প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, আগুন এবং সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা করার প্রতিবাদে আগামী জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে সারা দেশের সাংবাদিকদের নিয়ে মহাসম্মেলন করা হবে। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও আগুন এবং সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা করার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘মব ভায়োলেন্সের কবলে বাংলাদেশ’ শীর্ষক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন। সভার আয়োজন করে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াব। এই প্রতিবাদ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি জানাতে আসেন। সভা শেষে হোটেলের পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেন তারা।
সভায় অংশ নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে শুধু প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার নয়, গণতন্ত্রের ওপর আঘাত এসেছে। তাই গণতন্ত্রী সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বাধীনভাবে চিন্তা করার যে অধিকার, আমার কথা বলার যে অধিকার, তার ওপর আবার আঘাত এসেছে। জুলাই যুদ্ধের ওপর আঘাত এসেছে। কারণ জুলাই যুদ্ধ ছিল এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। আজকে সেই জায়গায় আঘাত এসেছে।’
নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলায় জড়িতদের বিচার ও সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে যারাই কথা বলেছেন সবার কথায় একটি বিষয়ই উঠে এসেছে, আমাদের এই অপশক্তিকে সম্মিলিতভাবে রুখে দিতে হবে।’
সভায় নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই সরকারের মনে রাখা উচিত তারা কোনো নির্বাচিত সরকার নয়, বৈধ সরকার হয়তো। একটি অনির্বাচিত সরকারের শাসন করার যোগ্যতা-ক্ষমতা থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ তার নৈতিক বৈধতা থাকে। এই ঘটনার ভেতর দিয়ে বর্তমান সরকারের বৈধতা অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে। এটা যদি তারা পুনঃস্থাপন করতে না পারে তাহলে আগামী দিনে এই যে উত্তরণের প্রক্রিয়া, অভ্যুত্থানের আদর্শ তারা রক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
সভায় দৈনিক নিউএজের সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, ‘যখন সংবাদকর্মীরা কাজ করছেন, তখন পত্রিকা অফিসের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এবং ফায়ার সার্ভিস আসার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে খুব পরিষ্কারভাবে এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য প্রস্ফুটিত হয়েছে। তারা চেয়েছে মধ্যযুগীয় কায়দায় চারপাশ থেকে আগুন লাগিয়ে যাদের সঙ্গে তাদের মতান্তর তৈরি হয়, তাদের পুড়িয়ে হত্যা করা। তিনি আরও বলেন, এটা পৃথিবীর কোনো সমাজ যদি সহ্য করে, যদি সেটা এগিয়ে যেতে দেওয়া হয়, তার বিরুদ্ধে যদি মাথা উঁচু করে না দাঁড়ায় তাহলে শুধু সংগঠনগুলো ধ্বংস হবে তা নয়, গোটা সমাজব্যবস্থা ও সমাজের উন্নতির সমস্ত পথ রুদ্ধ হবে।’
সভায় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘দেশে এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি ছাপিয়ে সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তাই বড় হয়ে উঠেছে।’
ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেদিন ডেইলি স্টার ভবনে আগুন দেওয়ার পর ভেতরে আটকে পড়া সংবাদকর্মীদের প্রাণ সংশয়ে পড়ে।’
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেওয়ার পুরো ঘটনাটাই পরিকল্পিত ছিল বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
ওই সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি তার একটা অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে এবং হওয়ার পরে কী কী ঘটনা ঘটানো হবে বাংলাদেশে, এটার একটা চক্রান্ত পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, আমাদের সবারই এটার পেছনে দায় আছে। আমাদের সবাই মিলে সরকারকে বাধ্য করতে হবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার।’