ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাজিলিয়ার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিশাল এক সড়ক। নাম মনুমেন্টাল অ্যাক্সিস (Monumental Axis) বা পর্তুগিজ ভাষায় ইক্সো মনুমেন্টাল (Eixo Monumental)। প্রায় ২৫০ মিটার প্রশস্ত এই সড়ককে বিশ্বের সবচেয়ে প্রশস্ত রাস্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক নগর পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য এবং ভবিষ্যৎমুখী শহর নির্মাণের এক অনন্য প্রতীক এটি।
মনুমেন্টাল অ্যাক্সিস শুধু একটি রাস্তা নয়; এটি পুরো ব্রাজিলিয়া শহরের মূল অক্ষ, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। বিশাল এই সড়কটি পূর্ব দিকে অবস্থিত ন্যাশনাল কংগ্রেস অব ব্রাজিল থেকে শুরু হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোর মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
পরিকল্পিত রাজধানীর কেন্দ্রবিন্দু
১৯৫৬ সালে ব্রাজিল সরকার দেশটির রাজধানী উপকূলীয় শহর রিও দি জেনেইরো (Rio de Janeiro) থেকে দেশের অভ্যন্তর ভাগে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশের উন্নয়নকে ভৌগোলিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং নতুন এক আধুনিক রাজধানী গড়ে তোলা।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Juscelino Kubitschek-এর নেতৃত্বে শুরু হয় ব্রাজিলিয়া নির্মাণ প্রকল্প। তার বিখ্যাত উন্নয়ন স্লোগান ছিল ‘পাঁচ বছরে ৫০ বছরের অগ্রগতি’। সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে নির্মিত হয় এই সড়কটি।
আরো পড়ুন: যেসব দেশে বিমানবন্দর নেই
শহরের মূল নকশা তৈরি করেন খ্যাতিমান নগর পরিকল্পনাবিদ লুসিও কোস্টা। তার পরিকল্পনায় শহরকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যাতে আকাশ থেকে দেখতে এটি অনেকটা উড়োজাহাজ বা পাখির মতো মনে হয়। সেই নকশার মূল অক্ষই হলো মনুমেন্টাল অ্যাক্সিস।
অন্যদিকে শহরের দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক ভবনগুলোর নকশা করেন বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি অস্কার নেইমার। তার আধুনিকতাবাদী স্থাপত্যশৈলী ব্রাজিলিয়াকে বিশ্বজুড়ে অনন্য মর্যাদা এনে দেয়।
বিশালতা ও নান্দনিকতার মিশেল
মনুমেন্টাল অ্যাক্সিসের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর বিশাল প্রস্থ। প্রায় ২৫০ মিটার প্রশস্ত এই সড়কের দুই পাশে সমান্তরালভাবে একাধিক লেনের রাস্তা রয়েছে। মাঝখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের প্রান্তর বা ‘এসপ্ল্যানেড’। ফলে এটি শুধু যান চলাচলের পথ নয়, বরং একটি উন্মুক্ত নগর-অঙ্গন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
বিশাল খোলা জায়গা, সমান্তরাল স্থাপত্য এবং দীর্ঘ সোজা সড়ক ব্রাজিলিয়াকে এক ভবিষ্যৎমুখী নগরীর আবহ দেয়। রাতে আলোকসজ্জায় পুরো এলাকা যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কোনো শহরের দৃশ্য হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় স্থাপত্যের প্রদর্শনী
মনুমেন্টাল অ্যাক্সিসের দুই পাশে ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো Esplanada dos Ministérios, যেখানে দেশটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ভবন অবস্থিত।
এছাড়া রয়েছে Cathedral of Brasília, Praça dos Três Poderes, Brasília TV Tower, Estádio Nacional Mané Garrincha. এসব স্থাপনা আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।
ইউনেসকোর স্বীকৃতি
পরিকল্পিত আধুনিক রাজধানী হিসেবে ব্রাজিলিয়া বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ১৯৮৭ সালে ইউনেসকো শহরটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রথম নগর, যা এই স্বীকৃতি অর্জন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলিয়া এবং মনুমেন্টাল অ্যাক্সিস আধুনিকতাবাদী নগর পরিকল্পনার অন্যতম সফল উদাহরণ। প্রশস্ত রাস্তা, খোলা সবুজ এলাকা এবং পরিকল্পিত প্রশাসনিক বিন্যাস শহরটিকে অন্য যেকোনো রাজধানী থেকে আলাদা করেছে।
কিছু সমালোচনা
তবে এই বিশাল সড়ক ও গাড়িকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনাও আছে। অনেক নগরবিদের মতে, শহরটি পথচারীবান্ধব নয়। বিশাল দূরত্ব এবং প্রশস্ত সড়ক শহরটিকে মানুষের হাঁটার চেয়ে গাড়িনির্ভর করে তুলেছে। ফলে নগরজীবনের স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য কিছুটা কম বলে মত দেন সমালোচকরা।
তবু মনুমেন্টাল অ্যাক্সিস আজও বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় নগর পরিকল্পনার নিদর্শন। এটি কেবল ব্রাজিলের প্রশাসনিক শক্তির প্রতীক নয়; বরং আধুনিক স্থাপত্য, নান্দনিকতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বপ্নেরও এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)