জীবদ্দশায় অনেকেই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বন্ধু, আত্মীয় বা বিশ্বস্ত কারও কাছে মূল্যবান জিনিসপত্র বা অর্থ আমানত হিসেবে রেখে যান। অনেক সময় মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় বলে যান যে, তার মৃত্যুর পর এই গচ্ছিত জিনিস যেন নির্দিষ্ট কোনো ওয়ারিশকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, মৃত ব্যক্তির এমন নির্দেশ কি শরিয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর? এই পরিস্থিতিতে আমানতগ্রহীতার করণীয় কী?
আমানত ও উত্তরাধিকার: ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি যদি জীবদ্দশায় কারও কাছে কোনো কিছু গচ্ছিত রেখে বলে যে, আমার মৃত্যুর পর এই জিনিস আমার অমুক ওয়ারিশকে দেবে, তা হলে এক্ষেত্রে উল্লিখিত ব্যক্তি (যাকে জিনিসটি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে) এই আমানতের একক মালিক হবে না। বরং, এই আমানত মৃত ব্যক্তির অন্যান্য সাধারণ ত্যাজ্যসম্পদের মতোই গণ্য হবে। এর কারণ হলো, মৃত্যুর পর ব্যক্তির সমুদয় সম্পদ উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য হয়ে যায় এবং শরিয়তের নির্ধারিত মিরাস আইন অনুযায়ী তা বণ্টন করা আবশ্যক। কোনো ওয়ারিশকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার জন্য বা কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে এমন নির্দেশ কার্যকর হয় না।
আমানতগ্রহীতার করণীয়: তা হলে আমানতগ্রহীতার দায়িত্ব কী? তাকে অবশ্যই জিনিসটি ওয়ারিশদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তবে, এখানে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি:
এক. স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: যদি আমানতগ্রহীতা আশঙ্কা করেন যে, নির্দিষ্ট ওয়ারিশকে জিনিসটি দিলে তা অন্যান্য ওয়ারিশের কাছে পৌঁছবে না বা তাতে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে, তা হলে তাকে এ ব্যাপারে অন্য ওয়ারিশদের জানিয়ে দিতে হবে।
দুই. সম্মুখীন হস্তান্তর: সবচেয়ে ভালো হয়, যদি আমানতগ্রহীতা অন্য ওয়ারিশদের সামনেই জিনিসটি হস্তান্তর করেন। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা অভিযোগের সুযোগ থাকবে না।
কেন এই বিধান: ইসলামের উত্তরাধিকার আইন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা নিজেই ওয়ারিশদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ যেন সকল হকদারের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হয় এবং সমাজে কোনো বৈষম্য সৃষ্টি না হয়। মৃত ব্যক্তির কোনো ব্যক্তিগত নির্দেশনা, যা শরিয়তের মৌলিক বিধানের পরিপন্থি, তা কার্যকর হয় না। এটি নিশ্চিত করে যে, কোনো ওয়ারিশ যেন তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হয়।
অতএব, গচ্ছিত আমানত হোক বা অন্য যেকোনো সম্পদ, মৃত্যুর পর তা শরিয়তের মিরাস আইন অনুযায়ীই বণ্টিত হবে। আমানতগ্রহীতার দায়িত্ব হলো এই বিধান মেনে চলা এবং সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে আমানতকে তার প্রকৃত হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক