তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের উত্তম মাস রমজানুল মুবারক। আধ্যাত্মিক উৎকর্ষসাধনে এ মাসের ভূমিকা ব্যাপক। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ তার পাশবিকতাকে দমন করে আত্মার শক্তিকে বিকশিত করার অপার সুযোগ লাভ করে। রমজানে রোজাদারের মনুষ্যত্ব ও রুহানিয়াত সজীব ও সক্রিয় হয়। রিপুর তাড়নামুক্ত হয়ে মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক ও প্রজ্ঞার সদ্ব্যবহার করে সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে।
আধ্যাত্মিক সাধনায় সফলতা অর্জনের নিমিত্তে রোজার ভূমিকা অপরিহার্য। রোজার মাধ্যমে যত দ্রুত মানুষের আত্মিক পরিবর্তন ঘটে, অন্য কোনো উপায়ে তা এত দ্রুত ঘটে না। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
রোজার অমূল্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি স্বয়ং আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা বলেন, বনি আদমের প্রত্যেক আমলের (নির্ধারিত সওয়াব) রয়েছে, কেবল রোজা ছাড়া। এটা আমার জন্য; আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (বুখারি, ৫৯২৭) ভাবা যায়? রোজা এতটাই উঁচুমার্গের আমল, যার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহতায়ালা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব তরুণ বিবাহের নির্দিষ্ট সময়কাল অতিবাহিত করেও বিয়ে করে না, অবৈধ সম্পর্কে তারাই বেশি লিপ্ত হয়। শয়তানি অপশক্তি তাদের প্ররোচনার জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে ফেলে। এমতাবস্থায় আধ্যাত্মিক উৎকর্ষসাধনের টনিক হিসেবে কাজ করে সিয়াম সাধনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য রয়েছে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা এটা দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে। আর সামর্থ্য যার নেই, সে যেন রোজা রাখে। নিশ্চয় তার জন্য সেটিই হবে ঢালস্বরূপ।’ (বুখারি, ৫০৬৫)
মাটির বৈশিষ্ট্য যখন মানুষের মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মনুষ্যত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে। বরং চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে আত্মার শক্তি যখন তার মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মারেফতে এলাহি অর্জনে সক্ষম হয়। এমনকি উৎকর্ষের বিচারে ফেরেশতাকুলকেও ছাড়িয়ে যায়। রমজানের কর্মসূচি মানুষকে জাগতিকতা থেকে আধ্যাত্মিকতা এবং দেহশক্তি থেকে আত্মার উৎকর্ষ অর্জনে সাহায্য করে। ফলে রোজার মাধ্যমে মানুষ সৎকর্মের প্রতি ধাবিত হওয়ার প্রণোদনা লাভ করে। এর কারণ হলো রমজানে ইবাদতের প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যায়। রমজানে শয়তানকে কুদরতিভাবে বন্দি করে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারি, ১৮৯৯)
সুফি-সাধকরা বলেন, চারটি পদ্ধতি অবলম্বন করে মানবমনকে পরিশোধিত করা যায় এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করা যায়। আর সেগুলো হলো―
এক. ঘুম কম যাওয়া।
দুই. কম আহার করা।
তিন. কথা কম বলা।
চার. মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কম করা।
পবিত্র মাহে রমজানে এ চারটি প্রক্রিয়ারই উত্তম অনুশীলন করা সম্ভব হয়। যেমন দীর্ঘ রাত অবধি তারাবির নামাজ ও কিয়ামুল লাইলে থাকা হয়, আবার সাহরিতে ওঠার ফলে ঘুমের মাত্রা কম হয়। আবার রোজার কারণে সারা দিন পানাহার বর্জনের ফলে কম আহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে কম কথা বলার লক্ষ্যে বিশেষভাবে রমজানে মিথ্যা, অনর্থক কথা ও গিবত থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি থাকল মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কম করার ব্যাপারটি। আর এর জন্য ইতেকাফের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে করে বান্দা মানুষের সংস্রবমুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে স্বীয় প্রভুর প্রতি মনোনিবেশ করতে পারে। এভাবেই রমজানজুড়ে মানবমনকে পরিশোধিত করার আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ অর্জনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব।
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক