রমজান মাসের ব্যস্ত বিকেল। ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলো গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহলে মুখরিত। দিনের ক্লান্তি, যানজট আর কাজের চাপ উপেক্ষা করেই কর্মব্যস্ত মানুষজন প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইফতারের। কেউ অফিস থেকে ফিরছেন, কেউবা এখনো কাজ শেষ করেননি। সময়ের অভাবে অনেকে বাসায় ফিরতে পারেন না। ফলে রাস্তার পাশের ফুটপাতই হয়ে ওঠে তাদের ইফতার করার স্থান।
মঙ্গলবার (১১ মার্চ) আগারগাঁও, কলেজগেট, শ্যামলী, ফার্মগেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও কাওরান বাজার এলাকাতেও এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
এসব জায়গায় রাস্তার ধারে ফুটপাতে জমে উঠেছে ইফতারের আয়োজন। কোনো স্থায়ী ছাদ নেই, নেই আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা তবু ইফতারের আয়োজনে কোনো কমতি ছিল না।
আগারগাঁও মোড়ে ফুল মার্কেটের ফুটপাতে কয়েকজন পত্রিকা বিছিয়ে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তারা প্রত্যেকেই ওই মার্কেটের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী। জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘সারা বছর তো আর এমন সুযোগ আসে না। তাই রমজান মাসে সবাই একসঙ্গে ইফতার করি। আসলে একসঙ্গে সবাই ইফতার না করলে পূর্ণতা আসে না।’
রাস্তার ধারে ফুটপাতে বসে ইফতার করছিলেন রিকশাচালক আবদুল মালেক। হাতে ছোলা, বেগুনি, পেঁয়াজু আর একটি কলা। দাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘এই কয়টা আইটেম ৪০ টাকা দিয়ে কিনলাম। পানি বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি।’ তার পাশেই বসে থাকা দিনমজুর নুরুল ইসলাম জানালেন, ‘কাজ শেষে ইফতার কিনতে টাকা বেশি থাকে না। ঈদে পরিবারের কেনাকাটার জন্য কিছু অতিরিক্ত টাকা সঞ্চয় করছি। তাই ইফতারের জন্য কম বাজেট রাখি।’
প্রতিদিন কোথায় ইফতার করা হয় জানতে চাইলে আরেক রিকশাচালক শামীম আলী জানালেন, ‘দিনভর রাস্তায় থাকি, বাসায় গিয়ে ইফতার করা সম্ভব হয় না। তাই যেখানে সন্ধ্যা হয়, সেখানেই ইফতার করি।’
তবে জিয়া উদ্যান ও সংসদ ভবনের আশপাশে দেখা গেল অন্য চিত্র। পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে কেউ কেউ একসঙ্গে খোলা আকাশের নিচে বসে ইফতার করছেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘রমজানে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ইফতার করার চেষ্টা করি। খোলা বাতাসে বসে ইফতার করলে অন্যরকম শান্তি লাগে।’
বিকেল হতেই ফুটপাতের ছোট দোকানগুলোর ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপিসহ নানা পদের ইফতারি সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। পথচারীরা দ্রুত কিনে নেন প্রয়োজনীয় খাবার। কেউবা ফুটপাতেই একটু ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে ইফতারের বন্দোবস্ত করছেন।
ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের ইফতারসামগ্রী বিক্রেতা বাবুল মিয়া বলেন, ‘বিক্রি ভালো হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করি কম দামে ভালো খাবার দিতে, যাতে সবাই ইফতার করতে পারেন।’ তার দোকানে ছোলা ভুনা (হাফ প্লেট ৩০ টাকা, ফুল প্লেট ৬০ টাকা), পেঁয়াজু (প্রতি পিস ৫-১০ টাকা), বেগুনি (৫-১৫ টাকা), জিলাপি (২০০-৩০০ টাকা প্রতি কেজি) পাওয়া যায়।
ফার্মগেটের খামারবাড়ি মোড়ে বিক্রি হতে দেখা গেছে হালিম, জিলাপি, জালিকাবাব, নানরুটি, শামিকাবাব, চিকেন চাপ, শিককাবাবসহ ইফতারসামগ্রী। দোকানের বাইরে বিকেল থেকে মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তারা বলছেন, ‘সন্ধ্যার কিছু সময় আগে সবকিছু গরম পাওয়া যায়, তাই সেসময় ভিড় জমে।’
ইফতারসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন বিক্রেতা আবদুল হালিম। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই ইফতারসামগ্রী বিক্রি করি। মানুষ সাধারণত আসরের নামাজ পড়ে ইফতারসামগ্রী কিনতে আসতে শুরু করেন। ইফতারের এক ঘণ্টা আগে থেকে ভিড় জমতে শুরু করে। আর আধা ঘণ্টা আগে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। সবচেয়ে বেশি বিক্রির তালিকায় রয়েছে পেঁয়াজু, ছোলা, মুড়ি আর বেগুনি। জিলাপিও কিনেন বেশির ভাগ মানুষ। দাম তুলনামূলক নাগালের মধ্যে। তাই কেনাবেচাও ভালো।’