সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হলো একই সমাজে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায় বা ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ইসলাম সম্প্রীতির ধর্ম। ইসলামে সকল ধর্ম ও ধর্মীয় মতামতকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। কোনো ধর্ম বা ধর্মাবলম্বীকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয় না। সব ধরনের মানুষের সরব উপস্থিতিতে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার একটি কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে ইসলাম। সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ (সা.)-কে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবজাতির কল্যাণের জন্য পাঠানো হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।’(সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)
একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ বসবাস করবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু ধর্ম ও বর্ণ আলাদা হলেও তাদের মূল জাতিসত্তা এক—সবাই মানুষ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সকল মানুষ একই জাতিভুক্ত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর পরিবারস্বরূপ। সুতরাং সৃষ্টিজগতের মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়, যে আল্লাহর পরিবারের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে।’ (বায়হাকি)
পরিবারের সদস্যদের মতো সব মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব ও সম্প্রীতি বজায় রাখা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলাম সকল ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা দিয়েছে। দেশের সব নাগরিক স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে। এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমার জন্য আমার দ্বীন।’ (সুরা কাফিরুন, আয়াত: ৬)
কাউকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছেন. ‘দ্বীন সম্পর্কে কোনো জবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছেন, ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থেকো। কেননা তোমাদের আগের লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘনের কারণে ধ্বংস হয়েছে।’ (নাসায়ি, হাদিস: ৩০৫৭)
ইসলাম সহমর্মিতা ও সহানুভূতির ধর্ম। পরস্পরের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসা, একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এর মাধ্যমে সবার মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাব দূর হয়। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘ভালো কাজ করা ও তাকওয়া অবলম্বনে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে কেউ কাউকে সহযোগিতা করবে না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)
পরস্পরে সদ্ভাব ও সম্প্রীতির সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা সনদে সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র মিলে একটা জাতি গঠন করেন।বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ধর্মগ্রন্থ, নবি-রাসুল কিংবা ধর্মপ্রচারকের নামে কুৎসা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। ধর্মের নামে গুজব ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। যা কোনো ধর্মেরই শিক্ষা নয়। ইসলামে ধর্মের নামে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, রক্তপাত ও মানব হত্যা হারাম এবং জঘন্য অপরাধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদি, খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আমাদের উচিত, সকল ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখা, সকল ধর্মের প্রতি সহনশীল হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি আপনার কাছে আশ্রয় চায়, তা হলে আপনি তাকে আশ্রয় দেবেন, এরপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৬)
আমরা বাংলাদেশি। কেউ কারও শত্রু নই। আমরা হাজার বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছি। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিক সৌহার্দ নষ্ট হতে পারে এমন কোনো কাজ আমরা করব না।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, পাংশা