পবিত্র মাহে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার এক অনন্য পাঠশালা। ইসলাম আমাদের এমন এক সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়, যেখানে মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক হবে সহোদর ভাইয়ের মতো। বিশেষ করে রমজানের এই বরকতময় সময়ে শ্রমিকের প্রতি সদয় হওয়া এবং তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকা একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রমজানে রোজা রেখে কঠোর পরিশ্রম করা যে কোনো শ্রমিকের জন্য কষ্টসাধ্য। এ প্রসঙ্গে মানবতার মুক্তিদূত মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে তার অধীনস্থ শ্রমিকের কাজ সহজ করে দেবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার হিসাব সহজ করে দেবেন।’ (বুখারি)।
একজন আদর্শ মালিকের পরিচয় হলো, এই মাসে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রতি রহম করা। ইসলাম শ্রমবিমুখতাকে ঘৃণা করে এবং পরনির্ভরশীলতাকে নিরুৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করো।’ (সুরা জুমুয়া, ১০)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শ্রমজীবীর উপার্জনকে ‘উৎকৃষ্টতর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি নবিরাও নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। যারা কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন, আল্লাহ তাদের গোনাহ মাফ করে দেন। বিপরীতে, সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তিকে ইসলাম ‘অগ্নিদগ্ধ পাথর’ ও চরম অবমাননাকর হিসেবে গণ্য করেছে।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্রমিকরা দিন-রাত ঘাম ঝরালেও মালিকপক্ষ পাওনা আদায়ে গড়িমসি করে। অথচ ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো— ‘শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, কিয়ামতের দিন তিনি স্বয়ং সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, যে শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়ে তার পূর্ণ মজুরি প্রদান করেনি।
শান্তিপূর্ণ কর্মপরিবেশের জন্য যেমন মালিকের সহানুভূতি প্রয়োজন, তেমনি শ্রমিকের সততা ও আমানতদারিও অপরিহার্য। যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে পূর্ণ ঈমান নেই। একজন শ্রমিকের উচিত তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করা। অন্যদিকে, মালিকের উচিত শ্রমিকের ছোটখাটো ভুলকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। হযরত আনাস (রা.) দীর্ঘ দশ বছর রাসুলের (সা.) খেদমত করেছেন, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো তাকে সামান্য ধমক পর্যন্ত দেননি।
রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধার যন্ত্রণা। এই বোধ থেকে মালিকদের উচিত শ্রমিকের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকরা আমাদেরই ভাই। তারা যেন তাদের পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে রোজা ও ঈদ পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। আমরা যদি তাদের প্রতি দয়া করি, তবেই আরসের অধিপতি আমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক