সম্প্রতি অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পণ্যের বিক্রি বাড়াতে বিজ্ঞাপন বা ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন যে, ‘এত তারিখ থেকে এত তারিখের মধ্যে যারা আমাদের প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পণ্য ক্রয় করবেন বা আমাদের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করবেন—তাদের থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করে ৩ বা ৫ জনকে বিনামূল্যে উমরা পালনের জন্য পাঠানো হবে।’ ক্রেতারা উমরা পালনের সুযোগ লাভের আশায় পণ্য ক্রয় করেন বা বিনিয়োগে আগ্রহী হন। এটা মূলত কোম্পানির পণ্য বেশি বিক্রি হওয়ার এবং সহজে বিনিয়োগ লাভ করার একটি মার্কেটিং কৌশল। পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর বা বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মার্কেটিং কৌশল হিসেবে পবিত্র উমরা পালনের মতো ইবাদতকে পুরস্কার হিসেবে অফার দেওয়া ইসলামে বৈধ কি না—এ ব্যাপারে দেশের প্রথিতযশা মুফতিরা কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে।
ব্যবসার কৌশল হিসেবে উমরার অফার শর্ত সাপেক্ষে বৈধ
—মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ
সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি, ওআইসি
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন আর সুদ হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)। শররি দৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিক্রি বাড়ানো ও ক্রেতাদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পণ্য ক্রয়ে বিশেষ হাদিয়া/গিফট/উপঢৌকনের অফার দেওয়া বৈধ। এক্ষেত্রে গিফট পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে বা নির্ধারিত সংখ্যক পণ্য ক্রয়ের শর্ত করাও শরিয়ত অনুমোদিত। তবে অফারের কারণে পণ্যের দাম স্বাভাবিক মূল্য থেকে বাড়ানো যাবে না এবং গুণগত মান কমানো যাবে না। পণ্য ক্রয়ই ক্রেতার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে; শুধু লটারি বা পুরস্কার জেতার উদ্দেশ্যে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পণ্য ক্রয় করা যাবে না।
উল্লেখ্য, ক্রয়-বিক্রয়ের মূল চুক্তি বাধাগ্রস্ত না করে এবং ধোঁকা-প্রতারণার পথ না খোলে, ক্রেতা-বিক্রেতার এমন শর্ত সামাজিকভাবে ব্যাপক প্রচলিত হলে সম্পূর্ণ বৈধ। তবে যে শর্ত দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বের কারণ হয়, তা বৈধ নয়।
সুতরাং হজ-উমরার অফার দিয়ে পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে অফারের কারণে পণ্যের মূল্য স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়ানো বা গুণগত মান হ্রাস করা বৈধ হবে না। আর নিছক দ্বিপাক্ষিক লেনদেনে মালিকানা সন্দেহে ফেলে তথা জুয়া সংশ্লিষ্ট লটারি অবৈধ হলেও যা দ্বারা শুধু ব্যক্তি বা বস্তু নির্ধারণ করা হয়; এমন লটারি অবৈধ নয়। তা ছাড়া স্বেচ্ছায় প্রদত্ত একপক্ষীয় হিবা বা গিফট বিতরণে লটারি সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ। তাই শর্ত পাওয়া গেলে ব্যবসায়ীর জন্য ক্রেতাকে অবশ্যই উমরা করাতে হবে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরের ইচ্ছা করলে স্ত্রীদের মাঝে লটারি প্রক্রিয়া গ্রহণ করতেন। যার নাম আসত তিনি তাকে নিয়েই সফরে বের হতেন…।’ (বুখারি, হাদিস: ২৫৯৩)
পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর মার্কেটিং কৌশল হিসেবে পবিত্র উমরা পালনের মতো ইবাদতকে পুরস্কার বা অফার হিসেবে ঘোষণা করা ইসলামি শরিয়তে কোনো অসুবিধে নেই। (আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি, হাদিস: ১৪৮২১; হেদায়া শরহে বেদায়াতুল মুবতাদি ৩/৮৬; ফাতাওয়ায়ে উসমানি, ৩/২৫৭)
অনিশ্চিত পুরস্কারের লোভ ও জুয়ার সাদৃশ্য হলে নাজায়েজ
—মুফতি শাহেদ রাহমানী
চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স বাংলাদেশ
পণ্যের বিক্রি বাড়ানো এবং বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মার্কেটিং কৌশল হিসেবে পবিত্র উমরা পালনের মতো ইবাদতকে পুরস্কার বা অফার হিসেবে ঘোষণা করা—নিচের শর্ত পাওয়া গেলে বৈধ হবে, অন্যথায় অবৈধ। শর্তগুলো হলো—
১. কোম্পানি তাদের পণ্যের এমন মূল্য নির্ধারণ করবে, যা বাজারে প্রচলিত এই জাতীয় পণ্যের বাজারমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কোম্পানি পুরস্কারের কারণে সাধারণ বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে না। যদি কোম্পানি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রি করে, তা হলে ধরে নিতে হবে, গ্রাহক পুরস্কারের আশায় অধিক মূল্যে এই কোম্পানির পণ্য কিনেছে। যেহেতু উমরা প্যাকেজ পাওয়া নিশ্চিত নয়; তাই জুয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে নাজায়েজ বিবেচিত হবে।
২. কোম্পানি পুরস্কার স্কিমকে নিজের ত্রুটিপূর্ণ পণ্য বিক্রির মাধ্যম বানাবে না। অর্থাৎ উমরা প্যাকেজের লোভ দেখিয়ে গ্রাহককে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ করবে না। নতুবা এই অবস্থাতেও জুয়ার সাদৃশ্য তৈরি হবে।
৩. গ্রাহকের মূল উদ্দেশ্য হবে কোম্পানির পণ্য কিনে উপকৃত হওয়া; অনিশ্চিত পুরস্কার লাভ নয়। পুরস্কার একটি আনুষঙ্গিক ও অতিরিক্ত বিষয় হবে। যদি কোম্পানি বিনামূল্যে তা দেয়, তা হলে ভালো, নতুবা তা কোনো বিষয় নয়। প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকের এই পণ্যের প্রয়োজন না থাকার পরও যদি শুধু অনিশ্চিত এই পুরস্কারের আশায় পণ্য ক্রয় করে, তা হলে এই অবস্থাতেও জুয়ার সঙ্গে সাদৃশ্য হওয়ার ফলে নাজায়েজ হবে।
যদি উল্লিখিত শর্ত রক্ষা করে কোম্পানির পক্ষ থেকে লটারির মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া হয়, তা হলে তা দান ও অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য হবে। গ্রাহকের জন্য এ অবস্থায় পুরস্কার নেওয়া জায়েজ হবে। যদি জায়েজ পদ্ধতিতে করা লটারিতে কারও নাম আসে, তবে তা সংগ্রহ করার পর ব্যক্তি তার মালিক হবে। পুরস্কারটি নিজের ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করার অধিকারী হবে। চাইলে উমরা পালনে যেতে পারবে। অথবা অন্য কাজে ব্যবহারের অধিকার পাবে।
ইবাদতকে মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত
—মুফতি শাহ ওয়ালী উল্লাহ
খতিব, সোবহানবাগ জামে মসজিদ, ঢাকা
মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে কোনো ইবাদত বা উমরার মতো ইবাদতকে মাধ্যম করা কি আসলে উচিত? ইসলামের ইতিহাসে বা পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলেম-ফকিহদের যুগে কোনো ইবাদত বা উমরার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র ইবাদতকে মার্কেটিং বা পণ্য বিক্রির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার নজির নেই। সময়ের পালাবদলে আমরা যাদের থেকে জ্ঞান আহরণ করেছি, যাদের বই পড়েছি—তাদের সময়ে এমন কোনো ইবাদতকে মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় না। অতীতে পাওয়া যায়নি, নিঃসন্দেহে এটি নতুন বিষয়। বর্তমান পৃথিবীর আয়েম্মা-মুজতাহিদিনদের কাছে ব্যাপারটি তুলে ধরা প্রয়োজন। পৃথিবীর কোনো দেশেই হয়তো মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে পণ্য বিক্রির জন্য কোনো ইবাদতকে অফার দেওয়া হয় না। আলাদাভাবে হতে পারে, কেউ ইবাদত সম্পূর্ণ করেছে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কেউ চল্লিশ দিন জামাতের সঙ্গে নামাজ সম্পূর্ণ করেছে, তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পুরস্কার দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু পণ্যের বিক্রি বাড়ানো এবং বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ইবাদতকে ব্যবহার করার বিষয়টি নতুন। যার দৃষ্টান্ত অতীতে নেই। আমার মনে হয়, ব্যাপারটি নিয়ে বিশ্লেষণ করা ও আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
আমার বিবেচনায় ইবাদতকে মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াটা বন্ধ করা ভালো। তবে এটাকে মার্কেটিংয়ের কৌশল হিসেবে না করে দান বা উপহার হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। ব্যবসায়ীর লাভ হলে ক্রেতাদের মধ্য থেকে লটারি করে কয়েকজনকে দিতে পারে। যারা এমন কাজ করেন, তারা ধর্মকে দুনিয়া অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান। দুনিয়া অর্জন করা দোষনীয় নয়; তবে সেটা ইবাদতকে মার্কেটিং করে নয়। ইবাদতকে মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত।
ভালো উদ্যোগ, তবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও গ্রাহক যেন প্রতারিত না হয়
—ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান
চেয়ারম্যান, আদল অ্যাডভাইজরি, মালয়েশিয়া
পুরস্কার হিসেবে উমরার ঘোষণা দেওয়া শরিয়তে মৌলিকভাবে কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু পণ্যের প্রচার বা বিক্রির জন্য উমরা পালনের পুরস্কার ঘোষণা করার ক্ষেত্রে যে সমস্যার আশঙ্কা থাকে, তা হলো—পণ্যের স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করা এবং গ্রাহক পণ্যের মূল্য বিবেচনায় না নিয়ে বরং উমরা পালনের সুযোগ বড়ো করে দেখা, এর ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রতারিত হওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি যদি এটার কারণে মূল্য বাড়ানো হয়, তা হলে এটা মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে লটারিতে অংশগ্রহণের মতো; যা শরিয়তে জুয়ার সাদৃশ্য বলে বিবেচিত হয়।
সর্বোপরি, অনেক সময় আমরা দেখি—বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অফার দেওয়া হয়। অর্থাৎ আপনি যদি বিনিয়োগ করেন, তা হলে পুরস্কার হিসেবে উমরার অফার দেওয়া হয়। এখানে একটা প্রশ্ন থাকে, উমরার যে অফার বা এই যে বড় পুরস্কার—আমরা জানি, সাধারণ পুরস্কারের তুলনায় উমরা করানোর পুরস্কার বেশ ব্যয়বহুল। এ ধরনের ব্যয়বহুল পুরস্কার কোথায় থেকে বহন করা হবে। এটা যদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে বহন করা হয়, তা হলে এটা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া আবশ্যক। যদি সেটা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে বহন করা না হয়, শুধু উদ্যোক্তার অংশ থেকে বহন করা হয়, তা হলে মৌলিকভাবে সেটাতে সমস্যা নেই। নানা রকম অপপুরস্কারের এই সময়ে উমরার পুরস্কারটি ভালো উদ্যোগ। তবে বাজারমূল্যের চেয়ে পণ্যের মূল্য যেন বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে এবং এটি নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহকও যেন প্রতারিত না হয়। গ্রাহক স্বাভাবিকভাবে পণ্যের গুণগত মান বিচারে পণ্য ক্রয়ের যে হিতাহিত জ্ঞান, সেটা যেন না হারায়। এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে আশা করি অসুবিধে হবে না।
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক