পয়লা বৈশাখের কথা মনে হলে অনেক কথাই চলে আসে। কারণ, পয়লা বৈশাখে যেসব অনুষ্ঠান হয়, তা বাঙালির জীবনের সঙ্গে হাজার বছর ধরে চলে এসেছে। আমাদের ভাষা ও পালাপার্বণ, এমনকি আদিবাসীদের যে বৈসাবি অনুষ্ঠান হয় তার সঙ্গে বাঙালির জীবনের সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে। তাই পাকিস্তান আমলে পয়লা বৈশাখে আলপনা, নবান্ন–এসব ভাবা একেবারে নিষিদ্ধ ছিল।
একটি স্বাধীনতা ও একটি মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে। চিন্তাচেতনায় আমরা অনেক প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পেরেছি। আমরা মুক্তভাবে নিজেদের কথা ও নিজেদের জীবনের কথা চিন্তা করতে পারছি। বাংলাদেশের এই যে ষড়ঋতু তা কত শক্তিশালী একটি বিষয়, সেটা হয়তো আমরা কেউ কেউ উপলব্ধি করতাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝত না, এমনকি লেখাপড়া জানা মানুষেরও এ উপলব্ধি ছিল না। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতি সব সময় প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। জীবনযাপন, সংস্কৃতি, হাসি-কান্না, বিয়ে, ঈদ, পূজা বা পাহাড়িদের অনুষ্ঠান–সবকিছুই ছিল ঋতুর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের পোশাক-আশাক কী হবে, আমরা কোন গৃহে থাকব, চাষবাস কেমন হবে–সবকিছু বাংলার ষড়ঋতুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। প্রতিটি ঋতুকে ভিত্তি করেই আমাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন একটি বলয়ের মধ্যে আবর্তিত হয়ে এসেছে। এটাকেই জাতীয়ভাবে নিয়ে আসার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে পড়লাম একসময়। কারণ, দীর্ঘদিন পাকিস্তানের সংস্কৃতির জাঁতাকলে থেকে আমরা অনেক কিছু থেকে দূরে চলে এসেছিলাম।
১৯৬৬ সালের পরে চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকরা বৈশাখের কথা চিন্তা করতে শুরু করলাম। চারুকলার শিল্পীরা আমরা এ বিষয়ে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে বসতাম। আমাদের প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন, শিল্পী কামরুল হাসান, কবি সুফিয়া কামাল এবং তার স্বামী কামালউদ্দিন খান। তাদের বাড়িকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হয়েছিল। সেখানে আমরা শিক্ষকরা ছিলাম, বন্ধুরা ছিল, সংস্কৃতির মানুষরা ছিল এবং ছিল আমাদের কিছু ছাত্র। তখন যারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তখন তাদের হয়েও আমরা পোস্টার, ফেস্টুন করে দিতাম। এভাবে কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা শক্তি তৈরি হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করলেন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা তখন বলল, শেখ মুজিব বিচ্ছিন্নতাবাদী। তখন তীব্র আন্দোলন শুরু হলো। সে আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হচ্ছে, আমরা শিল্পীরা ১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে একটা প্রদর্শনী করলাম। সে বছর গ্যালারি থেকে প্রদর্শনী আমরা শহিদ মিনারে নিয়ে এলাম। একটি প্রদর্শনীর নাম দিয়েছিলাম ‘বর্ণমালার বিদ্রোহ’। অ-তে অজগর আসছে তেড়ে, আ-তে আমটি খাব পেড়ে। এ অজগর হচ্ছে পাকিস্তানের শাসকরা। বিক্ষুব্ধ বর্ণমালা দিয়ে আমরা ছবি এঁকেছিলাম সব শিল্পী। জয়নুল আবেদিন, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম–সবাই ছবি এঁকেছিলেন। শিল্পী রশিদ চৌধুরী ছবি এঁকেছিলেন ‘দুর্গার বিদ্রোহ’। সেই প্রদর্শনী ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
’৬৮ সালেই আমরা ছাত্র-শিক্ষকরা চারুকলায় পয়লা বৈশাখ উদযাপন করলাম। এ আয়োজনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন শিল্পী এমদাদ হোসেন; তিনি তখন সরকারি চাকরি করতেন। তিনি উদ্যোগী হয়ে কাজ শুরু করে দিলেন, ছাত্রদেরও টেনে আনলেন। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, আমার বন্ধু রফিকুন নবী, বুলবন ওসমান, শাহাদাত চৌধুরী, আবুল বারক আলভী, বীরেন সোম, বিজয় সেন, রেজাউল করিম, মতলুব আলী, মঞ্জুরুল হাইদের। বাইরের অনেক আর্টিস্ট ছিলেন। এমদাদ হোসেন নাম সেবার বৈশাখ উদযাপনের নাম দিয়েছিলেন ‘কালবৈশাখী’।
বৈশাখ শুরু হয় কালবৈশাখী দিয়ে। ধ্বংস হয়। কারা দেশকে ধ্বংস করেছে, স্বৈরশাসকরা। বজ্রপাত হয়, ঝড় হয়, মানুষ আবার উঠে দাঁড়ায়। তারপর কিন্তু পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসে। পরের বছর থেকে ‘বাংলা নববর্ষ’ নাম দিয়ে আমরা উদযাপন শুরু করলাম। আমরা সেই বছর মিছিল বের করলাম। বর্তমানের মতো এত বড় পরিসরে ছিল না। তখন শোভাযাত্রার কোনো নাম ছিল না। মঙ্গল শোভাযাত্রার নামকরণ করা হয় আরও পরে।
স্বাধীনতার পরে আমরা এটা চালিয়ে যাই। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা বাড়তে থাকে। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আমরা তিন দিনের একটা অনুষ্ঠান করতাম। প্রদর্শনী তো হতোই। সেই সঙ্গে আমাদের ছাত্ররা শখের হাঁড়ি, মুখোশ, পোস্টার ইত্যাদি বানাত। এগুলো আমরা অল্প পয়সায় বিক্রি করতাম। লোকশিল্পীদের আমরা আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসতাম। তারা আমাদের সঙ্গে মেলার কাজ করত।
স্বাধীনতার পর সব সংস্কৃতিশিল্পী এ পয়লা বৈশাখ পালনে যোগ দেন। ডাকসু নেতারা, যারা তখন ছাত্র আন্দোলন করেন, তারা এসেছিলেন। রাজনীতিবিদরা এসেছিলেন। তখন অনেকেই আমাদের অনুদান দিয়েছিলেন। বাইরে থেকে লোকশিল্পীদের আনা হতো। প্রচুর খরচ হতো। দিন দিন বৈশাখী আয়োজনের প্রসার বাড়তে থাকে। তারপর একসময় মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে আমরা পয়লা বৈশাখ উদযাপন শুরু করলাম।
‘মঙ্গল’ নামটা এল এভাবে যে, অমঙ্গলের ঘনঘটা সব সময় থাকবে, বাধা আসবে, স্বৈরাচারও থাকবে। কিন্তু আমরা যে কাজ করব সেটা জনগণের মঙ্গলের জন্য, জাতির মঙ্গলের জন্য, দেশের মঙ্গলের জন্য। কারণ মঙ্গলের জন্য যদি আমরা ভাবি তাহলে কিন্তু স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হয়ে যায়; অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হয়ে যায়। এ থিমের ওপর নির্ভর করেই ছাত্ররাই শোভাযাত্রার নামকরণ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই মঙ্গল শোভাযাত্রায় দারুণ সাড়া মিলল। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন একটা উৎসবে পরিণত হলো। পরে ইউনেসকো গ্রহণ করল এটা, সারা পৃথিবীর মানুষ গ্রহণ করল।
এবার পয়লা বৈশাখ উদযাপনের আগে দেশের পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সারা বিশ্বে যে যুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছেন, তাতে বাংলাদেশও নানাভাবে আক্রান্ত। আমাদের অর্থনীতি এখন এমন একটা দুর্বিষহ অবস্থায় আছে। যে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছিল, তারা অনেক আশা-ভরসা দিয়েছিল। কিন্তু আমরা কী পেয়েছি আর কী পাইনি, সেটা আমরা জানি। তারা একটি ইলেকশন ছাড়া তো তেমন কিছুই দিতে পারেনি। এখন বিএনপি সরকার চেষ্টা করছে যেন দেশের পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক করা যায়।
এবার নির্বাচনের এমন কিছু দলের প্রার্থী জিতে এসেছেন, যারা বাংলাদেশ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। সেগুলো দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে আমরা এখন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি কি? আমাদের ভাবতে হচ্ছে। নানা চাপ আছে।
তাতে কী? আমরা কি পয়লা বৈশাখ উদযাপন, নবান্নের অনুষ্ঠান ছেড়ে দেব? আমরা তো এগুলো ছাড়ব না কখনো। এগুলো আমাদের আত্মার প্রকাশ, সৌন্দর্যের প্রকাশ, স্বাধীনতার প্রকাশ।
এবার চারুকলা থেকে বলছে, আনন্দ মিছিল হবে না, মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে না। নববর্ষে মিছিল হবে আর তাতে ‘মঙ্গল’, ‘আনন্দ শব্দ’ উচ্চারিত হবে না, তা কি হয়? কেউ কেউ তাদের ইচ্ছামতো অনেক কিছু করতে পারে, অন্যরকম অর্থ দিতে পারে। কিন্তু যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, যারা এ সংস্কৃতি নিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, তারা কিন্তু সবাই দেশের গান গাইবেন। ছায়ানট, উদীচী, রবিরাগ, সুরের ধারা, থিয়েটারের প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই অনুষ্ঠান করবে। গ্রামে-গ্রামে মেলা হবে। বর্ষবরণ আয়োজনে সবই হবে। হয়তো আগের মতো হবে না; কিন্তু হতে হবে। এজন্য হতে হবে যে, আগামী প্রজন্মকে বোঝাতে হবে আমাদের একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি মুক্তভাবে চলাফেরার জন্য। আমরা মুক্তভাবে আমাদের সংস্কৃতিকে লালন করব। এজন্য বলি, যে যেখানে আছেন, পয়লা বৈশাখ পালন করবেন। ভয়ের কিছু নেই, কারণ আমরা সত্যের পক্ষে, সুন্দরের পক্ষে, সংস্কৃতির পক্ষে। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সব বিপদকে অতিক্রম করতে হবে।
পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা, নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়