ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মিসরকে কেন জার্সি পরিবর্তন করতে বলল ফিফা? রবিবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবস যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায় রাজধানীতে প্রান্তিক গ্রামের ফুটবল উন্মাদনা, আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল ম্যাচ একদিনে ৫ মরদেহ উদ্ধার, বরগুনায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ দাউদকান্দিতে শিবির নেতার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায়কারীরা জনগণের বন্ধু নয়: তারেক রহমান মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করায় আনন্দ মিছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আগারগাঁওয়ে ‘রান ফর আর্থ’ আয়োজন সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি লেকে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু জনদুর্ভোগ নিরসন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি ডা. শফিকুর রহমানের ভারতীয় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে ধীরাজ শেঠ ‘তুই আসামি, চোখ নামিয়ে কথা বল’—ওসির বিরুদ্ধে নাঈম হাসানের অভিযোগ প্রযুক্তিদক্ষ তরুণরাই গড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সোনারগাঁওয়ে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক হবে: শিক্ষামন্ত্রী জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ বিআইপির আলোচিত সিনেমার সিক্যুয়েল নিয়ে জয়া টেইলর সুইফটের নতুন রেকর্ড পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি? সাংবাদিকতায় দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন: মোস্তফা কামাল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনের তারিখ ঘোষণা নিজেকে সমকামী বলে কটাক্ষের জবাব দিলেন মৌনী ফ্যাশনে বিশ্বকাপ মাদক কারবারে হাজার কোটিপতির উত্থান, দাবি ভূমিমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা: পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরে প্রশংসিত সঞ্জয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র এআই উদ্ভাবনে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির কৃতিত্ব, ফাইনালে ‘কগনিভার্স’ ‘সবুজ সাথী’ সম্মাননায় ভূষিত সিলেট সিটি করপোরেশন
Nagad desktop

যে নারীকে বিবাহ করা চিরতরে নিষিদ্ধ

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
যে নারীকে বিবাহ করা চিরতরে নিষিদ্ধ
ইসলামের একটি অপরিহার্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে কিছু নিকটাত্মীয় নারীকে বিয়ে করা চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাদেরকে 'মাহরাম' বলা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন নয়, এর পেছনে রয়েছে সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, নৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত কারণ। এই বিধান পারিবারিক কাঠামোকে পবিত্র, নিরাপদ ও সুসংহত রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক ও নৈতিক কারণে একজন উন্নত ও সুস্থ মানুষের মনে কিছু নিকটাত্মীয়ের প্রতি জৈবিক আকর্ষণ তৈরি হয় না। একজন সুস্থ মানুষ কখনও নিজের মা, বোন বা মেয়ের প্রতি জৈবিক চাহিদা অনুভব করে না। খালা ও ফুফুর প্রতিও মানুষের সহজাতভাবে মায়ের মতোই সম্মান ও স্নেহের অনুভূতি থাকে।

একইভাবে, ভাতিজি-চাচা এবং ভাগনি-মামা সম্পর্ক সমাজে সাধারণত মেয়ে-বাবার মতোই মনে করা হয়, যেখানে স্নেহ ও অভিভাবকত্বের সম্পর্কই প্রধান। অনেক বন্য প্রাণীও এই ধরনের সম্পর্ক থেকে বিরত থাকে।

পারিবারিক জীবনে এই নিকটাত্মীয়দের সাথে নিয়মিত এবং অবাধে মেলামেশা করতে হয়। সাধারণত এসব নারীর সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত ওঠাবসা ও প্রচুর চলাফেরা করতে হয়। এজন্য এদের সঙ্গে যদি স্থায়ীভাবে বিয়ে হারাম না হতো, তাহলে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার বা ফিতনার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকত। মাহরামের এই বিধান দৈনন্দিন জীবনকে পবিত্র ও নিরাপদ করে।

ইসলাম শুধু বিদ্যমান সম্পর্ককে সুরক্ষা দেওয়াই নয়, বরং নতুন আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি করে সামাজিক ঐক্য বাড়াতে চায়। এসব নিকটাত্মীয় নারীদের সঙ্গে পুরুষের একটি চিরস্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিরাজমান থাকে—যা সম্মান, শ্রদ্ধা বা আদর-স্নেহ হিসেবে প্রকাশিত হয়। যেহেতু এই সম্পর্ক চিরস্থায়ী, তাই এখানে বিয়ের মাধ্যমে নতুন আত্মীয়তা সৃষ্টির প্রয়োজন নেই।

অনাত্মীয়দের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়লে নতুন করে কিছু আত্মীয় হয়, যেমন- শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর, ননদ ইত্যাদি। আর এভাবেই মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও 'মুহাব্বত'-এর বিস্তার ঘটে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তিনি তোমাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। (সুরা রুম, ২১)

মাহরাম সম্পর্কগুলো চিরস্থায়ী আবেগ ও মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এদের মধ্যে বিয়ে হলে সেই সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এসব নিকটাত্মীয় নারী ও পুরুষের মধ্যকার চিরায়ত সম্পর্ক (সম্মান বা স্নেহ) যেভাবে টিকে আছে, সেভাবেই সদা বহাল রাখা দরকার। কিন্তু এদের মধ্যে বিয়ে হলে এসব আবেগ ও সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবনে বাকবিতণ্ডা, মতানৈক্য ও ঝগড়াঝাঁটি হতেই পারে, যা কখনো বিচ্ছেদ ও তালাকের দিকে গড়ায়। নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যদি এমন কিছু হয়, তাহলে সেই চিরায়ত ভালোবাসা ও আবেগে ফাটল ধরে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে এবং বৃহৎ পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।

নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের মধ্যে শারীরিক বা মেধাগত কোনো রোগ বা অসুস্থতা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মও সেসব রোগ ও অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি থাকে। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এড়ানোর জন্যও এদের মাঝে পারস্পরিক বিয়ে না হওয়াটাই যৌক্তিক।

আরো পড়ুন: যে আয়াত আপনার নিরাপত্তার স্বর্গীয় ঢাল

বিবাহের পর স্ত্রীর অধিকার আদায় এবং রক্ষার জন্য সাধারণত স্ত্রীর নিকটাত্মীয়রা (যেমন ভাই বা বাবা) স্বামীর সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে বা মধ্যস্থতা করতে পারেন।

কিন্তু যদি এই নারীর রক্ষকই (ভাই বা বাবা) বিয়ের কারণে তার স্বামী হয়ে যান, তাহলে দাম্পত্য বিরোধেু তার অধিকার রক্ষা করবে কে? এই বিধান নারীর অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ অবস্থান তৈরি করে। মাহরাম নারীকে বিয়ে না করার বিধান পারিবারিক পবিত্রতা, সামাজিক ভারসাম্য এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও স্বাস্থ্যগত কল্যাণের জন্য ইসলামের একটি অপরিহার্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

 

ঘটনা যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায়

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায়
ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা ইসলামের অন্যতম মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা—ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিত মানুষের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে এই ঐশী বিধানকে অমান্য করে, তখনই নেমে আসে বিপর্যয়। সুরা আল-কালামে বর্ণিত ‘বাগানওয়ালাদের’ ঐতিহাসিক ঘটনাটি তেমনই এক চিরন্তন শিক্ষার স্মারক।

ইয়েমেনের সানা নগরীর কাছে এক আল্লাহভীরু ব্যক্তির একটি বিশাল ফলের বাগান ছিল। তিনি নিয়মিত বাগানের আয়ের একটি বড় অংশ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলেরা সেই বাগানের মালিক হয়। কিন্তু পিতার উদারতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছেলেদের স্পর্শ করেনি। বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে তারা চরম কৃপণ ও অদহংকারী হয়ে ওঠে।

একদিন ভাইয়েরা মিলে এক গোপন বৈঠক করল। লোভের বশবর্তী হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল—পিতার মতো তারা আর গরিবদের একটি কণাও দেবে না। এক ভাই বাধা দিতে চাইলেও বাকিরা তা শুনল না। তারা পরিকল্পনা করল, ভোরের আলো ফোটার আগেই বাগানের সব ফসল কেটে ঘরে তুলে ফেলবে, যাতে কোনো অভাবী মানুষ টের পেয়ে কিছু চেয়ে না বসে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষরাতে তারা বাগানের দিকে রওনা হলো। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল! তাদের অবাধ্যতা ও কৃপণতার শাস্তিস্বরূপ রাতের অন্ধকারে আল্লাহর নির্দেশে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে গেছে। পুরো বাগানটি আগুনে পুড়ে কালো ছাই হয়ে পড়ে আছে। যে সম্পদ নিয়ে তারা অহংকার করেছিল, নিমেষেই তা ধ্বংস হয়ে গেল।

সর্বস্ব হারিয়ে ভাইদের ভুল ভাঙল। তারা বুঝতে পারল, সম্পদ একা ভোগ করার জিনিস নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার। তারা নিজেদের অন্যায়ের জন্য আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করল। আল্লাহ অত্যন্ত দয়াময়; তিনি তাদের ক্ষমা করলেন এবং পরবর্তী সময়ে বাগানটিকে আবার সুমিষ্ট ফলে ভরিয়ে দিলেন।

এই ঘটনা আমাদের শেখায়, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত পেয়ে যারা অহংকার করে এবং গরিবের হক নষ্ট করে, তাদের পতন অনিবার্য। অসহায়দের ভালোবাসা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দরিদ্র মুমিনরা ধনীদের চেয়ে পাঁচ শ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাই সম্পদ জমিয়ে রাখা নয়, বরং তা বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত বরকত।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি?

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি?
ছবি: সংগৃহীত

রক্তের নদী, জ্বলন্ত তন্দুর আর সোনা-রুপার শহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চোখে দেখা পরকালের সেই শিহরিত করা দৃশ্যপট আজ আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে? রাসুল (সা.) প্রায়ই সাহাবিদের জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি? কিন্তু এক সকালে তিনি নিজেই শোনালেন এক অভূতপূর্ব সফরের কথা। জিবরাঈল ও মিকাঈল (আ.)-এর সঙ্গে রাতের আঁধারে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন এক ভিন্ন জগতে, যেখানে উন্মোচিত হয়েছিল মানুষের ইহকালীন পাপ ও পুণ্যের পরকালীন প্রতিচ্ছবি।

সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত গভীর সেই সফরের দৃশ্যগুলো আমাদের চেনা পৃথিবীর চেনা অপরাধেরই এক ভয়ঙ্কর রূপক:
আল্লাহর রাসুল (সা.) দেখলেন, এক ব্যক্তি কাত হয়ে শুয়ে আছে আর ভারী পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছে। অপরাধ? সে কোরআন শিখেও তা আমল করেনি এবং ফরজ নামাজ ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকত।

অপর এক ব্যক্তির চোয়াল, নাক ও চোখ লোহার আঁকড়া দিয়ে টেনে মাথার পেছন পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল। আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, এই শাস্তি ছিল ঠিক সেই মিথ্যুকদের জন্য, যাদের মিথ্যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ত।
একটি সংকীর্ণ মুখের জ্বলন্ত তন্দুর চুলার ভেতর উলঙ্গ নারী-পুরুষের আর্তনাদ দেখালেন ফেরেশতাদ্বয়। তারা হলো দুনিয়ার ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।

রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে থাকা এক ব্যক্তির মুখে তীরের লোক ক্রমাগত পাথর ছুড়ে মারছিল। সে ছিল দুনিয়ার সুদখোর।
এই ভয়ঙ্কর শাস্তির খণ্ডচিত্র পার হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) পৌঁছালেন এক শান্তিময় সবুজ বাগানে। সেখানে দীর্ঘকায় নবি ইব্রাহিম (আ.)-এর চারপাশে খেলা করছিল নিষ্পাপ শিশুরা, যাদের মধ্যে মুশরিকদের সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সফরের শেষ প্রান্তে সোনা ও রুপার ইটের তৈরি এক অপরূপ শহরে অর্ধেক সুন্দর আর অর্ধেক কুৎসিত দেহের কিছু মানুষকে ধপধপে সাদা নদীতে ডুব দিয়ে পূর্ণ সুন্দর হতে দেখা গেল–যারা দুনিয়ায় ভালো-মন্দ আমল মিশ্রিত করেছিল এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। জিবরাঈল ও মিকাঈল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য নির্ধারিত জান্নাতি প্রাসাদটি দেখিয়ে বললেন, দুনিয়ার অবশিষ্ট আয়ু পূর্ণ হলেই আপনি এখানে প্রবেশ করবেন।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, পরকালের শাস্তি কোনো রূপকথা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন কর্মেরই অবিকল প্রতিফলন। আমাদের একটি ক্লিক বা অসচেতন ঘুমও পরকালের চিরস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক  

যে অঙ্গের কারণে মানুষ জান্নাত অথবা জাহান্নামে যাবে

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
যে অঙ্গের কারণে মানুষ জান্নাত অথবা জাহান্নামে যাবে
ছবি: খবরের কাগজ

মানুষের শরীরের মাত্র দুটি ছোট অঙ্গ কীভাবে তার অনন্তকালের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে? আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, মানুষের মুখ ও লজ্জাস্থানই তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ শিখরে ওড়াতে পারে, আবার নিক্ষেপ করতে পারে জাহান্নামের অতল গহ্বরে। বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, সাইবার বুলিং ও সামাজিক অশান্তির মূল উৎসগুলোর দিকে তাকালে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ১৪শ বছর আগের সতর্কবার্তা আমাদের এক নতুন ভাবনার খোরাক দেয়।

কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে, আর কোন জিনিসই বা টেনে নিয়ে যাবে জাহান্নামে? সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক অনন্য হাদিসে এর জবাব দিয়েছেন বিশ্বনবি। তিনি বলেন, মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে, আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। আর মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে, মুখ ও লজ্জাস্থান (মিশকাত, হা/৪৬২১)।

জিহ্বা দিয়ে মানুষ যেমন সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা ছড়াতে পারে, তেমনি লজ্জাস্থানের অপব্যবহার সমাজে অশ্লীলতা ও লাঞ্ছনার জন্ম দেয়।
মুক্তির এক অভিনব ও সহজ চুক্তি রয়েছে ইসলামে। সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তু (জিহ্বা) এবং তার দু’পায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর (লজ্জাস্থান) জিম্মাদার হবে (হেফাজত করবে), তবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব (বুখারি, মিশকাত হা/৪৬০১)।

আজকের যুগে মানুষের সামনে এক রূপ আর পেছনে অন্য রূপ ধারণ করা এক মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে ‘দ্বিমুখী’ মানুষ, যে একেক দলের কাছে একেক রূপ নিয়ে হাজির হয় (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮২২)। গিবত, তোহমত ও চোগলখুরির মতো কবীরা গুনাহ মানুষকে অজান্তেই ধ্বংসের মুখোমুখি করে। এ কারণেই হুঁশিয়ারি এসেছে, চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত হা/৪৬১২)।

আমরা প্রতিদিন বহু কথা হেলায়-ফেলায় বলে যাই। অথচ আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত অন্য এক হাদিস অনুযায়ী, মানুষ কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কথা বলে যার গুরুত্ব সে নিজেও জানে না, কিন্তু আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। পক্ষান্তরে, মানুষ অসতর্কভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কথা বলে ফেলে, যা তাকে জাহান্নামের এত গভীরে নিক্ষেপ করে, যার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের সমান (বুখারি, মিশকাত হা/৪৮১৩)।
মুখের লাগাম টেনে ধরা এবং নিজের চরিত্রকে কলঙ্কমুক্ত রাখাই হলো সফলতার মূল চাবিকাঠি। ক্ষণিকের অসতর্কতা যেন আমাদের চিরস্থায়ী আফসোসের কারণ না হয়।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক   

শামায়েল কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক?

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৯ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:৩১ এএম
কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক?
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ফ্যাশনের যুগে আমরা অনেকেই জানি না চুল রাখার ব্যাপারে নবিজি (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ ও এর বিবর্তন কেমন ছিল! রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র অবয়বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর পরিপাটি কেশবিন্যাস। তিনি সর্বদা চুল পরিষ্কার ও সুবিন্যস্ত রাখতেন। সাহাবিদের বর্ণনা থেকে তাঁর চুলের দৈর্ঘ্য, ধরন এবং তা আঁচড়ানোর চমৎকার পদ্ধতি জানা যায়।

নবিজি (সা.)-এর চুল একদম সোজা বা অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিল না। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস (রা.)-কে তাঁর চুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি অত্যধিক কোঁকড়ানো কিংবা একেবারে সোজা কেশবিশিষ্ট ছিলেন না। তাঁর কেশ উভয় কানের লতি পর্যন্ত শোভা পেত।’ (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১, সহিহ মুসলিম: ৬২১৩)

অবস্থাভেদে তাঁর চুল কখনো কাঁধের কাছাকাছি আবার কখনো কানের লতি পর্যন্ত দীর্ঘ হতো। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) একত্রে একই পাত্রের পানি দ্বারা গোসল করতাম। আর তাঁর চুল কানের লতি এবং মধ্যবর্তী স্থান বরাবর লম্বা ছিল।’ (মিশকাত: ৪৪৬০, শারহুস-সুন্নাহ: ৩১৩৭)

হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবিজি (সা.) ছিলেন মধ্যমাকৃতির দেহবিশিষ্ট এবং তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান ছিল প্রশস্ত, যেখানে কানের লতি পর্যন্ত ঝুলন্ত চুলগুলো এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করত। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১, সহিহ মুসলিম: ৬২১০)

নবিজি (সা.) কীভাবে চুল আঁচড়াতেন, তার মাঝেও একটি সুন্দর ইতিহাস রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কার প্রাথমিক জীবনে রাসুল (সা.) তাঁর চুল সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন, অর্থাৎ কোনো সিঁথি করতেন না। সে সময় মক্কার মুশরিকরা মাথায় সিঁথি করত, আর আহলে কিতাবরা (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) চুল ঝুলিয়ে রাখত। ওহি না আসা পর্যন্ত রাসুল (সা.) আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি চুলে নিয়মিত সিঁথি করা শুরু করেন এবং এটিই তাঁর স্থায়ী সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫৮, নাসাঈ: ৫২৩৮)


নবিজি (সা.)-এর চুল রাখার আরেকটি বিশেষ রূপের কথা জানা যায় মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে। হজরত উম্মে হানি বিনতে আবু তালিব (রা.) বলেন, ‘একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি চুলের বেণি নিয়ে মক্কায় আগমন করেছিলেন।’ (আবু দাউদ: ৪১৯৩, ইবনে মাজাহ: ৩৬৩১)

মুহাদ্দিসিনদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বেণি বা ঝুঁটি নারীদের মতো ছিল না। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে চুল যেন ধুলোবালিতে এলোমেলো না হয়ে যায়, সেজন্য পুরুষালি গাম্ভীর্য বজায় রেখে চুলগুলোকে চারটি ভাগে সুন্দর ও পরিপাটি করে গুটিয়ে রাখা হয়েছিল। এটি পুরুষদের জন্য নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন নয়, বরং চুলের বিশেষ যত্নের একটি রূপ ছিল।রাসুল (সা.)-এর সুবিন্যস্ত চুলের এই বিবরণ আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের বাহ্যিক অবয়ব সর্বদা পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও সুন্দর হওয়া কতটা জরুরি।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

আধুনিক বাজেট বনাম ইসলামের বায়তুল মাল

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আধুনিক বাজেট বনাম ইসলামের বায়তুল মাল
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় বাজেটের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি নিখুঁত আয়-ব্যয়ের হিসাব। তাত্ত্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

তবে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বাজেট অনেক সময়ই সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত করের জালে আটকে ফেলে এবং গুটিকয়েক পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ঠিক এই সংকটকালেই এক কালোত্তীর্ণ ও মানবিক সমাধান নিয়ে হাজির হয় ইসলামের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ‘বায়তুল মাল’ (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)। যার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি আমানতদারিতা এবং নিরেট মানবকল্যাণ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—রাষ্ট্রীয় বাজেটে ঘাটতি থাকলেও সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না, কারণ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ছিল সবসময় সুনিশ্চিত।

বর্তমান বিশ্বের কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোর বাজেট সাধারণত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেয়। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

সম্পদের এই কৃত্রিম ও অন্যায্য কেন্দ্রীকরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার শুধু বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।(সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

ইসলামি অর্থনীতির এই কালজয়ী দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বায়তুল মাল। আধুনিক ব্যবস্থার মতো সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে ইসলাম ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘জাকাত’ ও ‘উশর’ (ফসলের ওপর ধার্য অংশ) আদায়ের বিধান করেছে। এর ফলে সম্পদ সমাজের উচ্চস্তর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিম্নস্তরের দিকে প্রবাহিত হয়।

ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগ, বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে বায়তুল মাল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল রূপ লাভ করে। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর বিখ্যাত ‘কিতাবুল খারাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বায়তুল মালের মূল আয়ের উৎস ছিল—জাকাত, উশর, খুমুস (খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), খারাজ (ভূমি রাজস্ব) এবং জিজিয়া কর।

এখানে লক্ষণীয় যে, জাকাত থেকে অর্জিত অর্থ সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হতো। এটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা প্রশাসনিক খরচে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ ছিল না।

আজকের দিনে রাষ্ট্রগুলোকে ‘বাজেট ঘাটতি’ মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায়। বিপরীতে, বায়তুল মাল ব্যবস্থায় জাকাত ও সদকা ফান্ড সবসময় সংরক্ষিত থাকত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার জন্য। ফলে মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও দরিদ্র মানুষ কখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না।

প্রখ্যাত ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি তাঁর ‘রোল অব দ্য স্টেট ইন দ্য ইকোনমি: অ্যান ইসলামিক পারসপেক্টিভ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ইসলামে জনগণের ওপর কর বা রাজস্ব চাপানো তখনই বৈধ, যখন তা সরাসরি জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয় এবং বায়তুল মালের স্বাভাবিক উৎসগুলো অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এর বাইরে জনগণের ওপর কোনো ধরনের জুলুমমূলক কর চাপানোর সুযোগ ইসলামে নেই।

রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। তিনিই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় খাতা তৈরি করেন, যা ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত বাজেট ও বণ্টন নীতিমালা।

এই ব্যবস্থার আওতায় মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি নবজাতক শিশুদের জন্যও বায়তুল মাল থেকে বিশেষ অনুদান বরাদ্দ ছিল (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ইবনে জারির তাবারি)।

খলিফা ওমরের (রা.) মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় প্রখ্যাত আলেম আবু উবায়েদ আল-কাসিম ইবনে সালামের গ্রন্থে। সিরিয়া সফরকালে এক বৃদ্ধ অমুসলিম (ইহুদি) নাগরিককে ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা আফসোস করে বলেছিলেন, আমরা তোমার যৌবনে তোমার কাছ থেকে জিজিয়া নিলাম, আর এখন বৃদ্ধ বয়সে তোমাকে এভাবে ফেলে রাখলাম! এটা কখনোই হতে পারে না।

তিনি তৎক্ষণাৎ বায়তুল মালের কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যেন সেই বৃদ্ধ এবং তাঁর মতো সমস্ত অক্ষম ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।

বর্তমান যুগে বাজেট পাস হওয়ার পর আমলাতান্ত্রিক বিলাসিতা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং তথাকথিত ‘ভিআইপি সংস্কৃতির’ পেছনে জনগণের ট্যাক্সের বিশাল অর্থ অপচয় হতে দেখা যায়। কিন্তু ইসলামি দর্শনে বায়তুল মালের প্রতিটি পয়সা হলো জনগণের পবিত্র আমানত, যার সুনিপুণ হিসাব শাসককে পরকালে আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।

চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিহির কাছে লেখা এক চিঠিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ খরচের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ‘নাহজুল বালাগাহ’গ্রন্থে সংকলিত সেই চিঠিতে তিনি লেখেন, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি যদি জানতে পারি যে তুমি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে ছোট বা বড় কোনো অংশ নিজের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছ, তবে তোমার বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেব যা তোমাকে নিঃস্ব, কলঙ্কিত এবং ভারী বোঝার নিচে পিষ্ট করে ছাড়বে।

ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম ওমর চাপরা তাঁর ‘ইসলাম অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইসলামি রাষ্ট্রে বাজেট প্রণয়নের মূল ভিত্তিই হলো ‘আদল’ (ইনসাফ) ও ‘ইহসান’ (দয়া)। এখানে শাসক সম্পদের মালিক নন, বরং তিনি জনগণের পক্ষে একজন ট্রাস্টি বা জিম্মাদার মাত্র।

বর্তমান উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অনুৎপাদনশীল খাতে। এই চক্রাকার সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সামষ্টিক বাজেটের দর্শনে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

ইসলামের বায়তুল মাল ব্যবস্থা আমাদের দেখায় কীভাবে জাকাত এবং ওয়াক্ফ (জনকল্যাণে উৎসর্গীকৃত সম্পদ) ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে জাতীয় বাজেটের পরিপূরক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম কবির হাসান তাঁর ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স: প্রিন্সিপালস অ্যান্ড প্র্যাকটিস’গ্রন্থে মত প্রকাশ করেছেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি তাদের মোট জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ জাকাত ও ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে কাজে লাগাতে পারে, তবে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে সামাজিক নিরাপত্তার বিশাল চাপ অনেকটাই কমে যাবে।

ইসলামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বায়তুল মাল ব্যবস্থা মূলত সুশাসন, মানবিকতা ও সামাজিক আস্থার এক অপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ পথ প্রদর্শন করে। বাজেট কখনো ধনীদের আরও ধনী করার আইনি দলিল হওয়া উচিত নয়। বরং একটি আদর্শ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া।

লেখক:  প্রিন্সিপাল, মাদরাসা ফাতেমাতুজ জাহরা (রা.), মুহাম্মদপুর, ঢাকা।