বেসরকারি খাতে যেসব দক্ষ কর্মকর্তারা কাজ করছেন, তার অবদানের সঙ্গে মিলিয়ে সরকারি খাতে যে ধরনের কাজ সেটা আপেক্ষিকভাবে মিলিয়ে দেখারও সুযোগ আছে। সে জায়গায় নজর দেওয়া দরকার। সরকারি খাতে যা দেওয়া হচ্ছে আর বেসরকারি খাতে যা দেওয়া হচ্ছে সেটা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উভয়ের কাজের অবদান, দক্ষতা, তার অবস্থান অনুযায়ী একটা ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটা মূল্যায়নের দরকার আছে।...
দেশে দক্ষতা উন্নয়নে এক ধরনের সমন্বয় দরকার আছে। সেটা বেসরকারি খাত বা সরকারি খাত উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। সরকারি খাতের জন্য সরকার দায়িত্বটা নেয়। বেসরকারি খাতের জন্য সরকার সে অর্থে দায়িত্বটা নেয় না। এটা বেসরকারি খাতের দায়িত্ব। কিন্তু সরকারের উচিত বেসরকারি খাতকেও একইভাবে সাহস দেওয়া বা অনুপ্রেরণা জোগানো। তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। কার্যত বেসরকারি খাত অপেক্ষাকৃত কাজের ব্যপ্তিতে অগ্রাধিকার পেলেও মজুরি আশাব্যঞ্জক নয়। বেসরকারি খাতের মজুরি বৃদ্ধি যাতে নিয়মিত হয়, সে জায়গাটায় বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ এবং উৎসাহিত করা জরুরি। এটা হলো একটা দিক। দ্বিতীয় দিক হলো- ঘোষিত পে-স্কেলের সঙ্গে পাবলিক সেক্টরের কনট্রিবিউশন বা সমন্বয় করে দেখা দরকার আছে। অর্থাৎ তারা কী পরিমাণ উৎপাদনশীল হচ্ছে, কী পরিমাণ লোকবল দরকার আছে, অনেক জায়গায় সুশৃঙ্খলভাবে তা করা দরকার। সেগুলো না করে শুধু একই লোকের পেছনে ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ নেই। সে জায়গাটায় কমিশনের রিপোর্টের সঙ্গে পাবলিক সেক্টরের দক্ষতা মূল্যায়ন দরকার। এখানে যে পরিমাণ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, তাদের শৃঙ্খলায় ফেরাতে হবে। মূল্যায়ন ছাড়া একই কাঠামোয় এত মজুরি বৃদ্ধি হয়তো যথার্থ হবে না। তার জন্য সময় দরকার। আমার ধারণা, সরকার হয়তো সে বিবেচনাগুলো করবে। একটা কথা সবসময় বলা হয় যে, পাবলিক সেক্টরে কর্মদক্ষ লোক থাকলেও তাদের কাজের বিনিময়ে যে মজুরি, সেটা আসলে যথাযোগ্য হয় না। সরকারি খাত অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। যেগুলো সর্বনিম্ন পর্যায়ে কমিয়ে আনা দরকার।
বেসরকারি খাতে যেসব দক্ষ কর্মকর্তারা কাজ করছেন, তার অবদানের সঙ্গে মিলিয়ে সরকারি খাতে যে ধরনের কাজ সেটা আপেক্ষিকভাবে মিলিয়ে দেখারও সুযোগ আছে। সে জায়গায় নজর দেওয়া দরকার। সরকারি খাতে যা দেওয়া হচ্ছে আর বেসরকারি খাতে যা দেওয়া হচ্ছে সেটা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উভয়ের কাজের অবদান, দক্ষতা, তার অবস্থান অনুযায়ী একটা ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটা মূল্যায়নের দরকার আছে।
আমাদের অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি। সেভাবে কর্মসংস্থান নেই। অনেক তরুণ যাদের আসলে কাজ নেই, তাদের কীভাবে কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটা ভাবতে হবে।
বেসরকারি খাতের কাজের সুযোগ সৃষ্টি শুধু বেসরকারি খাতের দায়িত্ব নয়। এর জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেন, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সেটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বলি, ব্যবসার পরিবেশ বলি তার অনেক জায়গাতেই ঘাটতি আছে। সরকার বলি বা নতুন সরকার বলি তারা যেন সেদিকে নজর দেয়। যাতে করে এখানে বিনিয়োগ হয়, নতুন কর্মসংস্থান হয়। শুধু নিচের গ্রেড নয়, ওপরের দিকেও যাতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সে জায়গাগুলোর ক্ষেত্রে অবশ্যই নজর দেওয়া দরকার।
এখানে বিভিন্ন টাইপের বেসিক সার্ভিস এবং ভালো গ্রাহকসেবা শুধু নয়, একই সঙ্গে মেধার সমন্বয় ঘটানো দরকার। মিডিয়াটেক, হাইটেক যেসব ইন্ডাস্ট্রি, সেগুলোর এখানে আসা নিশ্চিত করা দরকার। সব শ্রেণির কাজের সুযোগ সৃষ্টি হলে বেসরকারি খাতে মানুষ এক ধরনের প্রতিযোগিতা বোধ করবে। তখন বেসরকারি খাত তাদের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত কাজ সৃষ্টি হবে না এবং দেশে বিপুল বেকার থাকবে অথবা অর্ধবেকার থাকবে ততক্ষণ দেখা যাবে, বেসরকারি খাত এর সুযোগ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঠিকমতো মজুরি দেবে না। একটা প্রতিযোগিতামূলক নতুন মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ থাকা, কর্মসংস্থানের বিনিয়োগ থাকা জরুরি। সুতরাং, নতুন বিনিয়োগ আসতে হবে। সেখানে কাজের সুযোগ থাকতে হবে। একটা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হলে, সেই নিয়োগকর্তারা চাপের মুখে থাকবে এবং তারা তখন মজুরি বৃদ্ধি করবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক যারা আছেন তারা সবসময় বলেন, আমাদের মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাইরে থেকে মেধা আনছি বা মেধা ক্রয় করছি। এটা অবশ্যই যৌক্তিক। আমাদের দেশ থেকে যাদের আমরা যেতে দেখি এবং তারা বিভিন্ন দেশে যখন যাচ্ছেন তখন তারা সেখানেই তাদের কাজের সুযোগ করে নিচ্ছেন। এটা বৈধ, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে। আবার ইনফরমাল চ্যানেলে যাচ্ছে। তার পর অবৈধভাবে দেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের শর্ট ভিসা নিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। তারাও কিন্তু মোটামুটি দেখা যাবে যে, এখানে যথেষ্ট পড়াশোনা করে গেছে। হয়তো এইচএসসি পাস করেছে বা কেউ বিএ পাস করেছে, সেরকম ধরনেরও হয়তো প্রচুর ছাত্রছাত্রী যাচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে, এই যে গোষ্ঠীটা বিদেশে চলে যাচ্ছে তাদের জন্য দেশের ভেতরে আমরা যথেষ্ট মাত্রায় কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারিনি। ফলে তারা চলে যাচ্ছে। আর যাদের এখানে প্রয়োজন হচ্ছে, যারা বিদেশ থেকে আসছে, সেই যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন লোকজন এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তখন দেখা যাচ্ছে যে, স্থানীয় উদ্যোক্তারা অনেক সময় এখানে তাদের নিচ্ছেন। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, সরকারের কিছু অকার্যকর ভ্রান্ত নীতি আছে। বিদেশি শ্রমিক বা বিদেশি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের যে নীতি মেনে চলার কথা সেই নীতিটা ভিসা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ অথবা নিয়োগ কর্তৃপক্ষ অথবা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) যে পথ মেনে চলার কথা সেটা তারা অনেক সময় মানে না। ফলে দেখা যায় যে, এ ধরনের কর্মকর্তা ঠিকমতো নিয়ম বা আইন না মানার কারণে অথবা সেটা অন্য কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। দেখা যাচ্ছে যে, এখানে বিদেশিদের আসার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
আরেকটা বিষয় হলো- এখন শ্রমবাজার অনেক বেশি। সবকিছুই ডিজিটালাইজড হয়ে গেছে। অনেক ধরনের কাজই এখন উপস্থিতি না থাকলেও হয়। সেগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকেও করে দেওয়া যায়। ফলে সেসব কারণেও তুলনামূলকভাবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বা অন্যান্য দেশে যারা অপেক্ষাকৃত কর্মক্ষেত্রে সফল তারা অনেক সময় দূরবর্তী জায়গা থেকেও সার্ভিসগুলো দিচ্ছে। সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না নতুন দক্ষতাকে উন্নত করছে, পলিসিগত জায়গায় কঠোরভাবে ব্যবস্থা না রাখছে, বিদেশিদের ভিসা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়মিত মনিটর না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিদেশিদের আসা থামবে না। আবার দেশ থেকে যাওয়াটাও আসলে রোধ করা যাবে না। সমন্বয়ের প্রচণ্ড অভাব হয়েছে এবং ব্যয়-দুঃখতা তো আছেই। সর্বোপরি এটাই বলব যে, সরকারি-বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রেই মেধার সংস্কৃতি বিকাশের পাশাপাশি মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা সমন্বয় থাকা দরকার।
লেখক: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)



