বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জুলাই সনদ’ ও ঐকমত্য কমিশনের সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে। এক কথায় বলা যায়, সব মহলে এ বিষয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর চিন্তার প্রতিফলন। এ বিষয়ের সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। কমিশনের প্রস্তাবগুলো একদিকে রাজনৈতিক সংস্কারের সাহসী পদক্ষেপ, অন্যদিকে এগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে নানা জটিলতা, দ্বন্দ্ব ও আশঙ্কা। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, যাতে সংসদ তার ইচ্ছামতো সংবিধান পরিবর্তন করতে না পারে।’ এ বক্তব্য মূলত একটি মৌলিক নীতির প্রতিফলন, যেখানে সংবিধানকে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পারস্পরিক অংশগ্রহণ ও সমঝোতার ভিত্তিতে, তা নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগামী ভাবনা।
তবে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন হলো- এ সংস্কারের প্রক্রিয়া কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে? ঐকমত্য কমিশন বলছে, সংবিধান সংশোধনের বাইরের নয়টি সুপারিশ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার, সরকারি সেবা ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি। এসব উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও প্রশ্ন জাগে- নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যখন সংস্কার করা হয়, তখন সংসদীয় বিতর্ক বা বিরোধী মতামতের সুযোগ কতটা থাকে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রায়ই অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। ফলে এ দ্রুততা কখনো কখনো অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার জায়গায় ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তাই, গতি আর গণতন্ত্রের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রয়োজন, তা রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, এ প্রক্রিয়ার ওপর তাদের আস্থা এখনো দৃঢ় নয়। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে বিএনপির বক্তব্যে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো গণভোট আয়োজনের সুযোগ নেই; গণভোট ও নির্বাচন একই দিনে, পৃথক ব্যালটে হতে হবে। এটি কেবল টেকনিক্যাল প্রশ্ন নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক অবিশ্বাসের প্রতিফলন। বিএনপি আশঙ্কা করছে, ক্ষমতাসীন পক্ষ এ প্রক্রিয়াকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স অভিযোগ করেছেন যে, কমিশনের প্রতিবেদনে পূর্ববর্তী ভিন্নমত ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়া হয়েছে, অথচ সেটিকে ‘ঐকমত্য’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ঐকমত্যের নামেই নতুন বিভাজন তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
এ পরিস্থিতি এক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশে ‘আলোচনাভিত্তিক গণতন্ত্র’ এখনো দৃঢ় ভিত্তি পায়নি। ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির কাঠামো গড়ে তোলা হয়, তবে সেখানে সব পক্ষের মতামত গ্রহণ, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা অপরিহার্য। কিন্তু যদি ঐকমত্য কেবল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর বা ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে এবং রাজনৈতিকভাবে উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে।
সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সীমা। কমিশন প্রস্তাব করেছে, পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধি দিয়ে গঠিত পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করবে। এই সময়সীমা যুক্তিযুক্ত হলেও তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে আলোচনার পরিধি, অংশগ্রহণের ব্যাপ্তি ও বিতর্কের গভীরতার ওপর।
সংবিধান সংস্কার কোনো প্রশাসনিক কাজ নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সামাজিক চুক্তির পুনর্লিখন। তাই সময়ের সংকোচন গণতান্ত্রিক সংলাপের গভীরতাকে কমিয়ে দিতে পারে। দ্রুততা দেখাতে গিয়ে যদি পর্যালোচনা, পরামর্শ ও ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত করা হয়। তবে ভবিষ্যতে এ সংস্কারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। অন্যদিকে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংস্কারের বিষয়টি একটি ইতিবাচক দিকও বটে। অনেক সময় রাজনৈতিক ও সংসদীয় জটিলতায় প্রস্তাবগুলো দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকে। কমিশনের এ প্রস্তাব প্রশাসনিক গতি বাড়াতে পারে, যা সাধারণ নাগরিকের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন- এ গতি কি রাজনৈতিক বৈধতা দিয়ে সুরক্ষিত? জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আলোচনা ছাড়া যেকোনো নির্বাহী আদেশ গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, কোনো সংস্কার তখনই টেকসই হয় যখন তা রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালের ১২তম সংশোধনী তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ- যেখানে শাসনব্যবস্থার রূপান্তর হয়েছিল সংসদীয় ঐকমত্যের মধ্যদিয়ে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, দলীয় বিভাজন এত গভীর যে, ‘ঐকমত্য’ শব্দটাই অনেকের কাছে সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। তাই কমিশনের প্রস্তাব কেবল সংবিধান সংস্কার নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠনেরও একটি সুযোগ।
অবশ্য এ কথাও অস্বীকার করা যায় না যে, বাংলাদেশের জনগণ এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিচার বিভাগের জবাবদিহি ও সেবা প্রদানে কার্যকারিতা চায়। কমিশনের সুপারিশে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকায় এটি নিঃসন্দেহে নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে, বিচারব্যবস্থায় গতি আসবে এবং রাষ্ট্রের সেবাদান প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল হবে। রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া এসব কাঠামোগত পরিবর্তন কেবল উপসর্গ নিরাময়ের সমাধান- মূল রোগ থেকে মুক্তি নয়।
সবশেষে বলা যায়, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একদিকে আছে সংস্কারের আশাবাদ, অন্যদিকে রয়েছে আস্থার সংকট। এ দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি। সংবিধান কোনো দলীয় দলিল নয়; এটি জনগণের চুক্তি। সেই চুক্তি যদি জনগণের চোখের আড়ালে সংশোধিত হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। যদি স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এ সংস্কার সম্পন্ন হয়, তবে এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সংস্কারের প্রক্রিয়াকে রাজনীতির প্রতিযোগিতা নয়, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



