ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্যারাগুয়েকে উড়িয়ে বিশ্বকাপে উড়ন্ত সূচনা যুক্তরাষ্ট্রের দুপুরের মধ্যে ১১ জেলায় ঝড়ের শঙ্কা ময়মনসিংহে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে কক্সবাজার বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের ঢল বরগুনায় প্যানেল চেয়ারম্যানের ওপর হামলা, গণপিটুনিতে যুবক নিহত শান্তিচুক্তির ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের, বিজয় দাবি তেহরানের কক্সবাজার পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী বৃষ্টিতে ভিজে প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায় কক্সবাজারবাসী কক্সবাজারের পথে প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার যাচ্ছেন আজ মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ উদ্বোধনীর মুগ্ধতা ছড়ানো ৭ ছবি সুস্বাস্থ্যের বার্তা নিয়ে সাইকেলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় শাহেদ রোকনপুর সীমান্তে নদীপথে পুশইনের চেষ্টা, রুখে দিল বিজিবি মানামায় বাংলাদেশ দূতাবাসে গণশুনানি অনুষ্ঠিত পাবনায় ছেলের সামনে বাবাকে হত্যা, আরও একজন গ্রেপ্তার শিবগঞ্জে পুশইনের প্রতিবাদে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ বরিশালে ইজিবাইক ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গণমুখী বাজেট উপস্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ফিনল্যান্ড বিএনপির অভিনন্দন রাঙ্গুনিয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভ্যানগাড়ি ও নগদ অর্থ বিতরণ সাম্বার ছন্দে থেমে যাবে আটলাসের গর্জন? লাইসেন্স বাতিলে আদ্-দ্বীন ছাড়ছেন রোগীরা রাজশাহী ফুটবলপ্রেমীদের রঙিন শোভাযাত্রা ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কে ‘জলপরী’ প্রদর্শনী নিয়ে বিতর্ক চা শ্রমিকের সন্তানদের মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ চট্টগ্রামে সরকারি খামারে প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ বিশেষ চক্রের কাছে জিম্মি রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের দাবি ইউক্রেনের সাম্বার অপেক্ষায় বিশ্ব
Nagad desktop

কী বলে ইসলাম পণ্যের বিক্রি বাড়াতে ও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে পুরস্কার হিসেবে উমরার অফার

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:০৮ এএম
পণ্যের বিক্রি বাড়াতে ও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে পুরস্কার হিসেবে উমরার অফার
মতামত প্রদান করা দেশবরেণ্য ৪ জন মুফতির ছবি। খবরের কাগজ

সম্প্রতি অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পণ্যের বিক্রি বাড়াতে বিজ্ঞাপন বা ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন যে, ‘এত তারিখ থেকে এত তারিখের মধ্যে যারা আমাদের প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পণ্য ক্রয় করবেন বা আমাদের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করবেন—তাদের থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করে ৩ বা ৫ জনকে বিনামূল্যে উমরা পালনের জন্য পাঠানো হবে।’ ক্রেতারা উমরা পালনের সুযোগ লাভের আশায় পণ্য ক্রয় করেন বা বিনিয়োগে আগ্রহী হন। এটা মূলত কোম্পানির পণ্য বেশি বিক্রি হওয়ার এবং সহজে বিনিয়োগ লাভ করার একটি মার্কেটিং কৌশল। পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর বা বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মার্কেটিং কৌশল হিসেবে পবিত্র উমরা পালনের মতো ইবাদতকে পুরস্কার হিসেবে অফার দেওয়া ইসলামে বৈধ কি না—এ ব্যাপারে দেশের প্রথিতযশা মুফতিরা কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। 

ব্যবসার কৌশল হিসেবে উমরার অফার শর্ত সাপেক্ষে বৈধ 
মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ
সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি, ওআইসি

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন আর সুদ হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)। শররি দৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিক্রি বাড়ানো ও ক্রেতাদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পণ্য ক্রয়ে বিশেষ হাদিয়া/গিফট/উপঢৌকনের অফার দেওয়া বৈধ। এক্ষেত্রে গিফট পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে বা নির্ধারিত সংখ্যক পণ্য ক্রয়ের শর্ত করাও শরিয়ত অনুমোদিত। তবে অফারের কারণে পণ্যের দাম স্বাভাবিক মূল্য থেকে বাড়ানো যাবে না এবং গুণগত মান কমানো যাবে না। পণ্য ক্রয়ই ক্রেতার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে; শুধু লটারি বা পুরস্কার জেতার উদ্দেশ্যে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পণ্য ক্রয় করা যাবে না। 
উল্লেখ্য, ক্রয়-বিক্রয়ের মূল চুক্তি বাধাগ্রস্ত না করে এবং ধোঁকা-প্রতারণার পথ না খোলে, ক্রেতা-বিক্রেতার এমন শর্ত সামাজিকভাবে ব্যাপক প্রচলিত হলে সম্পূর্ণ বৈধ। তবে যে শর্ত দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বের কারণ হয়, তা বৈধ নয়।
সুতরাং হজ-উমরার অফার দিয়ে পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে অফারের কারণে পণ্যের মূল্য স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়ানো বা গুণগত মান হ্রাস করা বৈধ হবে না। আর নিছক দ্বিপাক্ষিক লেনদেনে মালিকানা সন্দেহে ফেলে তথা জুয়া সংশ্লিষ্ট লটারি অবৈধ হলেও যা দ্বারা শুধু ব্যক্তি বা বস্তু নির্ধারণ করা হয়; এমন লটারি অবৈধ নয়। তা ছাড়া স্বেচ্ছায় প্রদত্ত একপক্ষীয় হিবা বা গিফট বিতরণে লটারি সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ। তাই শর্ত পাওয়া গেলে ব্যবসায়ীর জন্য ক্রেতাকে অবশ্যই উমরা করাতে হবে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরের ইচ্ছা করলে স্ত্রীদের মাঝে লটারি প্রক্রিয়া গ্রহণ করতেন। যার নাম আসত তিনি তাকে নিয়েই সফরে বের হতেন…।’ (বুখারি, হাদিস: ২৫৯৩)  
পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর মার্কেটিং কৌশল হিসেবে পবিত্র উমরা পালনের মতো ইবাদতকে পুরস্কার বা অফার হিসেবে ঘোষণা করা ইসলামি শরিয়তে কোনো অসুবিধে নেই। (আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি, হাদিস: ১৪৮২১; হেদায়া শরহে বেদায়াতুল মুবতাদি ৩/৮৬; ফাতাওয়ায়ে উসমানি, ৩/২৫৭) 

অনিশ্চিত পুরস্কারের লোভ ও জুয়ার সাদৃশ্য হলে নাজায়েজ
মুফতি শাহেদ রাহমানী
চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স বাংলাদেশ

পণ্যের বিক্রি বাড়ানো এবং বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মার্কেটিং কৌশল হিসেবে পবিত্র উমরা পালনের মতো ইবাদতকে পুরস্কার বা অফার হিসেবে ঘোষণা করা—নিচের শর্ত পাওয়া গেলে বৈধ হবে, অন্যথায় অবৈধ। শর্তগুলো হলো—
১. কোম্পানি তাদের পণ্যের এমন মূল্য নির্ধারণ করবে, যা বাজারে প্রচলিত এই জাতীয় পণ্যের বাজারমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কোম্পানি পুরস্কারের কারণে সাধারণ বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে না। যদি কোম্পানি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রি করে, তা হলে ধরে নিতে হবে, গ্রাহক পুরস্কারের আশায় অধিক মূল্যে এই কোম্পানির পণ্য কিনেছে। যেহেতু উমরা প্যাকেজ পাওয়া নিশ্চিত নয়; তাই জুয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে নাজায়েজ বিবেচিত হবে।
২. কোম্পানি পুরস্কার স্কিমকে নিজের ত্রুটিপূর্ণ পণ্য বিক্রির মাধ্যম বানাবে না। অর্থাৎ উমরা প্যাকেজের লোভ দেখিয়ে গ্রাহককে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ করবে না। নতুবা এই অবস্থাতেও জুয়ার সাদৃশ্য তৈরি হবে।
৩. গ্রাহকের মূল উদ্দেশ্য হবে কোম্পানির পণ্য কিনে উপকৃত হওয়া; অনিশ্চিত পুরস্কার লাভ নয়। পুরস্কার একটি আনুষঙ্গিক ও অতিরিক্ত বিষয় হবে। যদি কোম্পানি বিনামূল্যে তা দেয়, তা হলে ভালো, নতুবা তা কোনো বিষয় নয়। প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকের এই পণ্যের প্রয়োজন না থাকার পরও যদি শুধু অনিশ্চিত এই পুরস্কারের আশায় পণ্য ক্রয় করে, তা হলে এই অবস্থাতেও জুয়ার সঙ্গে সাদৃশ্য হওয়ার ফলে নাজায়েজ হবে। 
যদি উল্লিখিত শর্ত রক্ষা করে কোম্পানির পক্ষ থেকে লটারির মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া হয়, তা হলে তা দান ও অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য হবে। গ্রাহকের জন্য এ অবস্থায় পুরস্কার নেওয়া জায়েজ হবে। যদি জায়েজ পদ্ধতিতে করা লটারিতে কারও নাম আসে, তবে তা সংগ্রহ করার পর ব্যক্তি তার মালিক হবে। পুরস্কারটি নিজের ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করার অধিকারী হবে। চাইলে উমরা পালনে যেতে পারবে। অথবা অন্য কাজে ব্যবহারের অধিকার পাবে। 

ইবাদতকে মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত
মুফতি শাহ ওয়ালী উল্লাহ
খতিব, সোবহানবাগ জামে মসজিদ, ঢাকা

মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে কোনো ইবাদত বা উমরার মতো ইবাদতকে মাধ্যম করা কি আসলে উচিত? ইসলামের ইতিহাসে বা পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলেম-ফকিহদের যুগে কোনো ইবাদত বা উমরার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র ইবাদতকে মার্কেটিং বা পণ্য বিক্রির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার নজির নেই। সময়ের পালাবদলে আমরা যাদের থেকে জ্ঞান আহরণ করেছি, যাদের বই পড়েছি—তাদের সময়ে এমন কোনো ইবাদতকে মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় না। অতীতে পাওয়া যায়নি, নিঃসন্দেহে এটি নতুন বিষয়। বর্তমান পৃথিবীর আয়েম্মা-মুজতাহিদিনদের কাছে ব্যাপারটি তুলে ধরা প্রয়োজন। পৃথিবীর কোনো দেশেই হয়তো মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে পণ্য বিক্রির জন্য কোনো ইবাদতকে অফার দেওয়া হয় না। আলাদাভাবে হতে পারে, কেউ ইবাদত সম্পূর্ণ করেছে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কেউ চল্লিশ দিন জামাতের সঙ্গে নামাজ সম্পূর্ণ করেছে, তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পুরস্কার দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু পণ্যের বিক্রি বাড়ানো এবং বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ইবাদতকে ব্যবহার করার বিষয়টি নতুন। যার দৃষ্টান্ত অতীতে নেই। আমার মনে হয়, ব্যাপারটি নিয়ে বিশ্লেষণ করা ও আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া উচিত। 
আমার বিবেচনায় ইবাদতকে মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াটা বন্ধ করা ভালো। তবে এটাকে মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে না করে দান বা উপহার হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। ব্যবসায়ীর লাভ হলে ক্রেতাদের মধ্য থেকে লটারি করে কয়েকজনকে দিতে পারে। যারা এমন কাজ করেন, তারা ধর্মকে দুনিয়া অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান। দুনিয়া অর্জন করা দোষনীয় নয়; তবে সেটা ইবাদতকে মার্কেটিং করে নয়। ইবাদতকে মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত। 

ভালো উদ্যোগ, তবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও গ্রাহক যেন প্রতারিত না হয়
ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান
চেয়ারম্যান, আদল অ্যাডভাইজরি, মালয়েশিয়া

পুরস্কার হিসেবে উমরার ঘোষণা দেওয়া শরিয়তে মৌলিকভাবে কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু পণ্যের প্রচার বা বিক্রির জন্য উমরা পালনের পুরস্কার ঘোষণা করার ক্ষেত্রে যে সমস্যার আশঙ্কা থাকে, তা হলো—পণ্যের স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করা এবং গ্রাহক পণ্যের মূল্য বিবেচনায় না নিয়ে বরং উমরা পালনের সুযোগ বড়ো করে দেখা, এর ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রতারিত হওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি যদি এটার কারণে মূল্য বাড়ানো হয়, তা হলে এটা মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে লটারিতে অংশগ্রহণের মতো; যা শরিয়তে জুয়ার সাদৃশ্য বলে বিবেচিত হয়। 
সর্বোপরি, অনেক সময় আমরা দেখি—বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অফার দেওয়া হয়। অর্থাৎ আপনি যদি বিনিয়োগ করেন, তা হলে পুরস্কার হিসেবে উমরার অফার দেওয়া হয়। এখানে একটা প্রশ্ন থাকে, উমরার যে অফার বা এই যে বড় পুরস্কার—আমরা জানি, সাধারণ পুরস্কারের তুলনায় উমরা করানোর পুরস্কার বেশ ব্যয়বহুল। এ ধরনের ব্যয়বহুল পুরস্কার কোথায় থেকে বহন করা হবে। এটা যদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে বহন করা হয়, তা হলে এটা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া আবশ্যক। যদি সেটা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে বহন করা না হয়, শুধু উদ্যোক্তার অংশ থেকে বহন করা হয়, তা হলে মৌলিকভাবে সেটাতে সমস্যা নেই।  নানা রকম অপপুরস্কারের এই সময়ে উমরার পুরস্কারটি ভালো উদ্যোগ। তবে বাজারমূল্যের চেয়ে পণ্যের মূল্য যেন বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে এবং এটি নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহকও যেন প্রতারিত না হয়। গ্রাহক স্বাভাবিকভাবে পণ্যের গুণগত মান বিচারে পণ্য ক্রয়ের যে হিতাহিত জ্ঞান, সেটা যেন না হারায়। এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে আশা করি অসুবিধে হবে না।

লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

 

আধুনিক বাজেট বনাম ইসলামের বায়তুল মাল

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আধুনিক বাজেট বনাম ইসলামের বায়তুল মাল
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় বাজেটের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি নিখুঁত আয়-ব্যয়ের হিসাব। তাত্ত্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

তবে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বাজেট অনেক সময়ই সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত করের জালে আটকে ফেলে এবং গুটিকয়েক পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ঠিক এই সংকটকালেই এক কালোত্তীর্ণ ও মানবিক সমাধান নিয়ে হাজির হয় ইসলামের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ‘বায়তুল মাল’ (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)। যার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি আমানতদারিতা এবং নিরেট মানবকল্যাণ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—রাষ্ট্রীয় বাজেটে ঘাটতি থাকলেও সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না, কারণ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ছিল সবসময় সুনিশ্চিত।

বর্তমান বিশ্বের কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোর বাজেট সাধারণত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেয়। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

সম্পদের এই কৃত্রিম ও অন্যায্য কেন্দ্রীকরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার শুধু বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।(সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

ইসলামি অর্থনীতির এই কালজয়ী দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বায়তুল মাল। আধুনিক ব্যবস্থার মতো সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে ইসলাম ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘জাকাত’ ও ‘উশর’ (ফসলের ওপর ধার্য অংশ) আদায়ের বিধান করেছে। এর ফলে সম্পদ সমাজের উচ্চস্তর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিম্নস্তরের দিকে প্রবাহিত হয়।

ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগ, বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে বায়তুল মাল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল রূপ লাভ করে। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর বিখ্যাত ‘কিতাবুল খারাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বায়তুল মালের মূল আয়ের উৎস ছিল—জাকাত, উশর, খুমুস (খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), খারাজ (ভূমি রাজস্ব) এবং জিজিয়া কর।

এখানে লক্ষণীয় যে, জাকাত থেকে অর্জিত অর্থ সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হতো। এটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা প্রশাসনিক খরচে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ ছিল না।

আজকের দিনে রাষ্ট্রগুলোকে ‘বাজেট ঘাটতি’ মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায়। বিপরীতে, বায়তুল মাল ব্যবস্থায় জাকাত ও সদকা ফান্ড সবসময় সংরক্ষিত থাকত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার জন্য। ফলে মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও দরিদ্র মানুষ কখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না।

প্রখ্যাত ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি তাঁর ‘রোল অব দ্য স্টেট ইন দ্য ইকোনমি: অ্যান ইসলামিক পারসপেক্টিভ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ইসলামে জনগণের ওপর কর বা রাজস্ব চাপানো তখনই বৈধ, যখন তা সরাসরি জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয় এবং বায়তুল মালের স্বাভাবিক উৎসগুলো অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এর বাইরে জনগণের ওপর কোনো ধরনের জুলুমমূলক কর চাপানোর সুযোগ ইসলামে নেই।

রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। তিনিই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় খাতা তৈরি করেন, যা ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত বাজেট ও বণ্টন নীতিমালা।

এই ব্যবস্থার আওতায় মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি নবজাতক শিশুদের জন্যও বায়তুল মাল থেকে বিশেষ অনুদান বরাদ্দ ছিল (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ইবনে জারির তাবারি)।

খলিফা ওমরের (রা.) মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় প্রখ্যাত আলেম আবু উবায়েদ আল-কাসিম ইবনে সালামের গ্রন্থে। সিরিয়া সফরকালে এক বৃদ্ধ অমুসলিম (ইহুদি) নাগরিককে ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা আফসোস করে বলেছিলেন, আমরা তোমার যৌবনে তোমার কাছ থেকে জিজিয়া নিলাম, আর এখন বৃদ্ধ বয়সে তোমাকে এভাবে ফেলে রাখলাম! এটা কখনোই হতে পারে না।

তিনি তৎক্ষণাৎ বায়তুল মালের কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যেন সেই বৃদ্ধ এবং তাঁর মতো সমস্ত অক্ষম ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।

বর্তমান যুগে বাজেট পাস হওয়ার পর আমলাতান্ত্রিক বিলাসিতা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং তথাকথিত ‘ভিআইপি সংস্কৃতির’ পেছনে জনগণের ট্যাক্সের বিশাল অর্থ অপচয় হতে দেখা যায়। কিন্তু ইসলামি দর্শনে বায়তুল মালের প্রতিটি পয়সা হলো জনগণের পবিত্র আমানত, যার সুনিপুণ হিসাব শাসককে পরকালে আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।

চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিহির কাছে লেখা এক চিঠিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ খরচের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ‘নাহজুল বালাগাহ’গ্রন্থে সংকলিত সেই চিঠিতে তিনি লেখেন, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি যদি জানতে পারি যে তুমি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে ছোট বা বড় কোনো অংশ নিজের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছ, তবে তোমার বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেব যা তোমাকে নিঃস্ব, কলঙ্কিত এবং ভারী বোঝার নিচে পিষ্ট করে ছাড়বে।

ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম ওমর চাপরা তাঁর ‘ইসলাম অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইসলামি রাষ্ট্রে বাজেট প্রণয়নের মূল ভিত্তিই হলো ‘আদল’ (ইনসাফ) ও ‘ইহসান’ (দয়া)। এখানে শাসক সম্পদের মালিক নন, বরং তিনি জনগণের পক্ষে একজন ট্রাস্টি বা জিম্মাদার মাত্র।

বর্তমান উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অনুৎপাদনশীল খাতে। এই চক্রাকার সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সামষ্টিক বাজেটের দর্শনে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

ইসলামের বায়তুল মাল ব্যবস্থা আমাদের দেখায় কীভাবে জাকাত এবং ওয়াক্ফ (জনকল্যাণে উৎসর্গীকৃত সম্পদ) ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে জাতীয় বাজেটের পরিপূরক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম কবির হাসান তাঁর ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স: প্রিন্সিপালস অ্যান্ড প্র্যাকটিস’গ্রন্থে মত প্রকাশ করেছেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি তাদের মোট জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ জাকাত ও ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে কাজে লাগাতে পারে, তবে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে সামাজিক নিরাপত্তার বিশাল চাপ অনেকটাই কমে যাবে।

ইসলামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বায়তুল মাল ব্যবস্থা মূলত সুশাসন, মানবিকতা ও সামাজিক আস্থার এক অপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ পথ প্রদর্শন করে। বাজেট কখনো ধনীদের আরও ধনী করার আইনি দলিল হওয়া উচিত নয়। বরং একটি আদর্শ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া।

লেখক:  প্রিন্সিপাল, মাদরাসা ফাতেমাতুজ জাহরা (রা.), মুহাম্মদপুর, ঢাকা। 

১২ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম
১২ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি
জুন, ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচির ছবি

প্রতিদিন সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ (সালাত) ইসলাজুনর পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং ইসলাজুনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘নামাজ (বুখারি ও মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’ (বুখারি, ৬৩১)

সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে হলে, নামাজের সময় জানতে হবে। 

আজ ১২ জুন ২০২৬, শুক্রবার। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো— 

জোহর

১২.০২ মিনিট

আসর

৪.৩৮ মিনিট

 

মাগরিব

৬.৫০ মিনিট

 

এশা

৮.১৬ মিনিট

ফজর (১৩ জুন)

.৪৪ মিনিট

 

 বিভাগীয় শহরের জন্য উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগে সময় যোগ-বিয়োগকরতে হবে।

বিয়োগ

চট্টগ্রাম: ৫ মিনিট

সিলেট: ৬ মিনিট

যোগ

খুলনা: ৩ মিনিট

রাজশাহী: ৭ মিনিট

রংপুর: ৮ মিনিট

বরিশাল: ১ মিনিট

সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন

হাদিস যাদের পাশে বসলে দুঃখ কমে, শান্তি বাড়ে

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
যাদের পাশে বসলে দুঃখ কমে, শান্তি বাড়ে
ছবি: সংগৃহীত

একটুখানি চোখ বুজে কল্পনা করুন, আপনি কয়েকজন বন্ধু বা পরিবার নিয়ে এক কোনায় বসে আল্লাহর প্রশংসা করছেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ থেকে ডানা মেলে একদল ফেরেশতা এসে আপনাদের চারপাশে ঘিরে ধরলেন! শুধু কি তাই? তাদের ডানার বিস্তার ছড়াতে ছড়াতে একেবারে প্রথম আসমান পর্যন্ত পৌঁছে গেল এবং স্বয়ং মহাবিশ্বের মালিক আল্লাহর কাছে আপনাদের নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হলো! এটি কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়, বরং আধ্যাত্মিক জগতের এক পরম বাস্তব। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জিকিরের মজলিসের এমন এক অনন্য অদৃশ্যের খবর দিয়েছেন, যা শুনলে যেকোনো মানুষের হৃদয় ঈমানের আলোয় আন্দোলিত হয়ে উঠবে।

মহাবিশ্বে আল্লাহর এমন কিছু বিশেষ ফেরেশতা আছেন, যাদের একমাত্র দায়িত্বই হলো দুনিয়ার বুকে কোথায় আল্লাহর নাম নেওয়া হচ্ছে তা খুঁজে বের করা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর অতিরিক্ত কিছু ভ্রাম্যমাণ ফেরেশতা আছেন, যারা ঘুরেফিরে জিকিরের মজলিস খুঁজতে থাকেন। যখন তারা এমন কোনো সম্প্রদায় বা মজলিস পেয়ে যান, তখন একে অপরকে ডেকে বলেন, ‘এসো, তোমাদের উদ্দেশ্যের দিকে।’ অতঃপর তারা নিজেদের ডানা দিয়ে তাদেরকে প্রথম আসমান পর্যন্ত ঢেকে ফেলেন। (বুখারি, ৬৪০৮; মুসলিম, ২৬৮৯)


যখন বান্দারা জিকির শেষ করে, তখন ফেরেশতারা আসমানে আরোহণ করেন। তখন আল্লাহতায়ালা সবকিছু জানা সত্ত্বেও ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার বান্দারা কী বলছিল?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘তারা আপনার তাসবিহ, তাকবির ও তাহমিদ (প্রশংসা) করছিল।’ তখন আল্লাহ ও ফেরেশতাদের মধ্যে এক চমৎকার প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে:

আল্লাহ: তারা কি আমাকে দেখেছে?

ফেরেশতা: না, হে প্রতিপালক! তারা আপনাকে দেখেনি।

আল্লাহ: কেমন হতো যদি তারা আমাকে দেখত?

ফেরেশতা: তারা আপনাকে দেখলে আরও বেশি ইবাদত ও তাসবিহ করত।

আল্লাহ: তারা কী চায়?

ফেরেশতা: তারা আপনার জান্নাত চায় এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ (আশ্রয়) চায়।

আল্লাহ: তারা কি জান্নাত বা জাহান্নাম দেখেছে?

ফেরেশতা: না, তারা দেখেনি।

আল্লাহ: কেমন হতো যদি তারা তা দেখত?

ফেরেশতা: দেখলে তারা জান্নাতের জন্য আরও বেশি ব্যাকুল হতো এবং জাহান্নামকে আরও বেশি ভয় করত।

তখন আল্লাহতায়ালা এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তাদের চাওয়া পূরণ করলাম এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলাম। ( বুখারি, ৬৪০৮; তিরমিজি, ৩৬০০)

এই হাদিসের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং একদম নতুন যে দিকটি আমাদের চোখ খুলে দেয়, তা হলো আল্লাহর ক্ষমার এক পরম উদারতা। ফেরেশতারা তখন আল্লাহকে বলেন, ‘হে প্রতিপালক! ওই মজলিসে অমুক নামের একজন চরম পাপী লোক ছিল, সে আসলে জিকির করতে বসেনি, বরং নিজের একটা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এমনিই তাদের সাথে এসে বসেছিল। আল্লাহতায়ালা তখন উত্তর দেন, আমি তাকেও ক্ষমা করে দিলাম! কারণ তারা এমন এক দল, যাদের পাশে যে এসে বসে, সেও কখনো বঞ্চিত বা হতভাগা হয় না। (মুসলিম, ২৬৮৯; মুসনাদে আহমাদ, ৭৩৭৬)

এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, ভালো মানুষের পাশে বসার মূল্য আল্লাহর কাছে কত বেশি। আপনি হয়তো নিজে অনেক বড় ইবাদতকারী নন, কিন্তু যারা আল্লাহকে ভালোবাসে, তাদের সান্নিধ্যে থাকলে আপনার অজান্তেই আপনার জীবনের পাপের খাতা শূন্য হয়ে যেতে পারে। 

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

যে তিন ব্যক্তি আল্লাহর নিকট ঘৃণিত

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
যে তিন ব্যক্তি আল্লাহর নিকট ঘৃণিত
ছবি: সংগৃহীত

ধর্মের নামে নতুন কিছু যোগ করা কি সত্যিই পুণ্য, নাকি তা বিনাশের কারণ? ইসলামের মূল সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতা রক্ষায় রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে চিরন্তন দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন, বর্তমান সমাজে তা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষের তৈরি মনগড়া রীতিনীতি কীভাবে দ্বীনের আলো থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, তারই এক প্রামাণ্য চিত্র উঠে এসেছে নির্ভরযোগ্য হাদিসসমূহে।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে নতুন কোনো সংযোজনের সুযোগ নেই। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০)।

অর্থাৎ, ইবাদত মনে করে দ্বীনের মাঝে নিজস্ব কোনো নিয়ম তৈরি করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। জাবের (রা.) বর্ণিত অন্য এক হাদিসে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খুতবায় বলতেন, শ্রেষ্ঠ বাণী আল্লাহর কিতাব এবং শ্রেষ্ঠ হেদায়াত মুহাম্মাদের হেদায়াত। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি (বিদ‘আত) এবং প্রত্যেক বিদ‘আতের পরিণতিই হলো পথভ্রষ্টতা ও জাহান্নাম (মুসলিম, মিশকাত হা/১৪১; নাসাঈ হা/১৫৭৮)।

ইসলামে প্রথার চেয়ে বিশ্বাসের শুদ্ধতা বড়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে জানা যায়, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি তিনজন:

১. হারামে নিষিদ্ধ কাজ বা সীমা লঙ্ঘনকারী।

২. ইসলামের ভেতরে এসেও জাহেলি যুগের রীতিনীতি বা কুসংস্কার চালু করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি।

৩. অন্যায়ভাবে কারও রক্তপাতকারী (বুখারি, মিশকাত হা/১৪২)।

ইসলামি আদর্শের বাইরে যেকোনো মনগড়া উৎসব বা অন্ধ অনুকরণই যে জাহেলিয়াত, তা এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হলেন সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী। একদা ফেরেশতারা তাঁর নিদ্রিতাবস্থায় (যার অন্তর জাগ্রত ছিল) একটি রূপক উদাহরণ দেন যেমন এক ব্যক্তি গৃহ নির্মাণ করে ভোজের আয়োজন করলেন এবং দূত পাঠালেন। যারা দূতের ডাকে সাড়া দিল, তারা ভোজ অংশ নিল।

এখানে গৃহটি হলো জান্নাত আর আহ্বানকারী স্বয়ং মুহাম্মাদ (বুখারি, মিশকাত হা/১৪৪)। সুতরাং, রাসুলের অবাধ্য হয়ে জান্নাতে প্রবেশের কোনো বিকল্প পথ নেই। ইরবায বিন সারিয়াহ (রা.) বর্ণনা করেন, একদা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমন এক মর্মস্পর্শী বক্তব্য দিলেন যা শুনে সাহাবিদের চোখ অশ্রুসজল হলো। বিদায়ী এই উপদেশে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বহু মতভেদ প্রকাশ পাবে।

তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে... মাড়ির দাঁতসমূহ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। (আহমাদ, আবু দাঊদ, তিরমিজি, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৬৫)। ধর্মের নামে প্রচলিত সব কুসংস্কার ও বিদ‘আত বর্জন করে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের দেখানো খাঁটি সুন্নাহর পথ আঁকড়ে ধরাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

শামায়েল রাসুল (সা.)-এর পিঠে কেমন ছিল মোহরে নবুওয়াত?

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১১:০১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ১১:০২ এএম
রাসুল (সা.)-এর পিঠে কেমন ছিল মোহরে নবুওয়াত?
ছবি: সংগৃহীত

আপনি কি জানেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিঠে এমন এক অলৌকিক চিহ্ন ছিল, যা দেখে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের পণ্ডিতরা তাঁকে শেষ নবি হিসেবে চিনে নিতেন? কেমন ছিল নবিজি (সা.)-এর দুই কাঁধের মাঝের সেই পবিত্র ‘মোহরে নবুওয়াত’, যা দেখে সাহাবিদের চোখ আটকে যেত?

মোহরে নবুওয়াত হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবয়বে দেওয়া এক অনন্য সিলমোহর ও নবুওয়াতের চূড়ান্ত নিদর্শন। এটি ছিল তাঁর দুই কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত একটি বিশেষ কুদরত।

সাহাবিরা বিভিন্ন সময়ে এই মোহরে নবুওয়াত অত্যন্ত কাছ থেকে অবলোকন করেছেন। বিখ্যাত সাহাবি সা’ইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) তাঁর শৈশবের এক স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বলেন, একবার তাঁর খালা তাঁকে নিয়ে নবিজি (সা.)-এর কাছে যান। নবিজি (সা.) তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন এবং অজু করেন। সা’ইব বলেন, ‘আমি তাঁর অজুর অবশিষ্ট পানি পান করলাম এবং তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সহসা তাঁর দুই কাঁধের মধ্যস্থিত মোহরে নবুওয়াতের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে, যা দেখতে পাখির (কবুতরের) ডিমের মতো।’ (সহিহ বুখারি, ১৯০; সহিহ মুসলিম, ৬২৩৩)

এই চিহ্নের রং ও অবয়ব কেমন ছিল, তা আরও স্পষ্ট জানা যায় হজরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.)-এর বর্ণনা থেকে। তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখেছি। আর তা যেন ছিল ডিমের মতো লাল গোশতপিণ্ড।’ (সহিহ মুসলিম, ৬২৩০; মিশকাত, ৫৭৭৯)

নবিজি (সা.)-এর এই সিলমোহরটি দেখার জন্য সাহাবিদের মনে প্রবল আগ্রহ থাকত। আনসারি নারী সাহাবি হজরত রুমায়সা (রা.) বলেন, ইসলামের মহান বীর সা’দ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর ওফাতের দিন রাসুল (সা.) এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন যে, সা’দের মৃত্যুতে রহমানের আরশ কেঁপে উঠেছে। রুমায়ছা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন এ উক্তি করেন তখন আমি তাঁর এত নিকটে ছিলাম যে, ইচ্ছে করলে তাঁর মোহরে নবুওয়াত চুম্বন করতে পারতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ, ২৬৮৩৬; মু’জামুল কাবীর, ২০১৬৫)

মোহরে নবুওয়াতের গঠনশৈলী নিয়ে আরেকটি চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায় আবু জায়েদ আমর বিন আখতাব আনসারি (রা.)-এর হাদিসে। নবিজি (সা.) একবার তাঁকে ডেকে বললেন, ‘হে আবু জায়েদ! আমার কাছে এসো এবং আমার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাও।’ তিনি যখন পিঠে হাত বুলাচ্ছিলেন, তখন তাঁর আঙুলগুলো সেই মোহরে নবুওয়াতের ওপর গিয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, সেই মোহরটি আসলে কেমন ছিল? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তা ছিল এক গুচ্ছ কেশ।’ (মুসনাদে আহমাদ, ২২৯৪০; মুস্তাদরাকে হাকেম, ৪১৯৮)

মুহাদ্দিসিনদের মতে, সেই গোশতপিণ্ডের ওপর বা তার চারপাশে একগুচ্ছ সুবিন্যস্ত চুল ছিল, যা দূর থেকে বা স্পর্শ করলে চুলের গুচ্ছের মতোই অনুভূত হতো। এটি কোনো শারীরিক ত্রুটি ছিল না, বরং ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে খোদাই করা এক পরম সৌন্দর্য, যা কেবল শেষ নবির ভাগ্যেই জুটেছিল।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক