শত বছরের শোষণ-বঞ্চনা আর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে ৫৪ বছর আগে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা করেছিলেন ধনুকভাঙা পণ। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করবেন বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সম্মুখ সমরে। মুহুর্মুহু গেরিলা আক্রমণে প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে ধরাশায়ী করেছিলেন তারা। দেশের সূর্যসন্তানদের স্বপ্ন ছিল, বৈষম্যহীন এক সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের; যেখানে থাকবে না ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বঞ্চনা।
বুধবার (২৬ মার্চ) সকালে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছিলেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।
তাদের একজন আয়শা মেহজাবিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘৯ মাস দীর্ঘ যুদ্ধের পর আমরা লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। বীর শহিদদের স্মরণে আমরা দেশটাকে গড়ে তুলব। আর পেছনে তাকাব না। এখন সময় সামনে তাকানোর।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জিত হলেই চিরস্থায়ী হয় না। তাই স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের তৎপর থাকতে হবে।’
ততক্ষণে আয়শা-জুবায়েরের মতো শত তরুণ-তরুণীর শ্রদ্ধার ফুলে ভরে যায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহিদ বেদি। এদিন শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা; এসেছিলেন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরাও। লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে তারা শপথ নেন জাতীয় ঐক্যের। বিভেদ, বিভাজন দূর করে সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
প্রত্যুষে তোপধ্বনির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করে পুরো জাতি। লাখো মানুষের ঢল নামে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায়। সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে তোপধ্বনির মাধ্যমে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। পরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, বিভিন্ন সংগঠন, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহিদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। আরও শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের উভয় (আপিল ও হাইকোর্ট) বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে পরিবেশ-বন-জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি। যদিও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তবে মতপার্থক্য কমিয়ে জাতীয় স্বার্থে একত্রিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য রাজনৈতিক ও নীতিগত ঐকমত্য প্রয়োজন। জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘একাত্তরের অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করার যে কঠিন লড়াই, সেই লড়াইয়ের অন্যতম একটি ধাপ হচ্ছে চব্বিশ। এই স্বাধীনতাই সামনের দিনগুলোতেও বাংলাদেশে থাকবে। আর কখনো এই স্বাধীন ভূখণ্ডে মানুষ আর পরাধীনতা অনুভব করবে না।’
দেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে ঐক্যের কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান। রাজনীতিবিদদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে আবার বিভাজন তৈরি করছি। এটা ছাত্র-জনতার রক্তের অঙ্গীকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।’ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের সময় এসেছে। বহুদিন পর নতুন একটা সময় এসেছে, আমাদের এটা দরকার ছিল।’
বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাকসহ অন্যরা। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টি, চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের নেতৃত্বে সিপিবি, সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের নেতৃত্বে বাসদ, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের নেতৃত্বে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন শ্রদ্ধা জানায়। সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কোনো নব্য ফ্যাসিবাদের উত্থান বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।’ জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আরেকটি সুযোগ বাংলাদেশের কাছে এসেছে। আমরা কীভাবে রাষ্ট্র ও সব কাঠামোকে জনগণের পক্ষে জনগণের রাষ্ট্র তৈরি করতে পারি। সেই জায়গায় তাদের সবার ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।’ সাইফুল হক বলেন ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার গৌরবকে আড়াল করে আমাদের সামনে এগোনো যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ জাতীয় কর্তব্য সম্পন্ন করতেই ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান।’
হট্টগোল, মারামারিতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি
এদিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে এসে হট্টগোল ও মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে আহত হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতা। আহতরা হলেন, ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বদরুল আলম সুমন ও সাভার পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব দেলোয়ার হোসেন মাতবর। তাদের ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া লাল পতাকা হাতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ায় উপস্থিত জনতার হাতে আটক হয়েছেন আওয়ামী লীগের তিন নেতা-কর্মী। পরে তাদের আশুলিয়া থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।