বিএনপির বিজয় ঠেকানোর জন্য নানা রকম অপকৌশলের বা শর্তের বেড়াজালের আশ্রয় নিয়েছে একটি গোষ্ঠী বলে মন্তব্য করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ মন্তব্য করেন।
এদিন বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা উলু ধ্বনি এবং ঢাক-ঢোল বাজিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং তারেক রহমান হাত নেড়ে এই অভিবাদনের জবাব দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আশ্চর্যের বিষয় হলো স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশে এবার ক্ষমতাসীন সরকার নয়। বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের রাজপথের সহযোদ্ধা কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর আচরণেও বিএনপির বিজয় ঠেকাও প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করুন। জনগণের শক্তির ওপরে আস্থা এবং বিশ্বাস রাখুন।’
রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএনপির বিজয় ঠেকানোর অপরাজনীতি করতে গিয়ে বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী সরকার দেশকে একটি তাবেদারি রাষ্ট্রে, একটি বিশাল বড় জেলখানায় পরিণত করেছিল। বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশেও যারা মনে করছেন, নির্বাচন দিলে জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনে সহায়তা করবে। বিএনপির বিজয় যদি জনগণ দিয়েই থাকে, সেই বিজয় ঠেকাতে গিয়ে জনগণের রায় দেওয়ার পথরুদ্ধ করবেন না।’
তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্য মন্তব্য কিংবা নিত্যনতুন শর্তের প্রস্তাব সামগ্রিকভাবে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ সংসদ এবং সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র উত্তোরণের যাত্রাপথ কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত নয়।’
জাতীয় নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা জানি বিশ্বের অনেক দেশেই হয়ত নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের জন্য এখনো উপযোগী নয়। কাকে কিংবা কোন ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে পাঠানো হচ্ছে, জনগণের সেটি জানার পরিষ্কার কোনো সুযোগ নেই। যে কারণে যেকোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে চায় তাদেরকে অবশ্যই জনগণের মুখোমুখি হয়ে আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করা জরুরি।’
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘পিআর পদ্ধতি এবং আরও দু-একটি ইস্যুতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। এই ধরনের ভিন্নমত গণতান্ত্রিক বিশ্বে এটি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমি বিশ্বাস করি, বাস্তবতার নিরিখে প্রতিটি ইস্যুই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। যারা আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা করছেন, এর মাধ্যমে আপনারা হয়তো নিজেদের অজান্তেই গণতন্ত্রের উত্তরণের পথকে বাধাগ্রস্ত করে তুলছেন। একইসঙ্গে পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার পুনর্বাসনের পথও হয়তোবা সুগম হচ্ছে।’
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্য করে তারেক রহমান বলেন, ‘ধর্মীয় পরিচয়কে কেউ যাতে নিজেদের হীন ও দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা দেখেছি অতীতে বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কিংবা তাদের ধর্মীয় স্থাপনা-বাসাবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো আমরা পর্যালোচনা করে দেখি, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ হামলার ঘটনা কোনো ধর্মীয় কারণে হয়নি। বরং অধিকাংশ হামলার ঘটনার নেপথ্য ছিল অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অথবা অবৈধ লোভ-লাভের আশা। কোনো কারণেই যাতে কারো ওপর হামলা-অবিচার না হয় সেটি নিশ্চিত করার রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। এই বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর না। এই বাংলাদেশ আপনাদের-আমাদের সবার। দলমত-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকর একমাত্র গর্বিত পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক সব ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করবে-এটি বিএনপির নীতি ও রাজনীতি। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় একজন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। কিন্তু একমাত্র গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। দেশে উগ্রবাদকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া যাবে না
হিন্দু ধর্মাবলীদের উদ্দেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘বিগত ১৫ স্বৈরাচার সরকারের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে আপনারাও অংশীদার ছিলেন।’
এ সময় ঐক্যবদ্ধ থেকে বাংলাদেশ পুনরায় ন্যায়, সত্য ও মানববাধিকারের পথে পরিচালনায় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক অমলেন্দু দাস অপুর সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, প্রান্তিক জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সহ-সম্পাদক অপর্ণা রায় দাস, নির্বাহী কমিটির সদস্য রনেশ দত্ত, দেবাশীষ রায় মধু, নিপুণ রায় চৌধুরী, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের তপন চন্দ্র মজুমদার, এসএন তরুণ দে, মিল্টন বৈদ্য, পূজা উদযাপন ফ্রন্টের জয়দেব জয়, হিন্দু মহাজোটের সুশান্ত চক্রবর্তী, ঢাকা মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত দেব, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও ইসকনের প্রভু বিমলা প্রসাদ প্রমুখ।
শফিকুল ইসলাম/সুমন/