পুরাতন বছর বিদায় নিচ্ছে। নতুন ইংরেজি বছর ২০২৬-কে আমরা বাংলাদেশের মানুষ স্বাগতম জানাচ্ছি অনেক আশা নিয়ে। নতুন বছরে আমরা একটি জাতীয় সংসদ গঠনের নির্বাচন পেতে যাচ্ছি। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন শান্তি ও অগ্রগগতির পথ দেখাক- নববর্ষে সে কামনাই করছি।
জাতীয় সংসদের মাধ্যমে একটি নতুন নির্বাচিত সরকার পেতে যাচ্ছি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দেশের সমৃদ্ধির জন্য এ সংসদ শুভ সূচনা করবে, এটাও আমাদের আশা। তীব্র আর্থ-সামাজিক বৈষম্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে। তাই বৈষম্য নিরসনকারী আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নকে অবহেলা বা ঝুলিয়ে রাখা নতুন জন-অসন্তোষের জন্ম দেবে।
আর্থ-সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনার অন্যতম উপায় হচ্ছে সবার জন্য স্বাস্থ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। কারণ স্বাস্থ্য জীবনের এমন এক উপাদান, যা মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। সেটা যদি সর্বজনীন না হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাবে স্বাস্থ্যের ঠিকানা।
স্বাস্থ্যকে দেখতে হবে সামগ্রিকভাবে। শুধু চিকিৎসাই স্বাস্থ্য নয়। চিকিৎসা হচ্ছে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রতি যদি জোর না দিই তবে রোগীর সংখ্যা কমাতে পারব না। স্বাস্থ্যের মূল কাজ হবে মানুষকে সুস্থ রাখা, তার শরীর ও মনকে ভালো রাখা, জনপদকে স্বাস্থ্যকর রাখা। তাহলেই একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গড়ে তুলতে পারব। স্বাস্থ্যবান জাতি একটি দেশের উন্নতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
রোগপ্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, চিকিৎসা (নিদানিক) ছাড়াও স্বাস্থ্যের অন্যান্য উপাদান হচ্ছে স্বাস্থ্য পুনর্বাসন ও রোগযন্ত্রণা উপশম (যেমন- ক্যানসার রোগীদের যত্ন)। সব উপাদান মিলিয়েই একটি দেশের স্বাস্থ্যমান নির্ধারিত হয়।
স্বাধীনতার পরে এ দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের বেশ অগ্রগতি হয়েছে। স্বাধীনতার পর চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষকে অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা থেকে বাঁচিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসামুখী করা ও হাতের নাগালে তার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। মানুষ এখন প্রায় সবাই আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসায় অভ্যস্ত। এখনকার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশের সব মানুষের সুস্বাস্থ্য অর্জন ও তা রক্ষা করা। প্রাপ্যতা (অধিগম্যতা ও সহজলভ্যতা উভয় অর্থে) তা সর্বজনীনভাবে অর্জিত হয়নি। হাসপাতালে পৌঁছানোর সমস্যা এখন অতটা না থাকলেও টাকার অভাবে দরিদ্র ও কম আয়ের মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অথবা টাকার জোগার করতে গিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে শহর-নগরের বস্তিতে ঠাঁই নিচ্ছে। চিকিৎসার ব্যবস্থা অর্থের বিনিময়ে হওয়ার কারণে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ সুস্বাস্থ্য অর্জন তো দূরের কথা, অসুস্থ হলে প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা পর্যন্ত পাচ্ছে না। চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রেই সর্বজনীন ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য এসব সেবা সব মানুষের জন্য বিনামূল্যে দিতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তা বাস্তবায়নের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা করে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে কমপক্ষে আটটি সেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে- স্বাস্থ্যশিক্ষা, যথাযথ পুষ্টি উন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও মৌলিক পয়োনিষ্কাশন, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রধান প্রধান সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে টিকা, স্থানিক রোগব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (যেমন- ডায়রিয়া), সাধারণ রোগব্যাধি ও আঘাতের যথাযথ চিকিৎসা এবং অত্যাবশ্যক ওষুধ সরবরাহ।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চারটি মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে। এগুলো হচ্ছে- স্বাস্থ্যসেবার সমতাভিত্তিক প্রাপ্যতা (ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে), জনগণের অংশগ্রহণ, লাগসই প্রযুক্তি ও বহু খাতের সমন্বয়। জনগণের অংশগ্রহণের একটি উদাহরণ হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা। একে আরও সুদৃঢ় ও কার্যকর করতে হবে ও গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তা সম্প্রসারিত করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন করেছিল, যারা একটি বিস্তৃত সুপারিশ প্রণয়ন করেছেন। আগামী সরকার স্বাস্থ্য খাত সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণে এ কমিশনের প্রতিবেদন থেকে অনেক উপাদান পাবে।
রোগপ্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, সীমিত প্রতিকার (প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যা সম্ভব) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন কতগুলো কার্যক্রমের প্রস্তাব করেছে, যা বিবেচনার দাবি রাখে। সেগুলো হচ্ছে- (১) টিকা ও ওষুধ সংগ্রহের আগে কার্যকারিতা পরীক্ষা; (২) জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নীতি ও নিশ্চয়তা; (৩) বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ঝুঁকিতে থাকা গর্ভবতী নারীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফ্টওয়্যার-ভিত্তিক সহায়তা; (৪) ইপিআই কার্ড প্রদর্শনের ভিত্তিতে স্কুলে ভর্তি; (৫) শিশুর স্নায়বিক গড়ন বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ; (৬) প্রতিষ্ঠানে, দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে, অপেক্ষাকেন্দ্রে এবং জনগণের সমাগম স্থানে স্যানিটারি প্যাড ও প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ততা; (৭) দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার; (৮) গর্ভাবস্থায় ও নবজাতকের বিপজ্জনক লক্ষণ, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের জটিলতা, মানসিক রোগ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ সমস্যা, অপুষ্টি এবং রোগের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রান্তিক কর্মীদের সক্ষমতা; (৯) বেসরকারি এবং জনসমাজভিত্তিক সংগঠন ও জনসমাজের প্রভাবশালীদের সহায়তা গ্রহণ; (১০) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের নেতৃত্বে যৌন নির্যাতনের শিকার মানুষের পরীক্ষা; (১১) প্রান্তিক কর্মীদের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিবন্ধী শিশু এবং পিতা-মাতার সাহায্য; (১২) কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ বিক্রি; (১৩) সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জীবন রক্ষাকারী পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ; (১৪) শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল; (১৫) সব প্রতিষ্ঠানে ডে কেয়ার সেবা; (১৬) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পুলিশ বিভাগ এবং কারাগারে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের কর্মসূচি; (১৭) বিদ্যালয়ে উদ্ভাবনী স্বাস্থ্য কার্যক্রম; (১৮) মহামারি, স্থানীয় সরকার আইন ও দ্য ফুড সেফটি আইনের পর্যালোচনা; (১৯) দেশব্যাপী রোগের নজরদারির জন্য আইইডিসিআর-কে শক্তিশালীকরণ; (২০) বার্ধক্য ও পুনর্বাসন পরিষেবা, বয়স্ক, অপুষ্ট শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য পুষ্টিভাতা; (২১) দুর্যোগে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা; (২২) তথ্য, মূল্যায়ন, জরিপ, গবেষণা; (২৩) জেন্ডার-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, দরিদ্র ও সমাজবান্ধব সেবা সম্পর্কিত নীতি গ্রহণ; (২৪) মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জন্য সমন্বিত ও মডিউলার আকারে প্রশিক্ষণ; (২৫) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শক্তিশালী পরীক্ষাগার; (২৬) তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম।
এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ২৫টির মধ্যে চারটি বিষয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ (এখন আগামী সংসদেই আইন প্রণয়ন করা যাবে), অন্যান্য প্রস্তাবনার জন্য প্রস্তাবিত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হবে। এসব কার্যক্রম নতুন সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করা প্রয়োজন। না হলে এগুলোর অগ্রাধিকার হারিয়ে যাবে। এজন্য জাতীয় সংসদে বিরোধী দল ও জাতীয় সংসদের বাইরে নাগরিক সমাজ এবং অধিকার আদায়ের সংগঠনগুলোর অব্যাহত চাপ বজায় রাখা দরকার হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় সময় কর্মসূচির সঙ্গে একমত পোষণ করলেও ক্ষমতাসীন হলে যখন বাজেট বরাদ্দের প্রশ্ন আসে তখন তারা গতানুগতিকতার বাইরে যেতে চায় না। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। স্বাধীনতার পরে তুলনামূলক ও আনুপাতিক হারে স্বাস্থ্যের বাজেট এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর। কাজেই শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, নির্দিষ্ট করে বলতে হবে প্রতি বছর বাজেট বাড়াতে হবে জিডিপির ১ শতাংশ হারে। জিডিপির ৫ শতাংশ বাজেটে বরাদ্দ না হলে ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্তর্ভুক্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়ন করা যাবে না।
আশা করি, নতুন বছরে নতুন জাতীয় সংসদ ও নতুন সরকার এ দেশের সব মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। আমরা একটি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী প্রজন্ম দেখে যেতে পারব।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ