বিমান চলাচল বৈশ্বিক সংযোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) সৃষ্টির পর থেকে বেসামরিক বিমান চলাচলের সম্প্রসারণ ঘটে চলেছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। এ শিল্পটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ, সহজতর হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জাতীয় জীবনে অনুপ্রাণিত হয়েছে বৈচিত্র্যময় কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ। অ্যাভিয়েশন কেবমলমাত্র মানুষ এবং ভৌত মালামালের পরিবহনের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয় না, এটি আমাদের বিজ্ঞান সাধনার উচ্চতর বিষয়গুলোর অন্বেষণের প্রতি স্পৃহারও জন্ম দেয়। মানব কর্মকাণ্ডের খুব অল্প ক্ষেত্রে দেখা যায় যেখানে পেশাগত গতিশীলতার জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডলটি প্রতিনিয়ত প্রবর্তিত, রূপায়িত, সংশোধিত এবং উদ্ভাবিত হচ্ছে।

বৈশ্বিক বিমানশিল্পের অতীত পূর্বাভাসের অবিরত সম্ভাবনার ইঙ্গিত ভবিষ্যতে অ্যাভিয়েশনের চ্যালেঞ্জগুলো গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করার প্রতি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বের প্রতি সচেতন হওয়ার সুপারিশ জ্ঞাপন করে। বৈশ্বিক এয়ারলাইনসশিল্পে যাত্রী পরিবহনের সংখ্যা ২০৩৭ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৭.৮ বিলিয়নে পৌঁছাবে। যে মহাদেশটি সবচেয়ে বেশি এ প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি হবে তা হলো এশিয়া। এই দ্রুততম বৃদ্ধির সঙ্গে রয়েছে প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ গ্রহণের পেশাভিত্তিক এবং কাঠামোগত বহুমাত্রিক পরিধি। আন্তর্জাতিক বিমানশিল্পে যোগ্যতাসম্পন্ন মানবসম্পদের সাংঘাতিক ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিমান অপারেটর, সেবা প্রদানকারী এবং রাষ্ট্রীয় রেগুলেটরদের ওপর যোগ্যতাসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরির এক বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিমান অপারেটারের দায়িত্ব এয়ারলাইনসগুলো পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয় রেগুলেটর এবং সেবা প্রদানকারী উভয়ের দায়িত্ব বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) ওপর ন্যস্ত।
ICAO-এর পরিসংখ্যান মোতাবেক আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলশিল্পে ২০৩৬ সালের মধ্যে ৬ লাখ ২০ হাজার জন পাইলট, ১.৩ মিলিয়ন মেইন্টেন্যান্স কর্মী এবং ১ লাখ ২৫ হাজার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের প্রয়োজন হবে। দুঃখের বিষয় হলো, যদিওবা ভবিষ্যতে এশিয়া হবে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্ব বিমান চলাচলের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং একাডেমিক উৎস উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে অবস্থান করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এশিয়া তার মানবসম্পদকে দক্ষ প্রযুক্তি ধাবিত শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান অ্যাভিয়েশনশিল্পের দিকে দেখা যাক। IATA-এর ডাটা মোতাবেক বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশনশিল্প ৪ লাখ ৭৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত, তার মধ্যে ২৯ হাজার ২০০ জন প্রত্যক্ষভাবে অ্যাভিয়েশনে কর্মরত। জাতীয় অর্থনীতিতে এ শিল্পের অবদান বার্ষিক ৫.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তার মধ্যে রয়েছে শিল্পে নিয়োজিত প্রত্যক্ষ চাকরি ব্যতীত০ সরবরাহ ব্যবস্থাপনার প্রভাব, অ্যাভিয়েশন সমর্থিত পর্যটনশিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। প্রত্যক্ষ অ্যাভিয়েশন দ্বারা প্রতি বছর ২.৫ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির (GDP) ১.২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় অ্যাভিয়েশনে পাকিস্তানের অবদান প্রবৃদ্ধির ১.৭ শতাংশ এবং ভারতের ১.৫ শতাংশ। সিঙ্গাপুর ছোট রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও অ্যাভিয়েশন শিল্প জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ৫ শতাংশ অবদান রাখছে।
IATA-এর ভবিষ্যদ্বাণী বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশনশিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরেছে। বর্তমান বাজার চাহিদাকে ভবিষ্যৎ পটভূমিতে প্রক্ষেপ করে সংস্থাটি বলছে যে, ২০৩৮ সালের মধ্যে অ্যাভিয়েশন বাজার শতকরা ১৬০ ভাগ বৃদ্ধি পাবে, ফলে ১ লাখ ৪০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং অতিরিক্ত ২.১ বিলিয়ন ডলার জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। এখন প্রশ্ন হলো, অ্যাভিয়েশনশিল্পকে গতিশীল করতে যে দক্ষ মানবসম্পদ প্রস্তুত করার প্রয়োজন হবে, তা কীভাবে বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব হবে।
যেকোনো রাষ্ট্রের অ্যাভিয়েশনশিল্পকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে চারটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এ চারটি প্রতিষ্ঠানের চাহিদাই রাষ্ট্রীয় অ্যাভিয়েশনশিল্পের কৌশল নির্ধারণের ভূমিকা পালন করে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ব্যবস্থাকে (Integrated System) আমরা বলে থাকি ‘State-Industry-Academia-Military Collaboration.’ এ চারটি সত্তার সহযোগিতার দুর্গম পথ প্রশস্ত করার দায়িত্ব হবে বর্তমান অ্যাভিয়েশন পেশাজীবীদের। এ চারটির মধ্যে আবার রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ, রাষ্ট্র অ্যাভিয়েশন পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের নিরাপদ এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর নিকট দায়ী। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে গ্লোবাল সিভিল অ্যাভিয়েশনে এ দায়িত্ব পালন করে থাকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)। CAAB-এর দক্ষতা, গতিশীলতা এবং জ্ঞানপ্রসূত মেধা একটি রাষ্ট্রের বেসামরিক অ্যাভিয়েশন উৎকর্ষতার প্রধান প্রতিফলন।
এখানে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, ভবিষ্যতে অ্যাভিয়েশনশিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ সরবরাহের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হলো একাডেমিয়ার। বাংলাদেশে অ্যাভিয়েশনের জন্য সরকার ২০১৯ সালে আইনের মাধ্যমে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি অ্যাভিয়েশন এবং অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (AAUB) নামে পরিচিত। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ জন ছাত্রছাত্রী গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে। AAUB-কে অধিক সংখ্যায় অ্যাভিয়েশন গ্র্যাজুয়েটদের উত্তীর্ণ করতে হলে এবং যুগোপযোগী অ্যাভিয়েশন প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ণ নিশ্চিত করতে হলে অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিরও দায়িত্ব অনস্বীকার্য। পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইনসের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এ এয়ারলাইনসগুলো সমসাময়িক Time-Driven কোর্স পরিচালনা করে থাকে।
একাডেমিয়া এবং এয়ারলাইনসের সহযোগিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি। এয়ারলাইনসগুলো চালিত হয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য দ্বারা এবং প্রায়শই একাডেমিয়াকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। আগামী দিনের অ্যাভিয়েশনশিল্পের অগ্রগতীর জন্য এ ধরনের মনোভাব নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশে EASA Part-147 অনুমোদিত কেবলমাত্র একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। BATC নামে পরিচিত এ কেন্দ্রটি আমাদের জাতীয় পরিবহন বিমান দ্বারা পরিচালিত হয়। কেবল একটি মাত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যে কত অপ্রতুল, তা চিন্তার অবকাশ রাখে না। এর ফলে যা হচ্ছে, দেশি এয়ারলাইনসগুলো বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার এবং পাইলটদের উচ্চ বেতনে চাকরি দিতে বাধ্য হচ্ছে। অতএব, BATC এবং AAUB-এর সহযোগিতা অত্যাবশ্যকীয়, যাতে করে স্বদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সুবিধা হয়। এর ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
CAAB সর্বদাই ICAO-এর অডিট নজরদারির আওতাভুক্ত। অতএব, CAAB-এর নৈতিক দায়িত্ব হলো ICAO-এর স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্যগুলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা। এ লক্ষ্যগুলো পূরণ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আন্তর্জাতিক গুণগত মানসম্পন্ন দক্ষ পরবর্তী প্রজন্মের অ্যাভিয়েশন পেশাজীবী (Next Generation of Aviation Professional) তৈরি না করতে পারব। একটু গভীরভাবে অনুধাবন করলে দেখতে পাব যে, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর (SDGs) অন্তত ছয়টি লক্ষ্য (লক্ষ্য ৪, ৫, ৮, ৯, ১১ এবং ১৩) অর্জন দক্ষ অ্যাভিয়েশন পেশাজীবীদের দ্বারা সম্ভব। স্মরণ রাখতে হবে যে, CAAB, একাডেমিয়া এবং এয়ারলাইনসকে ICAO-এর স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে সহায়তা করার মূল চালিকাশক্তি।
ICAO, সামরিক এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যাকে সংস্থাটির ভাষায় Civil Military Co-Operation (CIMIC) বলা হয়। এর কারণ হলো, সামরিক এবং বেসামরিক বিমান চলাচল জাতীয় নিরাপত্তা এবং অ্যাভিয়েশন সেফটির সর্বোত্তম মান বজায় রাখতে পারে। বেসামরিক কর্তৃপক্ষদ্বয়কে নেভিগেশন, এয়ার ট্রাফিক, অ্যাভিয়েশন সেফটি এবং অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমন্বয়ের কথা দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে। সিভিল-মিলিটারির সহযোগিতার জন্য একাডেমিয়া, CAAB এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একযোগে কাজ করা অনস্বীকার্য।
জাতীয় অ্যাভিয়েশনকে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এ শিল্পকে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। এর চারটি অংশ নিয়ে আমরা যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করলাম তাদের প্রত্যেকটিকেই সংঘবদ্ধ করে একটি জাতীয় অ্যাভিয়েশন কৌশলপত্র প্রস্তুত করা অত্যন্ত বাঞ্চনীয়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশনের ক্ষেত্রে ক্রমাগত প্রযুক্তি এবং একাডেমিক অগ্রগতির আলোকে রেগুলেটর, একাডেমি, ইন্ডাস্ট্রি এবং বিমান বাহিনীর সঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশনের মানদণ্ডের সমান্তরালে চলতে সক্ষম হবে। অন্যথায়, এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কি না অ্যাভিয়েশনপ্রসূত প্রজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার সম্মুখীন হবে।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তা



