নিজের মতো করে একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাটের স্বপ্ন সবারই থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে এই সংকট বেশি দেখা যায়। তবে গ্রাহকদের স্বস্তি দিতে এগিয়ে এসেছে দেশের বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তারা বাড়ি বানানো বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেয়। তবে এই ঋণ কীভাবে নিতে হবে এবং ঋণের জন্য কী ধরনের কাগজপত্র লাগে, সাধারণ গ্রাহকদের অনেকেই তা জানেন না। ফলে ভয়ে তারা ঋণ নিতে চান না।
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে গেলে সাধারণত শর্ত থাকে ৭০ বনাম ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ একজন গ্রাহক ১ কোটি টাকা বাজেটের ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে গেলে অথবা বাড়ি বানাতে গেলে ৭০ লাখ টাকাই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন। বাকিটা সেই গ্রাহককেই বহন করতে হবে। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানভেদে এই হিসাব কিছুটা হেরফের হয়। তবে মোটাদাগে হিসাবটা এ রকমই। ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ১০ লাখ টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানভেদে এর পরিমাণও কম বেশি হতে পারে। ঋণ নিতে হলে বিবেচনায় রাখতে হবে বয়সও। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বাড়ির মালিক এবং স্বনির্ভরশীল ব্যক্তিমাত্রই যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হোম লোন নিতে পারবেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারই নিজের একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। কাগজপত্রের তেমন কোনো জটিলতা নেই। ঋণ পেতে হলে গ্রাহকের বয়স ২৫ থেকে ৬৫ বছর হতে হবে। চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার এমনকি বাড়ির মালিকরাও এই ঋণ নিতে পারবেন।
অনেকেই মনে করেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে গেলে কাগজপত্রের জটিলতা পোহাতে হয়। ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। একটু নিয়ম মেনে চললে এবং কাগজপত্র ঠিক থাকলে সহজশর্তে যেকোনো ঋণ পাওয়া যায়। ফ্ল্যাট বা জমির ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ডেভেলপারের সঙ্গে সম্পাদিত ক্রয়ের রেজিস্ট্রি করা চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি দিতে হবে। লাগবে জমির মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি এবং অনুমোদিত নকশা ও অনুমোদনপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি।
ফ্ল্যাট কেনার রেজিস্ট্রি বায়নাপত্রের মূল কপি এবং বরাদ্দপত্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হবে। বাড়ি নির্মাণ ঋণের জন্য প্রথমেই দরকার যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশার সত্যায়িত ফটোকপি, মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান এবং খাজনা রসিদের সত্যায়িত ফটোকপি। আরও লাগবে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ানের সত্যায়িত কপি, যা সংগ্রহ করতে হয় জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে। এ ছাড়া লাগবে জেলা বা সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে ১২ বছরের তল্লাশিসহ নির্দায় সনদ (এনইসি) এবং সরকার থেকে বরাদ্দ পাওয়া জমির ক্ষেত্রে লাগবে মূল বরাদ্দপত্র ও দখল হস্তান্তরপত্র।
ফ্ল্যাট বা জমি কেনার সময় অনেকেই মর্টগেজ ঋণ বা বন্ধকি ঋণ নিয়ে থাকেন। ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থায়ী সম্পদ জামানত রেখে তার বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করাকেই বলা হয় বন্ধকি ঋণ। এই ঋণ সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদের জন্য নেওয়া হয়, যার মেয়াদকাল ৫ থেকে ২০ বছর কিংবা তার বেশি হতে পারে। মর্টগেজের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কাছে স্থায়ী সম্পদ জামানত হিসেবে রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত জামানত হচ্ছে জমির দলিল। মর্টগেজ ঋণ নেওয়ার জন্য জমির দলিল জমা রেখে সাধারণত ঋণ নেওয়া যায়। এই লোন নিয়ে অনেকে বাড়ির কাজ সেরে ফেলেন। পরে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করেন।
মর্টগেজ ঋণ নিতে প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনের সময় কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ঋণ পাওয়ার আগে চূড়ান্ত পর্যায়ে আরও কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গত এক বছরের ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, ইউটিলিটি বিলের কপি, গত এক বছরের ব্যাংক বিবরণী, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, জামিনদারের কাগজপত্র, বন্ধকযোগ্য সম্পদের দলিলপত্র, যন্ত্রপাতি হলে মালিকানা সাপেক্ষে প্রমাণপত্র, স্যালারি সার্টিফিকেট ইত্যাদি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে একক ব্যক্তির পক্ষে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করা অনেক কঠিন। একদিকে যেমন চাহিদামতো জমি পাওয়া কঠিন, অন্যদিকে জমির দামও অনেক বেশি। আর নির্মাণকাজ তো এক ‘মহাযজ্ঞ’। এ ক্ষেত্রে সহজ সমাধান হিসেবে অনেকেই ফ্ল্যাট কেনার কথা ভাবেন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডেভেলপার কোম্পানিগুলো তৈরি করা ফ্ল্যাট বিক্রি করছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে স্থায়ী আবাস হিসেবে মানুষ ফ্ল্যাট কেনার দিকে বেশি ঝুঁকছেন। সুলভমূল্যের কারণে ফ্ল্যাট কেনার ব্যাপারে গ্রাহকদের আগ্রহ বেশি। তবে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নিতে গেলেও ক্রেতাদের বেশ কিছু বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।
যেমন: গ্রাহক যে ফ্ল্যাটটি কিনবেন, তার মালিকানার প্রমাণপত্র, মূল জমির আমমোক্তারনামার সঠিকতা, প্রজেক্টের জমির নামজারি ঠিক আছে কি না, তা দেখার পাশাপাশি জমির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করা, ফ্ল্যাটটির ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র, বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত ফ্ল্যাটটি সরেজমিনে নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, ঋণের জন্য ফ্ল্যাটটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক আছে কি না, ফ্ল্যাটটি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না, এ ছাড়া ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ঝামেলা এড়াতে সব ধরনের চার্জ, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং দায়দায়িত্ব স্পষ্টভাবে জেনে নিতে হবে।