দেশে ব্যাংকঋণের সুদেরহার বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ বিতরণে ধাক্কা লেগেছে। তবে গৃহঋণে এর খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। এই খাতে এখনো চাঙাভাব দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা প্রত্যাহারের পর অন্য ঋণের সুদের হার যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে আবাসন ঋণের সুদ বাড়েনি।
ব্যাংকগুলো এখনো ১২-১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আবাসন খাতে ঋণ দিচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফ্ল্যাট কেনার ঋণে সুদহার অবশ্য ১৫-১৬ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এদিকে শিল্পঋণের সুদহার বেড়ে ইতোমধ্যে ১৭-১৮ শতাংশে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনের শেষে ব্যাংকগুলোতে ফ্ল্যাট তথা আবাসন ঋণের গ্রহীতা ছিলেন ৪৯ হাজার ৮৪৪ জন। এর বিপরীতে ঋণের স্থিতি ছিল ২২ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৯ হাজার ৪০২ কোটি। আর ঋণের স্থিতি বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে গ্রহীতা বেড়েছে ৯ হাজার ৫৫৮ জন, ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ২৮৬ টাকা।
২০২০ সালে করোনা মহামারির শুরুতে দেশের আবাসন ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। এরপর সুদহার কমলে খাতটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। শুধু ঘুরে দাঁড়ানোই নয়, বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি অন্য বিভাগ এবং বিভিন্ন জেলা শহরেও ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেলা শহরগুলোতেও এই ঋণ বিতরণে মনোযোগ বাড়ায়।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবাসন ঋণ দিতে আগ্রহী হওয়ার বড় কারণ হলো, এটি তুলনামূলক নিরাপদ। এ ঋণ তাড়াতাড়ি খেলাপি হয় না। আর ঋণ পরিশোধের আগে গ্রাহকের নামে ফ্ল্যাট পুরোপুরি রেজিস্ট্রেশন করা যায় না। তাই গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধের বিষয়ে খুবই সচেতন থাকেন।
২০২০ সালের এপ্রিলে সুদের হার কমে ৯ শতাংশ হওয়ার পর থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেন তা আরও কমানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ বাড়ায় এমনটি হয়। এর ফলে বেশির ভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ঋণের সুদহার কমে সাড়ে ৮ শতাংশে নামে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ৯ শতাংশ সুদহার প্রত্যাহার করা হয়।
তখন থেকে আবার সুদের হার বাড়তে থাকে। এরপর গত মে মাস থেকে সুদের হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা হয়। এতে সুদহার আরও বাড়ে। তবে সুদহার বাড়লেও যারা আগে ঋণ নিয়েছেন, তাদের মাসিক কিস্তি বাড়েনি। গত বছরের জুলাইয়ের আগে যারা গৃহঋণ নিয়েছেন, ব্যাংকের সুদহার বাড়লেও তাদের কিস্তির পরিমাণ বাড়বে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কিস্তির টাকা না বাড়িয়ে কিস্তির সংখ্যা ও মেয়াদ বাড়িয়ে বাড়তি সুদ আদায়ের নির্দেশনা দেয়।
কোনো কোনো ব্যাংক নিজেরা ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের ঋণও কিনে নেয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকায় সে ক্ষেত্রে সুদ কিছুটা কম হয়। সার্বিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবাসন ঋণ বিতরণে জোর দেওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও নতুন ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আবাসন খাতে ঋণ বিতরণে শীর্ষ ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে আইএফআইসি, ব্র্যাক, দি সিটি, ডাচ্-বাংলা, প্রাইম, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ব্যাংক এশিয়া ইত্যাদি। এই খাতে ঋণ বিতরণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডিবিএইচ, আইডিএলসি, আইপিডিসি, ন্যাশনাল হাউজিং, লংকাবাংলা এগিয়ে আছে।
আবাসন ঋণের সুদহার কমিয়ে প্রথম বড় আলোচনায় আসে বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংক। ২০১৫ সালের শুরুর দিকেও ব্যাংকটি যেখানে গৃহঋণের বিপরীতে ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদ নিত, সেখানে একই বছরের ডিসেম্বরে তা কমিয়ে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশে নামিয়ে আনে। তখন ব্যাংক খাতে সুদহার ছিল ১৫ শতাংশের ওপরে। এর ফলে কম সুদে ঋণ বিতরণে সাফল্য আসে। গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি আবাসন ঋণ নেন আইএফআইসি ব্যাংক থেকে। ব্যাংকটির ‘আমার বাড়ি’ নামে আলাদা একটি প্রডাক্ট রয়েছে। এই ব্যাংককে অনুসরণ করে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই পথে হাঁটতে শুরু করে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহককে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (লিজিং কোম্পানি) আগে থেকেই গ্রাহকের চাহিদামতো ঋণ দিতে পারছে। ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) আরও বেশি পরিমাণ ঋণ দেয়। সরকারি এ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সুদহারও অন্যদের চেয়ে কম।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স ফ্ল্যাট কেনার জন্য এখন প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করছে। গত বছর সরকার পরিবর্তনের আগে এর পরিমাণ আরও বেশি ছিল। তাদের ঋণের সুদহার বেড়ে এখন সাড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমানে আবাসন ঋণের গতি কিছুটা কমে গেছে। মূল্যস্ফীতি ও সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ঋণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তবে পূবালী ব্যাংকের আবাসন ঋণ কমেনি। তারা গ্রাহকদের ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রতি মাসে ৩০ কোটি টাকার মতো ঋণ বিতরণ করছে। ঋণের সুদহার ১০ দশমিক ৫০ থেকে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। ব্যাংকটি বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ফ্ল্যাটের ঋণ আগের ধারাতেই রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী খবরের কাগজকে বলেন, আমরা সবসময় গ্রাহকদের চাহিদা ও বাজারের পরিবর্তনশীলতা বিবেচনা করে নতুন পণ্য ও সেবা সুবিধা চালু করছি। প্রতিনিয়ত ঋণ প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য কাজ করছি এবং গ্রাহকদের জন্য আরও সুবিধাজনক শর্তাবলি প্ৰণয়ন করার চেষ্টা করছি। এর পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের আরও সহজ, আকর্ষণীয় ও সাশ্রয়ী অফার উপস্থাপন করছি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গৃহঋণের সুদের হার বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক। আমাদের গৃহঋণের সুদের হার নির্ভর করে ঋণের প্রকারভেদ, গ্রাহকের ক্রেডিট স্কোর এবং অন্য শর্তাবলির ওপর। বর্তমানে গৃহঋণের সুদের হার ১০ দশমিক ৫০ থেকে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ, তবে এটি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। আমরা সর্বদা গ্রাহকদের সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে সুদের হার নির্ধারণ করার চেষ্টা করি।