রহমত, মাগফিরাত ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহার সাথে জড়িয়ে আছে দেশের লাখ লাখ গরিব, এতিম এবং দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাগ্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কোরবানি এলেই প্রতি বছর একদল অসাধু চক্রের অপতৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে যে নজিরবিহীন কারসাজি চলছে, তা কেবল একটি সম্ভাবনাময় শিল্পকেই ধ্বংস করছে না; বরং এর পেছনে কওমি মাদরাসাগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সংকটে ফেলার এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
কোরবানির চামড়া স্রেফ কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি এদেশের লাখ লাখ এতিম, মিসকিন এবং দ্বীনি শিক্ষার্থীদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। যুগ যুগ ধরে কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি কোনো অনুদান ছাড়াই, সম্পূর্ণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দান এবং কোরবানির চামড়ার তহবিল দিয়ে তাদের 'লিল্লাহ ফান্ড' পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু আজ একশ্রেণির সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী এবং অদৃশ্য ইশারায় চামড়ার দামকে এমন এক হাস্যকর ও লজ্জাজনক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা চামড়াশিল্পকে ধ্বংসের পাশাপাশি মাদরাসাগুলোর স্বাবলম্বী হওয়ার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
যে দেশে এক জোড়া চামড়ার জুতো কিনতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লাগে, সেই দেশে আস্ত একটি গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা! চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ আর শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার পর মাদরাসাগুলোর হাতে যা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে এতিম শিশুদের এক সপ্তাহের খাবার খরচও জোটে না। এটি বাজারের কোনো স্বাভাবিক মন্দা নয়, বরং স্পষ্টতই একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিপর্যয়!
যারা ভাবছেন চামড়ার দাম কমিয়ে কওমি মাদরাসাগুলোকে বিপাকে ফেলবেন, তারা ভুল ধারণার মধ্যে আছেন। কওমি মাদরাসা কোনো করপোরেট ফান্ডের ওপর ভর করে গড়ে ওঠেনি; এটি টিকে আছে মহান রবের অশেষ রহমত এবং এদেশের মুসলিম জনতার অগাধ ভালোবাসার ওপর। চামড়ার দাম শূন্যে নামিয়ে দিলেও কওমি মাদরাসার এই দ্বীনি অভিযাত্রা কখনো থমকে যাবে না, ইনশাআল্লাহ।
তবে এই কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে দেশের বিবেকবান নাগরিক, ওলামায়ে কেরাম এবং সাধারণ জনগণকে এখনই সোচ্চার হতে হবে। সিন্ডিকেটের এই নোংরা চক্র থেকে চামড়াশিল্প ও সমাজকে মুক্ত করতে হবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে চামড়া বাজারের এই কৃত্রিম ধসের পেছনের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা।
ইসলামের অন্যতম প্রধান বিধান এবং গরিবের হকের ওপর যারা আঘাত হানছে, ইতিহাস তাদের কখনো ক্ষমা করবে না। চামড়া নিয়ে এই নোংরা রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া বড় প্রয়োজন।
চামড়া নিয়ে এই কৃত্রিম সংকট শুধু একটি শিল্পের ক্ষতি নয়, বরং তা সমাজের অবহেলিত এতিম-মিসকিন ও দ্বীনি শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণের শামিল। মাদরাসাগুলো মানুষের ভালোবাসায় টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে; কোনো অপচেষ্টাই তাদের আলোর পথ রোধ করতে পারবে না। আসুন, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি স্বার্থ ভুলে মানবতার কল্যাণে এবং গরিবের হক রক্ষায় আমরা সবাই আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হই। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক ও সুন্দর বিবেচনাবোধ দান করুন। আমিন।
লেখক: ভাইস প্রিন্সিপাল, জামিয়া ইমাম বুখারী