শেষ পর্যন্ত নানা বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল শনিবার। দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় পর অনুষ্ঠেয় কাউন্সিলের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বহুল প্রতীক্ষিত ড্যাবের এবারের কাউন্সিলে সদ্য সাবেক সভাপতি ডা. হারুন-ডা. শাকিল এবং সাবেক সভাপতি ডা. আজিজ-ডা. শাকুরের নেতৃত্বে পৃথক প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ড্যাবের কাউন্সিলে শীর্ষ পাঁচটি পদের বিপরীতে দুটি প্যানেলের মোট ১০ প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। উভয় প্যানেলই নির্বাচনি ইশতেহারে ফ্যাসিবাদমুক্ত ড্যাব গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে উভয় প্যানেলের প্রার্থীরা সারা দেশে পরিচিতি সভা ও ভোটের জমজমাট প্রচারণা শেষ করেছেন। নির্বাচন উপলক্ষে রাজধানীর হাসপাতালগুলো ফ্যাস্টুন-ব্যানারে ছেয়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ, সাবেক পিজি) জাতীয়তাবাদী চিকিৎসকদের ব্যাপক সমাগমের মাধ্যমে হারুন-শাকিল প্যানেলের পরিচিতি সভা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজিজ-শাকুর প্যানেলও গতকাল বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে পরিচিতি সভা ও সংবাদ সম্মেলন করেছে। ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী ড্যাব পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন উভয় প্যানেলের প্রার্থীরা।
ড্যাব নেতারা জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল শনিবার ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে ড্যাবের কাউন্সিলের ভোট গ্রহণ হবে। কাউন্সিলে সারা দেশের প্রায় ৩ হাজার ১৩১ ভোটার উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। শনিবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোট গ্রহণ।
ড্যাবের কাউন্সিল প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার বলেন, ‘ড্যাবের কাউন্সিলে ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। ৯ আগস্ট উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হবে। এবারের কাউন্সিলে ড্যাবের প্রায় ৩ হাজার ১৫০ জনের (কম-বেশি) মতো কাউন্সিলর ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।’
তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ যেকোনো মূল্যে একটি সুন্দর কাউন্সিলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ড্যাবের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করতে হবে। আমরা সেদিকেই গুরুত্ব দিচ্ছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৪ মে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ সভাপতি এবং ডা. মো. আব্দুস সালাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই সঙ্গে হারুন-সালামের নেতৃত্বাধীন প্যানেল নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়। ২০২৪ সালের ২৫ মে কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ২৪ মার্চ পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে বিএনপি। পাশাপাশি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠানের জন্য ১২ সদস্যের সম্মেলন প্রস্তুতি ও কাউন্সিল পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটিকে ৪৫ দিনের মধ্যে ড্যাবের কাউন্সিল আয়োজনের কথা বলা হলেও নানা কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই ড্যাবের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। আগামীকালের কাউন্সিল অনুষ্ঠানে সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি।
এবারও ড্যাবের পাঁচটি শীর্ষ পদের জন্য ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে হারুন-শাকিল পরিষদের সভাপতি পদে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, মহাসচিব পদে ড্যাবের সাবেক কোষাধ্যক্ষ জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, সিনিয়র সহসভাপতি পদে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান, কোষাধ্যক্ষ পদে ড্যাবের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিদ ডা. মো. মেহেদী হাসান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অর্থোপেডিক সার্জারি অধ্যাপক ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান দিপু।
অন্যদিকে আজিজ-শাকুর পরিষদের- সভাপতি পদে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক, মহাসচিব পদে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের রেসপিরেটরি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুস শাকুর খান, সিনিয়র সহসভাপতি পদে বিএমইউর অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ডা. সাইফ উদ্দিন নিসার আহমেদ তুষান, কোষাধ্যক্ষ পদে ইউরোলজিস্ট ডা. তৌহিদ উল ইসলাম জন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে বিএমইউর উপ-রেজিস্ট্রার ডা. আবু মো. আহসান ফিরোজ।
ড্যাবের এবারের কাউন্সিলে সভাপতি প্রার্থী সদ্য সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ গতকাল বলেন, ‘বিএনপির দুঃসময়ে আমরা চিকিৎসকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের মাধ্যমে ড্যাবের দায়িত্ব গ্রহণ করি (হারুন-সালাম কমিটি)। করোনা মহামারির সময় দায়িত্ব নিয়েই ড্যাব নেতারা আন্দোলন-সংগ্রামে প্রতিটি কর্মসূচিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি করোনাভাইরাস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মাঠে নিরলসভাবে সক্রিয় ছিলাম। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ড্যাবের উদ্যোগে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প, ত্রাণ ও ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে। আমরা কাউন্সিল উপলক্ষে মতবিনিয় সভা ও পরিচিতি পর্ব শেষ করেছি।’
জয়ের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আশা করি, ড্যাবের নেতা-কর্মী ও ভোটাররা আমাদের বিগত দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করবেন ইনশাআল্লাহ। সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করলে গণতান্ত্রিক চর্চা বিকশিত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। কাউন্সিলে প্রকৃত নেতাদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকে। জয়ী এবং পরাজিত প্যানেলের লোকজন মিলেমিশে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যায়। এই চর্চা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সর্বত্র অব্যাহত রাখলে দলের লাভ হবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আজিজ-শাকুর প্যানেলের পরিচিত পর্ব সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এ সময় কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুতি ও কাউন্সিল পরিচালনা কমিটির কাছে সরবরাহ করা সদ্য বিলুপ্ত কমিটির তালিকায় অনেক অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি পাঁচ দফা অঙ্গীকারসংবলিত ইশতেহারও ঘোষণা করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে ড্যাব নেতারা বলেন, ‘ড্যাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ অনুযায়ী নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের এই প্রক্রিয়াকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি, এই প্রক্রিয়া সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চাকে আরও উৎসাহিত করবে। বিএনপির ৩১ দফার আলোকে স্বাস্থ্য খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন, সবার জন্য স্বাস্থ্য ও সর্বজনীন চিকিৎসাব্যবস্থা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তারা।
এ বিষয়ে আজিজ-শাকুর প্যানেলে সভাপতি প্রার্থী এ কে এম আজিজুল হক গতকাল বলেন, ‘আমরা আট দিনে প্রায় ৯০ ভাগ নির্বাচনি কার্যক্রম শেষ করেছি। বহুদিন পর একটি কাউন্সিল হতে যাচ্ছে, আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী ইনশাআল্লাহ।