাত্য, রাজকীয়তা, সজীবতা, স্বাধীনতা, নেতৃত্ব, আস্থা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক।
স্বর্গের পাখি ফুল গাছ বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ প্রকৃতির বিরুৎজাতীয় উদ্ভিদ। মাটির নিচে থাকা কন্দ বা রাইজোম থেকে এ গাছ জন্মে। গাছ দুই মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছ দেখতে অনেকটা কলাবতী ফুল গাছের মতো। পাতাগুলো কলাপাতার মতো। পাতা বড়, শক্ত, ২৫ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। কলাপাতার মতো এর পাতায়ও শক্ত ডাঁটি থাকে। পাতাগুলো সবুজ বা গাঢ় সবুজ, চকচকে ও মসৃণ। পাতাগুলো দুটি সারিতে সাজানো থাকে।
পাতাগুলোর মাঝখান থেকে একটি শক্ত ও লম্বা ডাঁটির মাথায় পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েকটি ফুল ফোটে। যে শক্ত ও পাখির চঞ্চুর মতো আবরণ থেকে ফুলগুলো বের হয় তাকে বলে স্পে। এটি পুষ্পদণ্ড বা ডাঁটির মাথায় এমনভাবে সাজানো থাকে যে দেখে সেগুলোকে পাখির মতো দেখায়। এই স্পে ফুলের পরাগায়ন ঘটানোর জন্য পাখিদের বসার জায়গা করে দেয়। ফুলের পাপড়িগুলো একই সঙ্গে স্পে থেকে বের হয়, যার তিনটি পাপড়ি থাকে হলুদ বা কমলা ও আরও তিনটি থাকে বেগুনি-নীল। দুটি পাপড়ি একসঙ্গে মিলে তিরের মতো একটি মধুভাণ্ড বা নেকটার তৈরি করে। পাখিরা স্পেদের ওপর বসে তা থেকে মধুপান করার সময় তৃতীয় পাপড়িটি খুলে পরাগরেণু অবমুক্ত করে। এ সময় পাখিদের পায়ে রেণু মেখে যায় ও পরাগায়ন ঘটে।
এ গাছ অন্দর বাগানের জন্য খুবই উপযোগী। শীতপ্রধান দেশে কাচঘরে এ গাছ লাগানো হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ