আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দিয়েছে গোলাম আকবর খোন্দকারকে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক এই সংসদ সদস্য নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম।
খবরের কাগজ: বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই। নির্বাচনের আগে এ ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি কি হয়েছে? কোথায় আরও কাজ করতে হবে?
গোলাম আকবর খোন্দকার: অতীতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তারা চাননি জনগণ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিক। মানুষ নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। যে কারণে মানুষ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন। এখন আমরা দেখছি মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, আমি মনে করি জনগণের মাঝে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
খবরের কাগজ: নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি? নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কি তৈরি হয়েছে?
গোলাম আকবর খোন্দকার: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানা থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এ ছাড়া বাইরের অনেক অস্ত্র ঢুকেছে। যেমন আমি আমার রাউজানের কথা বলতে পারি। দলের বাইরের যেসব লোক বালি-মাটির ব্যবসা ও চাঁদাবাজি করছে, তারা অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। রাউজানের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের যারা মাটি-বালির ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে জড়িত, সবার কাছে অস্ত্র রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জনগণের মধ্যে থেকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে ভীতি কাটবে না।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে। বিভিন্ন দল থেকে অনেক দিন ধরে একটি ‘ভালো নির্বাচনের’ কথা বলা হচ্ছে। সেই ‘ভালো’ নির্বাচনের পরিবেশ দেখছেন এখন?
গোলাম আকবর খোন্দকার: পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। আমি বলব না যে একদম খারাপ। তবে সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে পারে। দেশের আপামর জনগণের অনেক কাজ হয়েছে বলে আমরা মনে করতে পারব। একমাত্র আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে সরকারের ভালো কাজগুলো মানুষের চোখে ধরা পড়ছে না। তবে অতিসত্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত যাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের আইনের হেফাজতে আনতে হবে। প্রশাসন জানে কে বা কারা এসব উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। প্রশাসন সঠিকভাবে জানে। বিভিন্ন কারণে তারা কাজ করতে পারছে না। কোনো ব্যক্তির স্বার্থ নয়, সমাজের কথা, দেশের কথা বিবেচনা করে কাজ করা উচিত।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেমন দেখছেন?
গোলাম আকবর খোন্দকার: বাস্তবতা হলো, গত ১৭ বছর একটি দলের প্রশাসন হিসেবে তারা কাজ করেছে। এখান থেকে হঠাৎ করে বের হয়ে কতটুকু করতে পারবে, তা সময় বলে দেবে। তবে আমরা দেখছি তারা ভালো করার চেষ্টা করছে।
খবরের কাগজ: নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে আপনার অভিমত কী?
গোলাম আকবর খোন্দকার: করার কিছুই নেই। একই দিন না করেও সম্ভব না। একটি নির্বাচনের জন্য সরকারের অনেক অর্থ ব্যয় হয়। দেশের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। যে কারণে মিতব্যয়িতার চিন্তা করা উচিত।
খবরের কাগজ: আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন?
গোলাম আকবর খোন্দকার: আমি মনে করি সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে সেনাবাহিনীকে। দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনী মাঠে আছে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য। তাদের অ্যাকটিভ রোল চোখে পড়ছে না। তাদের সহযোগিতা চাইলে তারা এগিয়ে আসে। কিন্তু সেনাবাহিনী যে মাঠে আছে, তাদের যে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটা তারা প্রয়োগ করছে না। তারা যদি ক্ষমতা প্রয়োগ করত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হতো।
খবরের কাগজ: নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
গোলাম আকবর খোন্দকার: গত ১৭ বছর গণমাধ্যম সব বিষয়ে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারেনি এটা সত্য। ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই তা করতে পারেননি। বর্তমানে তারা সেই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আমি মনে করি, সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসা উচিত। কোনো কোনো নির্বাচনি এলাকায় অনেক সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের ভয়ে সঠিক নিউজ এখনো করতে পারছেন না। তবে অনেকেই চেষ্টা করছেন। আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। সমাজ থেকে অসৎ কর্মকাণ্ডে লিপ্তদের বিরুদ্ধে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।
খবরের কাগজ: আপনার রাউজানের পরিস্থিতি কী?
গোলাম আকবর খোন্দকার: দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা কেউ সেখানে রাজনীতি করতে পারিনি। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সভা-সমাবেশ করতে পারেনি। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর স্বাভাবিকভাবে মানুষ আশা করেছিল তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে। শান্তপ্রিয় জনগণ যারা শহরে এসে বসবাস করছে, নিজেদের পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য তারা এলাকায় ফিরে যাবে আশা করেছিল। বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাই, গত ১৭ বছর মানুষ যে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় আমরা ফিরে গেছি। বিগত দেড় বছরে রাউজানে ১৮ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যেটা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এটা কেন হয়েছে? এটা কী রাজনৈতিক কারণে নাকি দ্বন্দ্বের কারণে?–একজনও তো ওখানে মাঠে সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। কেউ কাউকে মারেনি। তাহলে কেন হত্যাকাণ্ডগুলো হলো? এটা আমাদের সবার দেখা উচিত, চিন্তা করা উচিত। রাউজানের জনগণ মনে করে বালুমহাল, মাটি কাটা, দখল নেওয়া ও চাঁদাবাজির কারণে সেটা হচ্ছে। আর প্রবাসী যারা আছেন, তাদের চাঁদা দিতে হচ্ছে এখন। এগুলো আমাদের দেখা উচিত। আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের উচিত সঠিক চিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরা। জনগণ কিন্তু বর্তমানে মিডিয়ার কল্যাণে আমি কী কাজ করি, আমার সঙ্গে যেসব নেতা-কর্মী আছেন, সমাজের মধ্যে তাদের কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা আছে সেটা ভালো জানে। যদিও ভয়ের কারণে তারা মুখ খোলে না। তবে এ রকম ভয় দেখিয়ে বেশি দিন তাদের মুখ বন্ধ রাখতে পারবে না। যেমন–শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। আমি কুকর্ম করে যদি বলি আমি মহামানব–জনগণ কিন্তু সঠিক জানে কার মাধ্যমে কী হয়েছে। এ ধরনের রাজনীতি আমাদের না করা উচিত। জনগণের পাশে থাকা উচিত।