ঢাকা ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, রোববার, ২৬ মে ২০২৪

হাইটেক পার্ক প্রকল্প: মেয়াদ বাড়ছে তিন বছর, খরচ বাড়ল ১২৭ শতাংশ

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৪, ১২:০৭ পিএম
হাইটেক পার্ক প্রকল্প: মেয়াদ বাড়ছে তিন বছর, খরচ বাড়ল ১২৭ শতাংশ
তিনবার মেয়াদ বাড়ার পরও শেষ হয়নি হাইটেক পার্ক প্রকল্পের কাজ। এতে করে খরচ বাড়ছে প্রকল্পের। ছবি: সংগৃহীত

দফায় দফায় প্রকল্পের সময় বাড়িয়েও দেশে হাইটেক পার্ক নির্মাণে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত সাত বছরে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশ। এখনো শুরু হয়নি চট্টগ্রাম হাইটেক পার্ক নির্মাণকাজ। এক শতাংশও অগ্রগতি হয়নি কুমিল্লা, কক্সবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রাম নলেজ পার্কের। প্রকল্পটি সংশোধন করে বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খাতে খরচ বাড়ানো হয়েছে। বৈদেশিক প্রশিক্ষণ দ্বিগুণ করা হয়েছে। পরামর্শক ফি চার গুণ বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। এবার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে তিন বছর। সঙ্গে খরচ বাড়ছে ১২৭ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষার খসড়া প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দেশে প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জনে হাইটেক পার্ক নির্মাণে গুরুত্ব দিয়ে সরকার ২০১৭ সালে ‘জেলা পর্যায়ে আইটি/হাইটেক পার্ক স্থাপন (১২ জেলায়)’ নামে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে বারবার সময় বাড়িয়েও সঠিকভাবে হয়নি কাজ। এতে অর্থের অপচয় হয়েছে। মানুষ প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ সরকারি প্রায় সব প্রকল্পে বিভিন্ন অজুহাতে সময় বাড়ছে। অর্থের অপচয় হচ্ছে। প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে না জনগণ। এই প্রকল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। শেষ সময়েও কাজ হচ্ছে না। খরচ বাড়ছে বহুগুণ।’

২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে চারজন দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১৫ মে থেকে এ কে এ এম ফজলুল হক (উপসচিব) দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পের ধীরগতির ব্যাপারে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০১৭ সালে প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রথম চার বছরে তিনজন পিডি দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন কারণে তেমন কোনো কাজ হয়নি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্যাকেজ ডব্লিউডির আওতায় রংপুর, নাটোর, ময়মনসিংহ ও জামালপুর এবং ডব্লিউডি-বির আওতায় ঢাকা, গোপালপুর, খুলনা ও বরিশাল হাইটেক পার্ক নির্মাণে এলওসি ঋণের শর্ত অনুযায়ী ভারতের এলএনটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়। এরপর তারা সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু করে। প্রকল্পের মেয়াদ জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এটা সত্য। গত এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৮ শতাংশ। বাকি কাজ এই সময়ে হবে না।

দ্বিতীয়বার সংশোধন করে তিন বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুনে সমাপ্ত করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। আশা করি, এই সময়ের মধ্যে সব কাজ হয়ে যাবে। সময় বৃদ্ধির কারণে বেতন-ভাতা বাড়ছে। রেট শিডিউলও ২০১৮ থেকে ২০২২ সালে পরিবর্তন হচ্ছে। এ কারণে খরচ বাড়ছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আনতে বন্দরে আমদানি শুল্ক (সিডি) বাবদ খরচ বাড়ছে ১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ৫৫ কোটি ডলার বা ৬০৫ কোটি টাকা খরচ বাড়ছে। মোট খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে ৪ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতের ঋণ ২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা ও দেশীয় অর্থ ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ৩৫১ কোটি ৭১ লাখ। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেও ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট তিন বছর মেয়াদ বাড়ানোর সম্মতি দিয়েছে।’ 

অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘প্যাকেজ ডব্লিউডি-সির আওতায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা ও সিলেট- এই চারটি হাইটেক পার্ক নির্মাণের অগ্রগতি একটু কম হবে। কারণ অল্প কয়েক মাস আগে ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আর চট্টগ্রামের মেয়র এখনো জায়গা বুঝিয়ে দেননি। কুমিল্লার আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে দশমিক ৫২ শতাংশ, চট্টগ্রামের দশমিক ৪৬ শতাংশ, কক্সবাজারের দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ও সিলেটের অগ্রগতি হয়েছে দশমিক ৪৭ শতাংশ। 

পরামর্শককে অতিরিক্ত ফি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি হওয়ার পরে তা নিষ্পত্তিযোগ্য বলে অডিট আপত্তিতে বিবেচনা করা হয়েছে। পাজেরো জিপ গাড়ি অন্য কাজে ব্যবহারের ব্যাপারে পিডি বলেন, ‘হাইটেক পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাড়ি না পাওয়ায় প্রকল্পের এই গাড়িটি ব্যবহার করতেন। পরে আমাকে ব্যবহার করার সুযোগ দেন।’ 

বাংলাদেশের আইটি শিল্পের উন্নয়ন ও আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য সরকার ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। এ প্রকল্পের জন্য প্যাকেজ ডব্লিউডি-এ এবং প্যাকেজ ডব্লিউডি-বির আওতায় ৭ তলা স্টিল স্ট্রাকচার ভবন নির্মাণ এবং প্যাকেজ ডব্লিউ-সির আওতায় ৫তলা স্টিল স্ট্রাকচার ভবন নির্মাণের জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতের ঋণ ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা ও জিওবি ২৫২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনে অর্থাৎ তিন বছরে বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। 

অন্যান্য প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পেও একই দশা হয়েছে। বাধ্য হয়ে খরচ ছাড়া এক বছর সময় বাড়ানো হয়। তারপরও কাজের কাজ হয়নি। ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংশোধন করে সময় বাড়ানো হয় তিন বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুনে শেষ করার জন্য সরকার সময় বেঁধে দেয়। একই সঙ্গে ৫০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩ শতাংশ খরচ বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্প পরিচালক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বেতন ও ভাতা বাড়ানো হয়েছে। বৈদেশিক প্রশিক্ষণও দ্বিগুণ করা হয়েছে। পরামর্শক ফি চার গুণ বাড়ানো হয়েছে। যানবাহনের খরচও বাড়ানো হয়েছে। ১ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ১ হাজার ও জাপানে ৫০ জন। আরও প্রায় ৭ হাজার জনকে প্রশিক্ষণের সংস্থান রাখা হয়েছে। 

প্রকল্প সূত্র মতে, এপ্রিল পর্যন্ত রংপুরের ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া নলেজ পার্কের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ, নাটোর নলেজ পার্কের ২৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ময়মনসিংহ নলেজ পার্কের ২৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ, জামালপুরের ২৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, খুলনার ২৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ, বরিশাল নলেজ পার্কের ২০ শতাংশ, গোপালগঞ্জ নলেজ পার্কের ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ঢাকার কেরানীগঞ্জের ২৫ শতাংশ, সিলেটের ৪ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার কুমিল্লা নলেজ পার্কের অগ্রগতি এক শতাংশও হয়নি। আগামী জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এখনো খুলনা নলেজ পার্কের জন্য প্রায় ৪ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের অফিসে প্রক্রিয়াধীন। চট্রগ্রাম নলেজ পার্ক নির্মাণে ৯ দশমিক ৫৫ একর জমি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এখনো বুঝিয়ে দেয়নি। 

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে করতে ও উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধানে তিন মাস পর পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা। দীর্ঘ এই সময়ে ২৪টি হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ১৫ পিআইসি ও ১৩টি পিএসসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভা নিয়মিত হলে বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যেত। 

এই প্রকল্পের কাজ করতে বিভিন্ন সময় অর্থের লেনদেন করতে কিছু ভুলত্রুটি ধরা পড়ে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। তার মধ্যে পাজারো জিপ গাড়ি প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না বলেও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরামর্শককে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে। সেই অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি। 

প্রতিবেদনে প্রকল্পের দুর্বল দিকের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের সহায়তা পুরোপুরি পাওয়া যায় না। এ জন্য জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। করোনাকালে ১৭ মাস কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ভ্যাট খাতে অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দের ফলে নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের প্যাকেজ ডব্লিউডি-সির আওতায় কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট নলেজ পার্ক বাস্তবায়নে ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সেখানে মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩০ মাস বা আড়াই বছর। তাই পুরো কাজ শেষ করতে সময় লাগবে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। 

মে মাসেই বেশি ঘূর্ণিঝড়, সাগরে সূর্যের উপস্থিতিই কারণ

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:৫৭ পিএম
মে মাসেই বেশি ঘূর্ণিঝড়, সাগরে সূর্যের উপস্থিতিই কারণ
ছবি : সংগৃহীত

৬৪ বছরে উল্লেখযোগ্য ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে সর্বাধিক ১৫টি হয়েছে মে মাসে। বর্ষা শুরুর আগে বঙ্গোপসাগরে সূর্যের খাড়াভাবে উপস্থিতির কারণে এই ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৫৭ বছরে ৩৩টি উল্লেখযোগ্য ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি হয়েছে মে মাসে। এই সময়ের পরে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মে মাসে আরও দুটি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। 

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, বর্ষাকালে বাংলাদেশের ওপরে সূর্য থাকে খাড়াভাবে। বর্ষার আগে এটি বঙ্গোপসাগরে থাকে। বর্ষা শেষ হয়ে গেলেও এটি বঙ্গোপসাগরে থাকে একইভাবে। এটিই আসল কারণ। সূর্যের উপস্থিতির কারণে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি। শীতকালে জানুয়ারি মাসে সূর্য থাকে দক্ষিণ গোলার্ধে। উত্তর গোলার্ধে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে বাংলাদেশে যখন আসে তখন বর্ষা শুরু হয়।

তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালের ৯ মে ও ৩০ মে দুটি ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে। ১৯৬৫ সালের ১১ মে চট্টগ্রাম ও বরিশালের উপকূলে, ১৯৮৫ সালের ২৪ মে চট্টগ্রামে, ১৯৯৪ সালের ২ মে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে, ১৯৯৭ সালের ১৯ মে সীতাকুণ্ডে, ১৯৯৮ সালের ২০ মে চট্টগ্রাম উপকূলে, ২০০৪ সালের ১৯ মে টেকনাফে, ২০০৯ সালের ৫ মে, (আইলা) পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলে, ২০১৩ সালের ১৬ মে (মহাসেন) নোয়াখালী-চট্টগ্রাম উপকূলে, ২০১৬ সালের ২১ মে (রোয়ানু) বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলে, ২০১৭ সালের ৩০ মে (মোরা) চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাতাসের গতিবেগ ছিল (১৯৯৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ে) ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার। এ ছাড়া ২০২০ সালের ২০ মে আম্ফান এবং ২০২৩ সালের ১৫ মে ঘূর্ণিঝড় মোখা আঘাত হানে।

আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টির জন্য দুটি সময় হলো বর্ষা শুরুর আগে এবং অন্যটি বর্ষা বিদায় নেওয়ার সময়। এ সময়ে সাগরের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্ষা সেট হওয়ার সময়টা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার জন্য সহায়ক। এ সময় তাপমাত্রা বেশি থাকে। এ কারণে মে মাসে ঘূর্ণিঝড় বেশি হয়।’

মন্ত্রী-এমপিদের নিরাপত্তা জোরদার!

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১০:৪৫ এএম
মন্ত্রী-এমপিদের নিরাপত্তা জোরদার!

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এমপি-মন্ত্রীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক নজর রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিষয়টি পুরোপুরি স্বীকার না করলেও পুলিশ কর্মকর্তারা এমন তথ্য জানিয়েছেন খবরের কাগজকে।

শনিবার (২৫ মে) খবরের কাগজকে এসব তথ্য জানান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা। তবে ক্ষমতাসীন দলের এমপি-মন্ত্রীরা বলছেন, আপাতত এমন কোনো তথ্য নেই। 

সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে ঢাকা-১২ আসনের এমপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘মন্ত্রী ও এমপিদের নিরাপত্তা কেন বাড়াতে হবে? দেশে এমন কী ঘটনা ঘটেছে? আমাদের বর্ডার এলাকায় যেসব এমপি রয়েছেন, তাদের আমরা সিকিউরিটি দিয়ে থাকি।’ 

তবে এ বিষয়ে ভোলা-৩ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিরাপত্তা আমাদের বাড়ানো হয়েছে কি না, এমন কোনো বার্তাও দেওয়া হয়নি। আগামী ৫ জুন পার্লামেন্টে গেলে বোঝা যাবে। কোনো বার্তা এলে সেদিন বোঝা যাবে।’

পুলিশ জানায়, এমপি আনার হত্যার পর থেকে মন্ত্রিপাড়া, এমপি হোস্টেল ও তাদের নিজ বাসভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের চলতি দায়িত্বে অতিরিক্ত আইজিপি (অপারেশন) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ সব সময় সতর্ক আছে। আর প্রত্যেক পুলিশকে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে ডিউটি করার জন্য। যাতে ডিউটি অবস্থায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে। তবে ঢাকা বা সারা দেশে অফিশিয়ালি এমপি-মন্ত্রীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিয়ষটি নিয়ে কোনো আদেশ বা তথ্য আসেনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ মহিদ উদ্দিন নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যখন মনে করি যে মাননীয় সংসদ সদস্য যারা আছেন তাদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে, ঠিক তখনই তাদের নিরাপত্তা বাড়িয়ে থাকি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি তাদের ক্ষেত্রে একটু আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা উচিত। ঢাকাতে, এমপি বা মন্ত্রিপাড়া যেখানে আছে, সেখানে আমাদের একটু বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং থাকবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’

চিকিৎসার জন্য চলতি মাসের ১২ মে ভারতে যান ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। এর কয়েক দিন পর কলকাতার নিউ টাউনের বিলাসবহুল আবাসন ‘সঞ্জিবা গার্ডেনস’ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। তার এই মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এটিকে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এমপি আনার হত্যার ঘটনায় তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। হত্যার কারণ জানতে বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ তদন্ত করছে। হত্যার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার তানভীর, শিমুল ভূঁইয়া ও শিলাস্তি রহমানের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এমপি আনারের সম্পদের পরিমাণ আসলে কত?

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১০:১৮ এএম
এমপি আনারের সম্পদের পরিমাণ আসলে কত?
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় এমপি আনারের বসতবাড়ি

কলকাতায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীমের চলাফেরায় চাকচিক্য ছিল না। এলাকাবাসী তাকে সাদাসিধা মানুষ হিসেবেই জানতেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তিনবারের এই এমপির সম্পদ কত তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। 

তার নির্বাচনি এলাকার (ঝিনাইদহ-৪) জনগণের মধ্যেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা। তবে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া সর্বশেষ হলফনামা থেকে এমপি আনারের  ‘নগদ টাকার’ পরিমাণ ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৮১৮ টাকা বলে জানা যায়।

আমাদের যশোর প্রতিনিধি জানান, নানা ধরনের চোরাচালানসহ নানা ব্যবসার কথা আলোচিত হলেও বাস্তবে তার সম্পদ দৃশ্যমান নয়। বিলাসবহুল বাড়ি বা দামি গাড়ি তার ছিল না। তার  পোশাক-পরিচ্ছদেও বড়লোকির  ছাপ ছিল না। তাকে দামি পোশাকে কখনোই দেখা যায়নি। তিনি চলাফেরা করতেন অতি সাধারণভাবে। 

তবে তিনি তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও রাজনৈতিক অনুসারীদের নামে সম্পদ গড়েছেন বলে আলোচনা রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, কলকাতায় ভারতীয় এক বন্ধুর নামে এমপি আনারের একটি তিন তলা বাড়ি রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, সম্পদ গড়ার থেকে এমপি আনার নগদ টাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তবে কী ধরনের ব্যবসা করতেন তা তারা বলতে পারেননি।

ঝিনাইদহ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, এমপি আনারের বড় ধরনের কোনো সম্পদের কথা ঝিনাইদহবাসী জানে না। তার সম্পদ থাকলেও সে বিষয়ে আমাদের কাছে খবর নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের রাজনীতি করলেও তার চলাফেরায় কখনো আড়ম্বরতা দেখিনি। তিনি সব সময় মোটরসাইকেলে চলাফেরা করতেন। ঢাকায় বা অন্য কোথাও তার বাড়ি গাড়ি থাকার কথা শুনিনি। 

সর্বশেষ হলফনামা অনুসারে ১০ বছরে সম্পদ বেড়েছে ২২২৬৪ শতাংশ
সর্বশেষ ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় এমপি আনার উল্লেখ করেন, ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থের পরিমাণ’ ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। আর ১০ বছর আগে ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর প্রথমবার এমপি হওয়ার আগে দাখিল করা হলফনামায় তার ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ’- এর ঘরে লেখা আছে ‘নাই’। মাঝে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হওয়ার আগে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জমা দেওয়া হলফনামায় এই ঘরে উল্লেখ করেছেন ৪ লাখ টাকা। আর তৃতীয় বারে অর্থাৎ শেষবারে তা কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া এই হলফনামায় ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থের পরিমাণ’-এর ঘরে তার স্ত্রীর ১৯ লাখ ৯২ হাজার ১১৯ টাকা আছে, উল্লেখ করেছেন এমপি আনার। তবে, ২০১৩ সালের হলফনামাতে তার স্ত্রীর ১৬ লাখ টাকার উল্লেখ করা আছে। কিন্তু দ্বিতীয় হলফনামায় তার স্ত্রীর কোনো টাকা নেই বলে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ হলফনামা অনুসারে, এমপি আনারের অস্থাবর সম্পদ ‘নগদ টাকার’ পরিমাণ ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৮১৮ টাকা। ২০১৮ সালে জমা দেওয়া হলফনামায়, যা ১ কোটি ৭৪ লাখ ২৮ হাজার ৩৭৪ টাকা। আর ২০১৩ সালের হলফনামায় তা ছিল মাত্র ৬২ হাজার ৫৮০ টাকা। অর্থাৎ সর্বশেষ হলফনামা অনুসারে ১০ বছরের ব্যবধানে তা ২২২৬৪ শতাংশ বেড়েছে। তার স্ত্রীর নগদ টাকাও সাড়ে ৯৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রথম পাঁচ বছরে হয়েছিল ৪৯ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ টাকা। শতাংশের হিসাবে যা বেড়েছিল ৫০৮৯ শতাংশ। সর্বশেষ হলফনামা অনুসারে তার স্ত্রীর নগদ টাকার পরিমাণ ২০ লাখ ১০ হাজার।

টানা তিনবারের এমপি জীবনে আনারের কৃষি এবং অকৃষি জমি উভয়ই বেড়ে কমবেশি দ্বিগুণ হয়েছে। সর্বশেষ হলফনামায় তিনি নিজের কৃষি জমির পরিমাণ উল্লেখ করেছেন ৩৩ বিঘা, ২০১৮ সালের হলফনামায় যা ছিল ২৬ বিঘা এবং ২০১৩ সালে ছিল মাত্র ১০ বিঘা। ২০২৩ সালের হলফনামায় তার স্ত্রীর নামে কৃষি জমি আছে সাড়ে ২৪ শতক। তবে আগের দুটি হলফনামায় তার স্ত্রীর নামে কোনো কৃষি জমি নেই।

২০২৩ সালের হলফনামায় এমপি আনারের অকৃষি জমির উল্লেখ করা হয়েছে পৈতৃক সূত্রেসহ ১২৯.৩৪ শতক। ২০১৮ সালে দাখিল করা হলফনামায় যা ছিল পৈতৃক সূত্রেসহ ৭৪.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ শেষের ৫ বছরে তার অকৃষি জমি বেড়েছে ৫৫ শতক। ২০১৩ সালে তার অকৃষি জমি ছিল সাড়ে ৫৯ শতক।

আর কৃষি জমির মতো অকৃষি জমিও তার স্ত্রীর নামে প্রথম দুই হলফনামায় না থাকলেও তৃতীয় বা শেষ হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে ১৭৯.০২ শতক, যা সংসদ সদস্যের নিজের অকৃষি জমির পরিমাণের চেয়েও বেশি।

সর্বশেষ দাখিল করা হলফনামায় তার নিজের নামে একটি টয়োটা জিপ গাড়ির উল্লেখ করেছেন। যার মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৯৩ লাখ টাকা। আর তার স্ত্রীর নামে উল্লেখ করেছেন ৪টি ট্রাক, যার মূল্য উল্লেখ করেছেন ৪৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তবে, ২০১৩ সালের হলফনামায় এ-সংক্রান্ত ঘরে উভয়ের নামে লেখা আছে ‘নাই’। 

গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া সর্বশেষ হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ (পাস)। বার্ষিক আয়ের উৎসে তিনি উল্লেখ করেছেন, কৃষি খাত থেকে তার আয় ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে প্রার্থী এবং ‘প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীলদের আয়’ যথাক্রমে ১৩ লাখ ১৯ হাজার ৬৪৮ এবং ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৩ টাকা। সংসদ সদস্য হিসেবে পারিতোষিক ও ভাতাদি ২৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭০ টাকা।

এমপি আনারের দায়দেনাও বেড়েছে এই ১০ বছরে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে দাখিল করা হলফনামা অনুসারে তার দায়দেনা জনতা ব্যাংক কালীগঞ্জ শাখায় ১ কোটি ১৭ লাখ ২৩ হাজার ১১১ টাকা, ২০১৩ সালের হলফনামায় যা ওই ব্যাংকের একই শাখার কাছে ছিল ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪৭ টাকার দায়। 

দৃশ্যমান নয় হাজার কোটি টাকার সম্পদ
যশোর প্রতিনিধি জানান, এমপি আনারের নির্বাচনি এলাকা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  জানিয়েছেন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় এমপি আনারের ও আত্মীয়স্বজনের নামে প্রায় ২০০ বিঘা জমি রয়েছে। এখানে একটি নতুন বন্দর চালু হতে পারে, সে কারণে তিনি জমি কিনেছেন। প্রায় ২০ বছর আগে  তার নামে এই এলাকায় কিছু জমি কেনা ছিল। গত ৫-৭ বছরে আরও  জমি কেনা হয়েছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, কালীগঞ্জের বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রীলক্ষ্মী সিনেমা হলসহ প্রায় ১২ কোটি টাকার ১ বিঘা জমি কেনা আছে। যেখানে বর্তমানে ১০ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আয়েশা তেল পাম্পের পাশে ২ কোটি টাকার ১০ শতক জমি রয়েছে তার।

এ ছাড়া মাহাতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ রোড, কালীগঞ্জের বাসস্ট্যান্ডের কোটচাঁদপুর রোডে ও কালীগঞ্জ বাজারের মুরগিহাটার পাশে প্রায় ৭ কোটি টাকার জমি রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। তবে এসব সম্পদ তার স্ত্রী-কন্যাদের নামে নেই। আছে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও রাজনৈতিক আস্থাভাজন অনুসারীদের নামে। এর মধ্যে তার ভাগ্নে, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন জনপ্রতিনিধির নামে সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। অবশ্য যাদের নাম পাওয়া গেছে, তারা গত ৫-৭ বছরের মধ্যে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

ছাত্রলীগের আশ্রয়ে সক্রিয় কিশোর গ্যাং

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ০৯:৩১ এএম
ছাত্রলীগের আশ্রয়ে সক্রিয় কিশোর গ্যাং

রাজধানীর উত্তরায় ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছিল স্কুলছাত্র আদনান কবির (১২)। সে সময়ে এই কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরতে মরিয়া হয়ে ওঠে। র‌্যাব এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’-এর আটজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা সবাই এখন জামিনে। 

এই দুই কিশোর গ্যাং আবারও ফিরেছে সেই ভয়ংকর চেহারায়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর এই গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে আদনানের পরিবারকে। এ ঘটনায় সম্প্রতি উত্তরা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে আদনানের পরিবার। 

আলোচিত চাঞ্চল্যকর সেই ঘটনার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার পায়নি আদনানের পরিবার। উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এতটুকুও কমেনি, বরং বেড়েছে। সেখানে কিশোর গ্যাং কালচার দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, যৌন হয়রানি, মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা।

আগে তারা ফেসবুক পেজ খুলে গ্রুপের কার্যক্রম চালালেও এখন অনেক সতর্ক। এখন তারা হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, সিগন্যালসহ বিভিন্ন অ্যাপসে গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা ও দল ভারী করছে। প্রতিনিয়ত গ্রুপে তারা সদস্য বাড়াচ্ছে। উত্তরার ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’-এর আগেকার ফেসবুকের একাধিক ছবি ও কিছু নথি খবরের কাগজের কাছে এসে পৌঁছেছে। 

নিহত আদনান ‘নাইন স্টার গ্রুপের’ সদস‌্য ছিল বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি। হত্যাকাণ্ডের পর আদনানের বাবা মো. কবির হোসেন উত্তরা পশ্চিম থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিদের সবার বয়স ১৬ থেকে ২২ বছরের মধ‌্যে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ২০২২ সালের শেষের দিকের একটি প্রতিবেদন বলেছে, তাদের উত্তরা বিভাগে সক্রিয় রয়েছে ১১টি কিশোর গ্যাং। এ ছাড়া ২০২৩ সালে কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বে ২৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। 

র‌্যাব এবং পুলিশের তালিকায় উত্তরা এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের বেশকিছু নাম উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম থানা এলাকায় ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, নাইন এমএম বয়েজ গ্রুপ, বিগবস, পাওয়ার বয়েজ গ্রুপ এবং মাহবুব গ্রুপ। তুরাগ এলাকায় সক্রিয় নিউ নাইন স্টার ও তালাচাবি গ্রুপ, দক্ষিণখান এলাকায় শান্ত গ্রুপ, ইয়াং স্টার ও ডিজে গ্রুপ। টঙ্গী এলাকায় বিগবস এমটি গ্রুপ, থ্রি স্টার গ্রুপ, ট্রিপল এক্স গ্রুপ, নাইট কিং ও সুপার ম্যাক্স গ্রুপ সক্রিয়।

পুলিশ ওই হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে। আদালতে এখন বিচারকাজ চলছে। নিহত আদনানের বাবা কবির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আদনান হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিল মোট ২৬ আসামি। তারা সবাই এখন জামিনে। আসামিরা কারাগার থেকে বেরিয়ে হত্যার হুমকি দিচ্ছে।’ ‘আমি আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে একাধিকবার সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকেও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও কোনো সহায়তা করেননি। ছেলে হত্যার বিচার এখনো পাইনি।’ 

উত্তরায় ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’ ফের সক্রিয়

যারা আদনানকে হত্যা করেছে, তারা এখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করছে, আরও বেপরোয়া হয়েছে। আদনান হত্যায় জড়িত ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’ আবারও সক্রিয়। জামিন পাওয়ার পর থেকে নতুন পুরোনো মিলে এই দুই গ্রুপে এখন সদস্য রয়েছে শতাধিক। আগে ছিল নাফিজ মো. আলম ওরফে ডন, নাঈমুর রহমান অনিক, সাদাফ জাকির, রায়হান আহমেদ সেতু, রবিউল ইসলাম, মো. আখতারুজ্জামান ছোটন, আহমেদ জিয়ান, খন্দকার শুভ ও নাজমুস সাকিব। এদের সবাই আদনান হত্যার এজাহারভুক্ত আসামি। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে রুবেল হোসেন জয়, শাকিল মিয়া, মামুন ওরুফে পিচ্চি মামুন, আজিজুল বেগ লিমন, নওরোজ নূর সাকিব, শাহরিয়ার পারভেজ, তালাচাবি রাজু, পাপ্পু। এদের প্রত্যেকের বয়স ১৪ থেকে ২২ বছর। 

২০১৬ সালে ‘নাইন স্টার গ্রুপের’ নেতা ‘তালাচাবি রাজু’কে ছুরিকাহত করেছিল ‘ডিসকো গ্রুপের’ সদস্যরা। তারপর থেকে তাদের দ্বন্দ্ব চলছিল। আদনান হত‌্যাকাণ্ডের আসামি নাফিজ আগের ঘটনায় অর্থাৎ রাজুর ওপর হামলার মামলায়ও আসামি।

পুলিশ জানায়, উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিলুজ্জামান বিপুলের পশ্চিম থানা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে দুটি গ্রুপ। একটি কুখ্যাত নাইন স্টার গ্রুপ। যে গ্রুপের হাতে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। নাইন স্টার গ্রুপের সদস্য সংখ্যা অর্ধশতাধিক। ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় সক্রিয় নাইন স্টার গ্রুপের লিডারের নাম রুবেল হোসেন ওরফে জয়। রংপুরের ছেলে জয়ের বাবার নাম বাবুল। তাদের পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিলুজ্জামান বিপুল। জয় উত্তরা ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। জয় আগে বিএনপির কর্মী ছিলেন। পরে উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিলুজ্জামান বিপুলের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। পরে বিপুলকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে উত্তরা ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন। জয়ের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। 

‘ডিসকো বয়েজ’ গ্রুপ লিডারের নাম ইমরান হোসেন রাজু ওরফে তালাচাবি রাজু। তার বাবার নাম জামাল উদ্দিন। ঠিকানা তুরাগের পাকুরিয়া। বর্তমানে তিনি খিলক্ষেত এলাকায় বসবাস করছেন। তুরাগ এবং উত্তরা পশ্চিম থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তার সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম মেহেদী হাসান ওরফে শিশির। উত্তরা ১২, ১৩ এবং ১৪ নম্বর সেক্টর নাইন স্টার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।

এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিলুজ্জামান বিপুল খবরের কাগজকে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে ‘নাইন স্টার গ্রুপ’ ফের সক্রিয় বলে যে অভিযোগ রয়েছে, তা মোটেও সত্য নয়। এ ধরনের কোনো গ্রুপ উত্তরায় নেই।” উত্তরা ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জয় আগে থেকেই ছাত্রলীগ করত। তিন বছর আগের কমিটিতে জয় গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ছিল। নিজের যোগ্যতায়ই সে নতুন পদ পেয়েছে। জয় কখনো বিএনপি করত না। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে একটি চক্র। অনেকে দিন ছাত্রলীগ করার পরেও যারা ভালো পদ পায়নি, তারা ঈর্ষান্বিত হয়ে এসব বলছে। 

পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত কিছু রাজনৈতিক নেতার পৃষ্ঠপোষকতাই কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী। মাদক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্তৃত্ব তৈরির জন্য এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে গ্যাং তৈরি করে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেন ওই ধরনের নেতারা।

এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, শুধু উত্তরায় আদনান হত্যা নয়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অনেক সময় এদের গ্রেপ্তার করলেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যারা রয়েছে তারা গ্রেপ্তার হয় না। আগে রাজনৈতিক গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে পারলে এটি কমে আসবে। এর সঙ্গে কিশোর গ্যাং দমন করতে হলে সামাজিকভাবে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং সমাজের দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসতে হবে। 

এ বিষয়ে উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শাহজাহান খবরের কাগজকে বলেন, কিশোর গ্যাং এখনো আছে, তবে তৎপরতা আগের চেয়ে কমেছে। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আদনান হত্যায় জড়িত কিশোর গ্যাং দুটি আবারও সক্রিয় হয়েছে এমন কোনো বিষয় আমাদের জানা নেই। আবারও যদি তারা সক্রিয় হয়ে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. শাহজাহান বলেন, কিশোর গ্যাং এখনো আছে। তবে আগের তুলনায় কম। তাদের দমনে পুলিশ কাজ করছে। পুলিশ প্রতিনিয়ত ব্যবস্থা নিচ্ছে। বছরে ৪০০-৫০০ আটক হচ্ছে। মামলা হচ্ছে। সংশোধনাগারে দেওয়া হচ্ছে অনেককে। কিন্তু শিশু-কিশোরদের নিয়ে এ ধরনের কিশোর গ্যাং তারপরও বন্ধ হচ্ছে না মূলত কথিত কিছু বড় ভাই ও কিছু পলিটিক্যাল নেতার কারণে। 

২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনানকে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের খেলার মাঠে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। 

প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা হলেও ভিক্ষুক কমে না

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ০৯:১০ এএম
প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা হলেও ভিক্ষুক কমে না
রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকার সিগন্যালে ভিক্ষাবৃত্তি। ছবি: খবরের কাগজ

গুলশান ২ নম্বর চত্বরের মোড়ে যে কারোরই চোখে পড়বে ‘ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা’ সাইনবোর্ডটি। আবার ঠিক সেখানেই সিগন্যালে গাড়ি থামলেই হাত বাড়িয়ে দেন একের পর এক ভিক্ষুক। একই দৃশ্য দেখা যায় গুলশান ১ নম্বরেও। এ ছাড়া রাজধানীর বিজয় সরণি, ফার্মগেট, বাংলামোটর, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, শ্যামলী, আগারগাঁও, চন্দ্রিমা উদ্যান, সোনারগাঁও মোড়, শাহবাগসহ এমন কোথাও নেই যেখানে ভিক্ষুকের দেখা না মেলে!

রাজধানীর বিজয় সরণি সিগন্যালে ভিক্ষা করেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধা আছিয়া খাতুন। অল্প বয়সে স্বামী মারা যান। সহায়-সম্পত্তি কিছুই নেই। তিন ছেলে ছিল, কে কোথায় আছে জানা নেই তার। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন, তাদের কেউ খোঁজ রাখেন না তার। বৃদ্ধ শরীরে কাজ করার শক্তি নেই। তাই ভিক্ষা করে দিন চালান আছিয়া খাতুন। এই সিগন্যালের অন্য ভিক্ষুকদের সঙ্গেও তার ভাব তৈরি হয়েছে। প্রাইভেট গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের বিভিন্ন মানবিক ঘটনা শুনিয়ে সাহায্য চান তারা। 

ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারের উদ্যোগে চলছে বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রকল্প। রাজধানীতে বেশ কিছু এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে । আবার ভিক্ষুক ধরে তাদের নির্দিষ্ট পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে জীবনমানের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষক দেওয়া হচ্ছে, নানাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে বলে সরকারি সূত্র থেকে জানা যায়। 

এদিকে দেশে ভিক্ষুক সংখ্যা এখন কত আছে তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। যে যার মতো এই সংখ্যা ব্যবহার করে থাকে ক্ষেত্রবিশেষে। যদিও সরকারি তথ্য হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ২০২১ সালে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল মোট জনগোষ্ঠীর দশমিক ১৭ শতাংশ বা প্রায় আড়াই লাখ। তবে ভিক্ষুকদের নিয়ে কাজ করা অন্য সূত্রগুলোর দাবি বাস্তবে এখন ভিক্ষুকের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভিক্ষুক, চা-শ্রমিক ও হিজড়া) মো. শাহজাহান খবরের কাগজকে জানান, ভিক্ষুকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য এসব প্রকল্পে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা পর্যাপ্ত নয়। শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হলো জনসংখ্যার বৃদ্ধি। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসে। আরও বড় কারণ, ভিক্ষাবৃত্তিতে পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় না। শুধু হাত পাততে পারলেই হলো। তাই দিন দিন মানুষ এই পেশায় বেশি জড়িয়ে পড়ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করার জন্য বাজেট আরও বাড়ানো দরকার। 

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশকে ২০১৮ সালের মধ্যে ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। এই উদ্দেশ্যে অন্তর্ভুক্তিমুলক উন্নয়নের অংশ হিসেবে এবং একই সঙ্গে দারিদ্র্য নিরসন ও ভিক্ষাবৃত্তি পেশা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয় নানাবিধ প্রকল্প। ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করার জন্য সরকার ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান নীতিমালা-২০১৮’ প্রণয়ন করেছে। বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি করেছে। এ ছাড়া পৌরসভা কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, সিটি করপোরেশন অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, বিভাগীয় ও জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটিও রয়েছে। 

ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা: ভিক্ষাবৃত্তি রোধের জন্য প্রাথমিকভাবে সিটি করপোরেশনের কিছু এলাকা ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা হয়েছিল। এলাকাগুলো হচ্ছে বিমানবন্দরে প্রবেশপথের পূর্ব পাশের চৌরাস্তা, বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ও এর আশপাশের এলাকা, হোটেল রেডিসনসংলগ্ন এলাকা, ভিআইপি রোড, বেইলি রোড, হোটেল সোনারগাঁও, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসংলগ্ন এলাকা, রবীন্দ্র সরণি এবং কূটনৈতিক এলাকাসমূহ। এসব এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আটক ভিক্ষুকদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার নিমিত্তে গ্রহণ করা হয় বিভিন্ন পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প। এর পেছনে বাজেটের বড় একটি অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ এলাকাগুলো ভিক্ষুকমুক্ত রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত মাইকিং, বিজ্ঞাপন, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও পুরোপুরি সফল হওয়া যায়নি। বিশেষ করে বিমানবন্দর এলাকা আর সোনারগাঁও হোটেলের আশপাশেই খুঁজে পাওয়া যাবে ডজনখানেক নিয়মিত ভিক্ষুক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ভিক্ষুকদের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে একটি কারণ হলো জনসংখ্যার বৃদ্ধি। এর ফলে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ কাজ খুঁজে না পেয়ে এই পেশায় জড়াচ্ছে। তবে আরও একটি বড় কারণ হলো ভিক্ষা বাণিজ্য। এই বাণিজ্যে একটি সক্রিয় চক্র জড়িত আছে। মানুষের আবেগের সুযোগ নিয়ে ভিক্ষুকদের কাজে লাগিয়ে প্রতিদিন বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। এই চক্র বিশেষ করে পথশিশুদের টার্গেট করে তাদের বিভিন্ন উপায়ে শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ করে। তারপর এই শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে রাস্তার বিভিন্ন সিগন্যালে ভিক্ষা করতে পাঠায়। এসব শিশুকে নিয়মিত মনিটরিং করে এই চক্র। রাজধানীর মিরপুর এবং কামরাঙ্গীরচরে এই চক্র বেশি সক্রিয়। 

তিনি আরও জানান, এই সিন্ডিকেট মানুষের মানবিকতার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এই সিন্ডিকেট প্রতিদিন ভিক্ষুকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরমাণ চাঁদা আদায় করে। এমনকি ভিক্ষুকদের ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং করা হয়। এর কারণ, একই জায়গায় ভিক্ষা করলে ওই এলাকা থেকে বেশি দিন সহমর্মিতা পাওয়া যায় না। 

এর প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. তৌহিদুল হক জানান, প্রান্তিক পর্যায়ে শারীরিকভাবে অক্ষম যেসব মানুষ রয়েছে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং পুঁজি দিয়ে উপার্জন করার মতো কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আর যেসব কর্মক্ষম মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত, তাদের জন্য আইনের প্রয়োগ করতে হবে। তাদের আইনের সহায়তায় আটক করা শুরু করলে মানুষের মধ্যে একধরনের আইনের ভয় কাজ করবে। আর এসব সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। 

ভিক্ষুক ধরা অভিযান: সরকারি তথ্যানুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৭টি জেলায় অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আটক ভিক্ষুকদের আশ্রয়ের জন্য ১৬টি ডরমিটরি নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ ছিল। একই বছর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ২ হাজার ৬০০ জন ভিক্ষুককে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৮০৫ জনকে ভিক্ষাবৃত্তি না করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। বাকি ৭৯৫ জনকে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাসমূহে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ২ হাজার ৯০০ জন ভিক্ষুককে আটক করা হয়। 

আটকদের রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ৭৫০ জনকে ভিক্ষাবৃত্তি না করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। অবশিষ্ট ২ হাজার ১৫০ জনকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের নিমিত্ত আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এ ছাড়া দেশের ৫টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ী ভিত্তিতে টিনশেড ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলায় ৬টি, গাজীপুরের কাশিমপুর ও পুবাইলে ৪টি করে ৮টি, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার মিরপুরে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে একটি করে ডরমিটরি নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও রাস্তা এবং কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। 

পুনর্বাসন কার্যক্রম: ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি পুনর্বাসন প্রকল্প নিয়ে এর স্টিয়ারিং কমিটির এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ভিক্ষুকদের ধরে এনে সাময়িক ব্যবস্থাপনায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রাখা হবে। স্থান সংকুলান না হলে আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ী ভিত্তিতে টিনশেডের ডরমিটরি নির্মাণ করা হবে। পরে তাদের নিজ গ্রামে ফেরত পাঠানো হবে এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় তাদের বাসস্থান করে দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ঋণ দেওয়া হবে। 

কিন্তু তবুও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না ভিক্ষুকদের সংখ্যা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ কোটি টাকায় ৬৩ জেলায় ৩ হাজার ৩ জনকে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ কোটি টাকায় ৩ হাজার জনকে পুনর্বাসন করা হয়। অর্থাৎ পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরুর পর ১৪ বছরে এই সেক্টরে প্রায় ৮৭ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। এর মধ্যে ৫৪ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয়ে পুনর্বাসনের সুবিধা পেয়েছে ১৭ হাজার ৭১০ জন। কিন্তু পুনর্বাসন করা হলেও কয়েক বছর না যেতেই বেশির ভাগ সুবিধাভোগী আগের পেশায় ফিরে আসে। 

প্রকল্পের ছড়াছড়ি: সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে জানা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জরিপ পরিচালনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় করা হয় ১৮ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও খরচ হয় ৪৮ লাখ টাকা। এই টাকায় ময়মনসিংহে ৩৭ জন ও জামালপুরে ২৯ জনকে পুনর্বাসন করা হয়। ২০১২-১৩ এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ করা হয় ১০০ কোটি করে টাকা। এর মধ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই টাকা আনুষঙ্গিক খাতে খরচ করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কোনো অর্থ ছাড় করা হয়নি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকার বরাদ্দে খরচ হয় ৭.০৯ লাখ টাকা। 

এ টাকা ঢাকা শহরের রাস্তায় বসবাসকারী শীতার্ত ব্যক্তিদের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া ও আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকার বরাদ্দ থেকে ৪৯ লাখ ৯৭ হাজারে ২৫১ জনকে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকার বরাদ্দ থেকে ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকায় ৯ জেলায় ৪১০ জনকে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ কোটি টাকায় ৫৮ জেলায় ২ হাজার ৭১০ জন, ২০১৮-১৯ সালে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৮ জেলায় ২ হাজার ৭১০ জন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৭ লাখ টাকায় ৪১ জেলায় ২ হাজার ৭১০ জন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ কোটি টাকায় বিভিন্ন জেলায় ২ হাজার ৮৫০ জন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ থেকে ২৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচে ৩৭টি জেলায় ৩০০০ জনের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানে খরচ করা হয়। 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, ভিক্ষুক পুনর্বাসনে তাদের মোবাইল কোর্ট সক্রিয় রয়েছে। ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। তবে দুঃখের বিষয়, তারা সেখান থেকে ছাড়া পেলে আবার পুরোনো পেশায় ফিরে যায়