বিগত সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা মিত্রদের আসন ছাড় দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। আসন বণ্টন বা সমঝোতার জন্য ইতোমধ্যে তাদের কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছে। তবে বিএনপির বলয়ের বাইরে অন্য কোনো জোটে গেলে তাদের আসন ছাড় দেবে না দলটি। একই সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনি জোট গঠনের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও শুরু করতে চায় বিএনপি। গত মঙ্গলবার রাতে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে এসব তথ্য।
সূত্র জানায়, শিগগিরই মিত্রদের সঙ্গে আসন ছাড় ও জোট গঠনের ব্যাপারে আলোচনায় বসবে বিএনপি। মিত্ররা কোন আসনে কারা জয়ী হয়ে আসতে পারবেন, তাদের যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা এবং তাদের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কারা সেটিও বিবেচনায় রাখছে বিএনপির হাইকমান্ড। পাশাপাশি ওই সব আসনে দলীয় যেসব প্রার্থী রয়েছেন, তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে মিত্রদের সঙ্গে কাজ করার জন্য বোঝানো হবে। মিত্রদের মধ্যে যাদের নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে পারবে না, তাদের অন্যভাবে মূল্যায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেবে বিএনপি। আবার বয়সের কারণে কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছেন না তাদের টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করা বা উচ্চকক্ষে নেওয়া যায় কি না, সেই চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘জোট থেকে সরে আসার কোনো প্রশ্নই আসে না। যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে প্রথমে ৪২টি দল যোগ দেয়, পরে আরও ১০টি দল আসে। সব মিলিয়ে ৫২-৫৩ দলের নেতারা আমাদের সঙ্গে রাজপথে কষ্ট করেছেন, কারাগারে গেছেন। তাদের আমরা মূল্যায়ন করব।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে কেউ কেউ বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী মুখে বলছে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও পিআর পদ্ধতি ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। অথচ ৩০০ আসনে ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। আগেভাগেও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। জামায়াত কট্টর ডানপন্থি দল ও তাদের রেজিম ফোর্স রয়েছে। তার বিপরীতে বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক দল। প্রতিটি আসনে জামায়াত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও তাদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ জামায়াতের জনপ্রিয় প্রার্থী নেই বললেই চলে। কিন্তু বিএনপির প্রতিটি আসনে তিন-চারজন করে
মনোনয়নপ্রত্যাশী ও এলাকায় জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই সব আসনে তফসিলের আগেই প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া সম্ভব নয়। এতে অনেক আসনে বিভেদ-গ্রুপিং বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন কোনো কোনো সদস্য।
বৈঠক সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বিএনপি দেড় শতাধিক প্রার্থীকে নির্বাচনি আসনে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। হেভিওয়েট নেতাদের এসব আসন অতীতেও তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। বাকি দেড় শতাধিক আসনে দল ও মিত্রদের কাদের দেওয়া হবে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ঠিক করবে বিএনপি। তবে অনেককে সবুজ সংকেত দেওয়া হলেও এটিই চূড়ান্ত মনোনয়ন নয়। কারণ বিএনপি মনোনয়ন চূড়ান্ত করার জন্য পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করবে। সেই বোর্ডই মনোনয়নের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। জরিপে উঠে আসা সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপারে আরও বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়ার পরামর্শ দেন বৈঠকে কেউ কেউ। তবে বিএনপি তফসিলের আগেই দল ও জোটের একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চায়।
জানা গেছে, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কিংবা অন্য যেকোনো নির্বাচনের জন্য দলের প্রার্থী মনোনয়নে একটি পার্লামেন্টারি বোর্ড থাকবে। স্থায়ী কমিটিই হবে দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড। বোর্ডের সভাপতি হবেন দলের চেয়ারম্যান।
সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে আসন্ন দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। পূজামণ্ডপে শান্তি বজায় রাখা, যেকোনো নাশকতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে নেতা-কর্মীদের গত বছরের মতো এবারও পাহারা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় সোয়া ১১টার দিকে। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির কাছে মিত্ররা যেসব আসন চায়
২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এর আগে ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ভেঙে দেওয়া হয়। এই ঘটনার এক দশক আগে ২০১২ সালে ২০-দলীয় জোট গঠিত হয়। জোট ভেঙে দেওয়ার পর শরিকরা ১২-দলীয় জোট এবং জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট নামে দুটি পৃথক জোট গঠন করে। তবে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এককভাবে কর্মসূচি পালন করলেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। এই দলগুলোর পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনে যোগ দেয় গণতন্ত্র মঞ্চ, গণফোরাম, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করলেও যুগপৎ আন্দোলনে ছিল না। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াত দুটি দলই এবার তাদের নেতৃত্বে পৃথক জোট গঠনে তৎপর রয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’কে ১৯টি আসন এবং ২০-দলীয় মিত্রদের ৩৯টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। এবারও মিত্র দলগুলো অর্ধশতাধিক আসন চায় বিএনপির কাছে। তবে বিএনপি ৩০টির মতো আসনে ছাড় দিতে পারে।
গণতন্ত্র মঞ্চের শরিকদের মধ্যে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব শারীরিক অসুস্থতার জন্য এবার নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইছেন না। তবে সে ক্ষেত্রে তার স্ত্রী জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রবের জন্য ঢাকার উত্তরা থেকে একটি আসন চাইবেন। বগুড়া-৪ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা-৮ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, জামালপুর-৫ আসনে ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম এবং ফেনী-৩ আসনে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বিএনপির কাছে আসন ছাড় চাইছেন। এদের মধ্যে ২০১৮ সালে আ স ম রব ও মান্নাকে আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি।
১২-দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে পিরোজপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুষ্টিয়া-২ আসনে জাতীয় পার্টির (জাফর) মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন, মৌলভীবাজার-২ আসনে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট নবাব আলী আব্বাস খান, যশোর-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা রশীদ বিন ওয়াক্কাস বিএনপির কাছে মনোনয়ন চাইছেন। তবে মোস্তফা জামাল হায়দার বয়সের কারণে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছেন না। তাকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বা সংসদের উচ্চকক্ষে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে শাহাদাত সেলিম, হাবিব লিংকন ও ওয়াক্কাসকে আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি।
এদের বাইরে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে তার ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক, কুমিল্লা-৭ আসনে দলটির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, ময়মনসিংহ-১০ আসনে প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ, চট্টগ্রাম-৭ আসনে প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল আলম তালুকদার, চট্টগ্রাম-৩ আসনে প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. জেনারেল (অব.) ড. চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (বীর বিক্রম), চট্টগ্রাম-১২ আসনে শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক এম এয়াকুব আলী, ময়মনসিংহ-৮ আসনে প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আওরঙ্গজেব বেলাল, জয়পুরহাট-২ আসনে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক কারিমা খাতুন, চাঁদপুর-৫ আসনে প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামুল বশির, চাঁদপুর-২ আসনে যুগ্ম মহাসচিব মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজি এবং ভোলা-২ আসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট সিআইপি মোকফার উদ্দিন (মাহে আলম) বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে কর্নেল অলি, রেদোয়ান আহমেদ, মাহবুব মোর্শেদ, নুরুল আলম বিএনপির জোটের প্রার্থী ছিলেন।
এ ছাড়া ঢাকা-১৭ আসনে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, ঢাকা-৫ আসনে দলটির মহাসচিব আব্দুল মতিন সাউদ; ঢাকা-৬ আসনে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, মাগুরা-১ আসনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান, নরসিংদী-৩ আসনে প্রেসিডিয়াম সদস্য এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক; নড়াইল-২ আসনে সমমনা জোটপ্রধান ও এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বগুড়া-৩ আসনে জাগপা সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান; ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, রাজবাড়ী-২ আসনে এনডিএম মহাসচিব মোমিনুল আমিন; পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-২ আসনে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, ঠাকুরগাঁও-২ আসনে সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান ও নেত্রকোনা-২ আসনে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন এবং পিরোজপুর-২ আসনে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান মনোনয়ন চাইছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আন্দালিব রহমান পার্থ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ সুব্রত চৌধুরী এবং মোস্তাফিজুর রহমানকে আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। তবে মিত্রদের চাওয়া কোনো আসনই এখনো চূড়ান্ত নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ড।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে মঞ্চ আলোচনায় বসবে। বিএনপির নির্বাচনের ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি জানার চেষ্টা করব। আমরাও আমাদের চিন্তাভাবনা তাদের কাছে তুলে ধরব। মনের মিল হয়ে গেলে বাকিটা আর সমস্যা থাকবে না।’
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির সংকেত নিয়েই গণসংযোগ চালাচ্ছেন ১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ৩১ দফা নিয়ে ‘ডোর টু ডোর’ যাচ্ছি। বিএনপি যদি আসনে ছেড়ে দেয়, তাহলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও লিয়াজোঁ কমিটি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। জোট গঠনের ব্যাপারেও আলোচনা চলছে।’ তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছর বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে-সংগ্রামে ছিলাম। জেল-জুলুম, হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। আশা করি বিএনপির হাইকমান্ড মূল্যায়ন করবে।’