যিশু খ্রিষ্ট আজও আমাদের পথ দেখান- শান্তির পথ, সত্যের পথ এবং পূর্ণ জীবনের পথ। ঈশ্বর বা পিতার কাছে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলেন যিশু খ্রিষ্ট, তার শিক্ষা, আদর্শ ও বিশ্বাস অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল পরিত্রাণ ও অনন্ত জীবন লাভ করা সম্ভব, অন্য কোনো উপায়ে নয়। এই বড়দিনে আমরা যেন সেই আশার আলোকে গ্রহণ করি এবং আমাদের পরিবার, সমাজ ও জাতির জীবনে তা প্রতিফলিত করি। শুভ বড়দিন। ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন।...
বাংলাদেশসহ আজকের বিশ্ব নানা সংকটের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যবৃদ্ধি, সামাজিক বিভাজন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের মনে ভয় ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে শান্তি যেন ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে। এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বড়দিন উদ্যাপনের প্রশ্নটি গভীর অর্থ বহন করে- এ অশান্ত সময়ে বড়দিন আমাদের কী বার্তা দেয়?
বড়দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ঈশ্বর মানুষের কষ্ট, ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝেই মানুষের কাছে এসেছেন। যিশু খ্রিষ্ট কোনো আরামদায়ক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেননি। তার জন্ম হয়েছিল রাজনৈতিক দমনপীড়ন, শোষণ ও নিরাপত্তাহীনতার সময়ে। রোমান সাম্রাজ্যের করের বোঝা, ক্ষমতার নির্যাতন ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে এক সাধারণ গোয়ালঘরে তার আগমন ঘটে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
এ দেশে আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন অনেক মানুষ ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবনের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বিগ্ন। সমাজে অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বড়দিন আমাদের আশ্বাস দেয়- ঈশ্বর দূরে নন; তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। বাইবেলের ভাষায়, তিনি ইম্মানুয়েল- ‘ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে’।
যিশুর জন্ম ছিল সব মানুষের জন্য সুসমাচার। স্বর্গের দূতগণ ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য মহান আনন্দের সংবাদ আনছি, যা সব মানুষের জন্য।’ এ আনন্দ কোনো সাময়িক উল্লাস নয়; এটি মুক্তি ও আশার আনন্দ। এটি ঘোষণা করে যে, অন্ধকার শেষ কথা নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিক চাপে ক্লান্ত মানুষের জন্য বড়দিন তাই আশার সাহসী বাণী।
যিশু খ্রিষ্টকে বাইবেলে বলা হয়েছে শান্তিরাজ। তিনি এমন শান্তির কথা বলেন যা কেবল অস্ত্রবিরতি বা ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, বরং ন্যায়, ক্ষমা ও ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আজ যখন বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করছে, তখন যিশুর এ শান্তির দর্শন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শেখান- সহিংসতা নয়, সংলাপ; প্রতিহিংসা নয়, ক্ষমা; দমন নয়, ন্যায়বিচারই টেকসই শান্তির পথ।
যিশু নিজেই বলেছেন, ‘আমি পথ, সত্য ও জীবন।’ এ ঘোষণা আজকের সমাজে গভীর তাৎপর্য বহন করে। যখন সত্য বিকৃত হয়, নৈতিকতা আপসের শিকার হয় এবং জীবন অনেকের কাছে অর্থহীন মনে হয়, তখন যিশু আমাদের সঠিক পথের দিশা দেন। তিনি শুধু একটি ধর্মীয় স্মৃতি নন; তিনি জীবনের পূর্ণতার আহ্বান। তার শিক্ষা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, দুর্বলদের পাশে থাকতে এবং সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে অনুপ্রাণিত করে।
বড়দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যিশুর জন্ম কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়। তিনি আজও জীবিত ও সক্রিয়। তিনি প্রতিদিন আমাদের জীবনে আসেন- ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মধ্যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদে, বিভক্ত সমাজে মিলনের প্রচেষ্টায়। তবে বড়দিনে আমরা বিশেষভাবে উপলব্ধি করি যে, ঈশ্বর নিজেকে মানুষের জন্য সর্বোচ্চ উপহার হিসেবে দান করেছেন।
সংকটের মধ্যে বড়দিন উদ্যাপন মানে বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে আশার ঘোষণা দেওয়া। এটি আমাদের শেখায়- ভয়ের মধ্যেও বিশ্বাস রাখা যায়, অশান্তির মধ্যেও শান্তির বীজ বপন করা যায়। বড়দিন আমাদের প্রত্যেককে আহ্বান জানায়, আমরা যেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে শান্তির নির্মাতা হয়ে উঠি।
বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় সমাজে বড়দিনের এ বার্তা কেবল খ্রিষ্টানদের জন্য নয়; এটি সব মানুষের জন্য। সত্যিকার অর্থেই যিশু সর্বজনীন, কেননা তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিনির্বিশেষে সব মানুষের কল্যাণপ্রত্যাশী। ধনী-গরিব, অবহেলিত-বঞ্চিত ও সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষকে তিনি ঈশ্বরের বাণী শুনিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে মহিমান্বিত করেছেন। সমাজে বিদ্যমান সীমাহীন বিভাজনের মধ্যে তার ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ন্যায় ও শান্তির এ আহ্বান জাতি গঠনের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অতএব, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক সংকটের মধ্যেও বড়দিন গভীর অর্থ বহন করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসেন, আমাদের সঙ্গে আছেন এবং আমাদের পরিত্যাগ করেন না। যিশু খ্রিষ্ট আজও আমাদের পথ দেখান- শান্তির পথ, সত্যের পথ এবং পূর্ণ জীবনের পথ। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমিই পথ, আমিই সত্য, আমিই জীবন, আমা দিয়া না আসিলে কেহ পিতার কাছে পৌঁছে না’, যোহন: ১৪:৬ পদ। যার মূল অর্থ হলো, ঈশ্বর বা পিতার কাছে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলেন যিশু খ্রিষ্ট, তার শিক্ষা, আদর্শ ও বিশ্বাস অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল পরিত্রাণ ও অনন্ত জীবন লাভ করা সম্ভব, অন্য কোনো উপায়ে নয়।
এই বড়দিনে আমরা যেন সেই আশার আলোকে গ্রহণ করি এবং আমাদের পরিবার, সমাজ ও জাতির জীবনে তা প্রতিফলিত করি।
শুভ বড়দিন। ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন।
লেখক: অধ্যক্ষ, নটরমেড কলেজ, ঢাকা
[email protected]



