মদ পান না করেও যদি কেউ মাতাল হয়ে পড়েন, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি বিরল রোগ রয়েছে, যার নাম ‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম’ (এবিএস)। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রাকৃতিকভাবে অ্যালকোহল তৈরি হয়। ফলে কোনো ধরনের মদ্যপান ছাড়াই তিনি নেশাগ্রস্তের মতো আচরণ করেন।
দীর্ঘদিনের রহস্য শেষে বিজ্ঞানীরা এখন এই রোগের পেছনের মূল কারণ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে সেই পেটের ব্যাকটেরিয়াগুলোর নাম, যা এই অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
রোগটি আসলে কী?
‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম’ (এবিএস) এত বিরল যে, অধিকাংশ সময় চিকিৎসকরাও এটি প্রাথমিকভাবে ধরতে পারেন না। সচেতনতার অভাব ও রোগ নির্ণয়ের জটিলতার কারণে রোগীরা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন। অথচ এই রোগের ফলে সৃষ্ট অ্যালকোহলের মাত্রা এতটা বেশি হতে পারে যে তা রোগীকে পুরোপুরি মাতাল করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভারের ক্ষতি, স্মৃতিশক্তি লোপ, হজমের সমস্যা ও ‘উইথড্রয়াল সিম্পটম’ বা নেশা কেটে যাওয়ার মতো শারীরিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাবে রোগীদের বছরের পর বছর ভুল চিকিৎসার শিকার হতে হয়, এমনকি আইনি ঝামেলার মুখেও পড়তে হয়।
এই রোগের কারণ খুঁজতে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণাটি চালানো হয়েছে। গবেষকরা ২২ জন এবিএস আক্রান্ত রোগীর স্বাস্থ্যগত তথ্যের সঙ্গে তাদের পরিবারের ২১ জন সুস্থ সদস্যের (যারা একই বাড়িতে বসবাস করেন) তথ্য তুলনা করেছেন। রোগটির প্রকোপ যখন বেড়ে যায়, তখন রোগীদের মলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সুস্থ মানুষের তুলনায় তাদের অন্ত্রে অ্যালকোহলের মাত্রা অনেক বেশি।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগো স্কুল অব মেডিসিনের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক বার্নড শ্নাবল জানিয়েছেন, গবেষণায় দেখা গেছে ‘ই. কোলাই’ ও ‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি’র মতো অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো চিনি বা শর্করাজাতীয় খাবারকে গেঁজে ফেলে ইথানলে রূপান্তর করে। ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘এই অণুজীবগুলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা এত বাড়িয়ে দেয় যে, তা আইনিভাবে একজন মদ্যপ ব্যক্তির সমতুল্য হয়ে যায়।’
তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ব্যাকটেরিয়া দায়ী নাও হতে পারে, এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এবিএস রোগীদের অন্ত্রে গাজন প্রক্রিয়ায় সহায়তাকারী এনজাইমের মাত্রা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।
পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের মাধ্যমে এই অ্যালকোহল উৎপাদন কমানো সম্ভব। তবে গবেষকদের মতে, সরাসরি এনজাইমগুলোকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা বেশি কার্যকর হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় করা হয়, তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন মল পরীক্ষার মাধ্যমে আরও নির্ভুলভাবে রোগটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এই গবেষণায় চিকিৎসার একটি নতুন সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। সেটি হলো ‘ফিকাল মাইক্রোবায়োটা ট্রান্সপ্লান্টেশন’ বা সুস্থ ব্যক্তির মলের অণুজীব অসুস্থ ব্যক্তির অন্ত্রে স্থাপন করা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি প্রয়োগের পর একজন রোগী ১৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ উপসর্গমুক্ত ছিলেন।
ম্যাস জেনারেল ব্রিঘাম ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিনের গবেষক এলিজাবেথ হোহম্যান বলেন, ‘আমাদের এই গবেষণা ফিকাল ট্রান্সপ্লান্টেশনের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ও তাদের কার্যপ্রণালির শনাক্ত করার ফলে ভবিষ্যতে এই বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তারা দ্রুত সঠিক ও সহজলভ্য চিকিৎসা পাবেন।


