অস্ত্রোপচার বা সার্জারির টেবিলে রোগীকে অজ্ঞান করতে অ্যানেস্থেসিয়া বা চেতনানাশক ওষুধের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এবার এক অভিনব ও আশাব্যঞ্জক তথ্য জানিয়েছেন। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে যদি প্রশান্তিদায়ক বাদ্যযন্ত্রের সুর শোনানো হয়, তবে চেতনানাশক ওষুধের প্রয়োজন অনেকটা কমে আসে। শুধু তাই নয়, অস্ত্রোপচার শেষে রোগীর সেরে ওঠার প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। ভারতের লোক নায়ক হাসপাতাল ও মাওলানা আজাদ মেডিকেল কলেজের এক যৌথ গবেষণায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি সম্প্রতি ‘মিউজিক অ্যান্ড মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে অংশ নেন ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ৫৬ জন রোগী, যাদের ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি বা পিত্তথলি অপসারণের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন ছিল। সাধারণত পিত্তথলির এই ‘কি-হোল’ বা ছিদ্রযুক্ত অস্ত্রোপচারটি এক ঘণ্টারও কম সময় নেয়। এ প্রক্রিয়ায় রোগীকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রাখতে, ব্যথা কমাতে এবং পেশি শিথিল করতে প্রোপোফলসহ পাঁচ থেকে ছয় ধরনের ওষুধের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। প্রোপোফল এমন এক ধরনের ওষুধ, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রোগীকে অচেতন করে ফেলে এবং পরে দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেতে সহায়তা করে।
গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল সংগীত থেরাপি ব্যবহারের ফলে অস্ত্রোপচারে বহুল ব্যবহৃত প্রোপোফলের মোট চাহিদায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না, তা যাচাই করা। গবেষণার জন্য অংশগ্রহণকারী ৫৬ জন রোগীকে দুটি দলে ভাগ করা হয়। উভয় দলের রোগীরা অস্ত্রোপচার কক্ষে নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন পরেছিলেন, তবে কেবল একটি দলকে হেডফোনে গান শোনানো হয়েছিল। রোগীরা মূলত ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর, বিশেষ করে বাঁশি ও পিয়ানোর সুর বেছে নেন। এর মধ্যে হিন্দুস্তানি ‘রাগ ইমন’ এবং ‘রাগ কিরওয়ানি’র মিশ্রিত বাঁশির সুরটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়, যা গবেষকদের মতে মনকে শান্ত ও উৎফুল্ল রাখতে সহায়তা করে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, যারা গান শুনেছেন তাদের ক্ষেত্রে প্রোপোফলের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যে দলটিকে গান শোনানো হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি কেজিতে গড়ে ৭ দশমিক ৮৬ মিলিগ্রাম প্রোপোফল প্রয়োজন হয়েছে। অন্যদিকে, গান শোনা দলের রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম। পরিসংখ্যানের বিচারে এটি বেশ বড় পার্থক্য। এ ছাড়া রক্তচাপ ও হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওপিওড ব্যথানাশক ওষুধ ‘ফেন্টানাইল’-এর অতিরিক্ত ডোজও তাদের কম লেগেছে।
গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অস্ত্রোপচারকালীন শারীরিক ও মানসিক চাপ বা স্ট্রেস পরিমাপ করা। এটি মাপা হয় রক্তে ‘সিরাম কর্টিসল’-এর মাত্রার মাধ্যমে। দেখা গেছে, যারা গান শোনেননি তাদের কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গড়ে ৫৩৬ আইইউ/এমএল হয়েছিল। বিপরীতে, মিউজিক থেরাপি নেওয়া দলের ক্ষেত্রে এই মাত্রা ছিল ৪১৭ আইইউ/এমএল। অর্থাৎ গান শোনার ফলে অস্ত্রোপচারের সময় তাদের শরীরের ওপর স্ট্রেস অনেক কম পড়েছে।
অস্ত্রোপচার শেষে গান শোনা রোগীরা অনেক মসৃণভাবে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন এবং ২৪ ঘণ্টা পর তাদের সন্তুষ্টির মাত্রাও ছিল সাধারণ দলের চেয়ে বেশি। গবেষকরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া সংগীতকে অস্ত্রোপচার কক্ষে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ‘নন-ফার্মাকোলজিক্যাল’ বা ওষুধবিহীন অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। চিকিৎসাক্ষেত্রে সংগীতের ব্যবহার অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ক্যানসার পরিচর্যা, মানসিক স্বাস্থ্য, উপশমকারী চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপিতে দীর্ঘকাল ধরে উদ্বেগ ও ব্যথা কমাতে মিউজিক থেরাপি সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
/আবরার জাহিন


