লক্ষ্মীপুরে ভোটের মাঠে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের ভয় কাটছে না। অধিকাংশ প্রার্থীর দাবি, তাদের কোনো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে লক্ষ্মীপুরে ভোটের মাঠে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন।
তাদের দাবি, লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। এই অস্ত্রগুলো ভোটের মাঠে সহিংসতা ছড়াবে। জেলায় সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার সন্তোষজনক নয় দাবি করে তারা আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সন্ত্রাসীরা নানাভাবে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান তারা। তা না হলে প্রার্থীদের নির্বিঘ্নে প্রচার করা সম্ভব হবে না। সেই সঙ্গে ভোটাররাও নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবেন না।
লক্ষ্মীপুরের চারটি সংসদীয় আসনে তিন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২৯ প্রার্থী নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি ৪টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৩টি, ইসলামী আন্দোলন ৪টি, জাতীয় পার্টি ২টি, বাসদ ২টি, এনসিপি ১টি, জেএসডি ১টি, এলডিপি ১টি, নাগরিক ঐক্য ১টি, এনডিএম ১টি, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি ১টি, এনপিপি ১টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১টি, জিওপি ১টি আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিম ও এনসিপির প্রার্থী মাহবুবুল আলমের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এদিকে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়ার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ এস এম ইউ রুহুল আমিন ভূঁইয়ার মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে জামাতে ইসলামীর প্রার্থী মো. রেজাউল করিমের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ আর হাফিজ উল্লাহ এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) প্রার্থী তানিয়া রবের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন ভোটাররা।
জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপি, জেএসডি প্রার্থীরা দাবি করেছেন, তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে শেল্টার দেওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। একই সঙ্গে তাদের অস্ত্র জোগানে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। তাদের দাবি, প্রশাসনের কাছে বারবার দাবি তোলার পরও লক্ষ্মীপুরে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। প্রার্থী ও তাদের কর্মীদের নির্বাচনি কাজে বাধা, ভোটারদের উপর হামলা ও নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে হুমকি-ধমকি এখনো অব্যাহত।
নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিনেই জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের ব্যানার-ফেস্টুন লাগাতে বাধা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ব্যানার লাগানোকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুর সদর আসনের বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়েছেন। জামায়াত প্রার্থী রেজাউল করিমকে ফেসবুকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী মাহবুব আলম, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটোয়ারী, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি হেলাল উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. রেজাউল করীম, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এ আর হাফিজ উল্লাহ, জেএসডি প্রার্থী তানিয়া রব পৃথক পৃথক বক্তব্যে লক্ষ্মীপুরের নির্বাচনি মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের জোরালো তৎপরতা না থাকা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের শেল্টার দেওয়ার ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের সন্ত্রাসী আচরণ এবং ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তানিয়া রব দাবি করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হাতিয়া ও দুর্গম চরের বিভিন্ন জলদস্যু ও ডাকাত বাহিনীকে ভাড়া করে সমতলে এনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিম, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তারা আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের পক্ষে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। জেলার সব আসন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপির প্রার্থীরাই বিপুল ভোটে জয় লাভ করবে। কেউ কেউ নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করার জন্য নানা অপপ্রচারে চালাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. মেহেদী হাসান জানান, নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখার জন্য প্রশাসন তৎপর রয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনী তৎপর রয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেক জানান, পুলিশ প্রশাসন ও যৌথবাহিনী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। যেকোনো মূল্যে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে তারা বদ্ধপরিকর।