সামনে নির্বাচনের তারিখ দেওয়া আছে এবং সব দল নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মনোনয়নও দেওয়া আছে, দিচ্ছে। সেদিকে অগ্রসর হলে তো অসুবিধা নাই। এখন কোনো কোনো দল মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আগেই তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাকে একটা জরুরি বিষয় মনে করছে। একটা উত্তেজনা কিংবা উদ্বেগের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এ কারণেই। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সমাধান করলে তো কোনো অসুবিধা নাই। এখন সমস্যার বা বিতর্কের কেন্দ্রীয় জায়গাটা হচ্ছে জুলাই সনদ। জুলাই সনদ তো নিজেই একটা সমস্যা। জুলাই সনদ নিয়ে বহু ধরনের প্রশ্ন আছে।
একটা হচ্ছে এতে যেভাবে ইতিহাস বলা আছে সেটা খুবই খণ্ডিত ইতিহাস। এতে বাছাই করা কিছু তথ্য কিংবা নিজেদের সুবিধা মতো কিছু ব্যাখ্যা আছে। ইতিহাসটা মোটেই, এত পুরোনো কাল থেকে বলা আছে; সামগ্রিক ইতিহাস বলা যাবে না। আবার যেহেতু খণ্ডিত, সুতরাং এটাকে গ্রহণযোগ্যও বলা যাবে না। এটা হচ্ছে জুলাই সনদের একটা সমস্যা। আরেকটা হচ্ছে, জুলাই সনদের মধ্যে অনেকগুলো করণীয় নির্ধারণ করা আছে। আবার সেখানে নোট অব ডিসেন্টও আছে। এখন এটা নিয়ে সব কটি দলই গণভোটে একমত, কখন হবে সেটা নিয়েই বিতর্ক। কিন্তু গণভোট কীভাবে হবে, সেটাই আমার প্রশ্ন। এক হচ্ছে ইতিহাসের সমস্যা, আরেকটা হচ্ছে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে।
যেকোনো গণভোটে সাধারণত ছোট্ট একটা প্রশ্ন থাকে, একটা নির্দিষ্ট বিষয় থাকে; যেমন জিয়াউর রহমানের সময়ে বা এরশাদের সময় গণভোটে দেখেছি যে একটা নির্দিষ্ট প্রশ্ন ছিল। ‘জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট, আপনি গ্রহণ করেন কি না?’ কিন্তু এখন ৪৮টি বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা আছে, কেউ এর মধ্যে কিছু ‘হ্যাঁ’ বলতে পারে, কিছু ‘না’ বলতে পারে। কিন্তু তার পরিবর্তে হয় সব কটিতে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে অথবা সব কটিতেই ‘না’ বলতে হবে। এটা তো মহামুশকিল, মানে, এতগুলো বিষয় নিয়ে কোনো গণভোট হতে পারে না। এটা কোনো গ্রহণযোগ্য পথ না। আর নোট অব ডিসেন্ট যে আছে, সেসব বাদ দিয়ে দিলে তো কোনো দায়িত্বশীল কাজ হলো না। নোট অব ডিসেন্ট যেসব রাজনৈতিক দল দিয়েছে, তাদের নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া তো একধরনের প্রতারণা হলো। এটাও তো গ্রহণযোগ্য না। কাজেই জুলাই সনদ নিয়ে এই ধরনের ধস্তাধস্তি কিংবা জুলাই সনদ একটা অসম্পূর্ণ, খণ্ডিত- যেমন নারী কমিশনের স্পষ্ট আপত্তি আছে। তাদের বিষয়ে কোনো কথাই নাই। শ্রমিকদের বিষয়ে কথা নাই। অন্য অনেকগুলো কমিশনের কোনো সুপারিশ এখানে নাই, এসব নিয়ে আপত্তি আছে। এ রকম অসম্পূর্ণ, খণ্ডিত এবং বিতর্কিত; অনেক অস্পষ্ট বিষয় নিয়ে একটা সনদ, সেটা কী করে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে যেতে পারে। অথচ এটা নিয়েই গণ্ডগোল। আমি মনে করি, রাজনৈতিক দল যারা এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছে, যারা এটার ওপরে জোর-জবরদস্তি করছে- এখনই গণভোট করতে হবে, তারা একটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মনে হচ্ছে, জুলাই সনদ হুট করে পাস করতে না পারলে আমাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না বা আমাদের কর্তৃত্ব থাকবে না। এটা তো ঠিক না, তারা নির্বাচনে গেলে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা জনগণের রায় পাবে, কোনো অসুবিধা নাই। জুলাই সনদে যে অসম্পূর্ণতা আছে, সেটা সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় কমিটি হতে পারে, সরকার উদ্যোগ নিতে পারে এবং সেগুলো পরবর্তী নির্বাচনে যারা সংসদে আসবে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
সমাধানের পথটা হচ্ছে, কোনো দল বা গোষ্ঠী যদি গায়ের জোরে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় সমস্যা সেখানেই। সমস্যা থেকে উত্তরণের পথটা হচ্ছে দলগুলো যদি জনগণের ওপর আস্থা রেখে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য পরিষ্কার পথ নেয় এবং এই জটিলতা তৈরির পেছনে সরকারের দায়িত্বটা হচ্ছে সরকার সুস্পষ্ট বা পক্ষপাতহীন অবস্থান নেয় নাই। সরকারের মধ্যে যথেষ্ট পক্ষপাতের ব্যাপার ছিল। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি- তিনটা দলেরই প্রভাব আছে সরকারের ওপর। সেখানে আবার জামায়াতের কর্তৃত্বটাই বেশি মনে হচ্ছে। এ রকম পক্ষপাত থাকলে, সরকার যদি নিজে পক্ষপাতহীন না হয়, পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলেই জটিলতা হয়। সরকার যদি নিজে পরিষ্কার থাকতে পারত, স্পষ্ট থাকতে পারত এবং জনগণের স্বার্থরক্ষার জন্য যথাযথভাবে নির্বাচন করার ব্যাপারে মূল ফোকাসটা রাখত, তাহলে এই জটিলতা হতো না। এখন সবকিছুই সরকারের ওপর নির্ভর করছে।
আনু মুহাম্মদ: রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
.jpg)
