যেকোনা টুর্নামেন্টে শিরোপা জেতা একটি দলের জন্য আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। কিন্তু সব টুর্নামেন্টে সব দলের পক্ষে এই আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া সম্ভব হয় না। চেষ্টা আর ভাগ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে শিরোপা জিতে একটি দল। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দে তখন সেই দলের খেলোয়াড়দের মাঝে বিরাজ করে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। আবার কোনো কোনো দল তীরে এসে তরী ডুবিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়। কখনো কখনো একাধিকবার তাদের এ রকম হতাশার সাগরে ডুবতে হয়। এটাই খেলা। এটাই খেলার নিয়ম। সেরা দলটিই জিতে নেয় শিরোপা। তাই বলে হেরে যাওয়া দলটিকেও হালকা করে দেখার অবকাশ থাকে না। এ রকম একটি দল নিউজিল্যান্ড, যারা আইসিসির সব ইভেন্ট মিলিয়ে সাতবার ফাইনাল খেলে মাত্র দুই বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ক্রিকেটে বিশ্বে আইসিসির এখন চারটি বৈশ্বিক আসর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কোনোটি চার বছর পর, আবার কোনেটি দুই বছর পর পর। যে কারণে প্রতিবছরই আইসিসির কোনো না কোনো টুর্নামেন্ট থাকেই। আবার কোনো কোনো বছর দুটি টুর্নামেন্টও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। করোনার পর থেকে যদি পরিসংখ্যান গণনা করা হয়ে থাকে, তাহলে দেখা যায় প্রতিবছরই আইসিসির কোনো না কোনো ইভেন্ট আছে। আবার কোনো বছর দুটিও। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতি দুই বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ফাইনাল। ফলে সে বছর আইসিসির দুটি ইভেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যেমন ২০২১ সাল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০২৩ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল (১১ থেকে ২৫ জুন) লর্ডসে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
আইসিসির এতগুলো আসর থাকার পরও এমন অনেক দল আছে যারা এখন পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি, এমনকি ফাইনালও খেলতে পারেনি। আবার এমন অনেক দল আছে যারা ফাইনাল খেলে ঠিকই, কিন্তু সাফল্য ধরা দেয় কম। এমনই একদলের নাম নিউজিল্যান্ড। আইসিসির চারটি ইভেন্টে তারা এখন পর্যন্ত ৭ বার ফাইনাল খেলেছে। কিন্তু শিরোপা জিতেছে মাত্র দুবার। ২০০০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। ব্যর্থতায় খাতায় যোগ হয়েছে মাত্রই শেষ হওয়া চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রানার্সআপ হওয়া। তবে বিংশ শতাব্দীর এই দশকে নিউজিল্যান্ডের অগ্রযাত্রা চোখে পড়ার মতো। আইসিসির সাতটি ইভেন্টের তিনটিতেই তারা ফাইনালে উঠেছে। শিরোপা জিতেছে একটি।
আইসিসির আদি আসর ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ১৯৭৫ সালে এই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ৪০ বছর পর ২০১৫ সালে গিয়ে নিউজিল্যান্ড প্রথমবারের মতো ফাইনাল খেলে। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। দুই দেশই ছিল যৌথ আয়োজক। ১৯৯২ সালের পর আবার দুই দেশ যৌথভাবে আয়োজক হয়েছিল। ১৯৯২ সালে স্বাগতিক দুই দেশই ফাইনালে উঠতে পারেনি। কিন্তু ২০১৫ সালে দুই স্বাগতিক দেশই ফাইনাল খেলে। লো স্কোরিং ফাইনালে নিউজিল্যান্ড হেরেছিল ৭ উইকেটে। মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত ফাইনালে নিউজিল্যান্ড টস জিতে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৮৩ রানে অলআউট হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া সেই রান তাড়া করে ৩৩.১ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে। পরের বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টও নিউজিল্যান্ড ফাইনাল খেলে। প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিকরাই। ক্রিকেট বিশ্বের ইতিহাসে সেরা ফাইনালের জন্ম দিয়ে ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বেশি বাউন্ডারি মারার কারণে। ৫০ ওভারে নিউজিল্যান্ডের ৮ উইকেটে করা ২৪৮ রানের জবাব দিতে নেমে ইংল্যান্ড শেষ বলে ২৪৮ রানেই অলআউট হয়ে যায়। শেষ বলে তাদের ২ রানের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে মার্ক উড রান আউট হয়ে যান। এরপর সুপার ওভারে প্রথমে ইংল্যান্ড ব্যাট করে ১৫ রান করে। এবার নিউজিল্যান্ড তাড়া করতে নেমে ১৫ রানই করে। শেষ বলে তাদেরও প্রয়োজন ছিল ২ রানের। এবার তাদের গাপটিল দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে রানআউট হয়ে যান। এরপর পুরো ইনিংসের দুই দলের চার ও ছয় গণনা করা হয়। যেখানে দেখা যায় ইংল্যান্ড ২৬টি, নিউজিল্যান্ড ১৭টি ছিল। এভাবে স্বপ্নচূর্ণ হয় নিউজিল্যান্ডের।
ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিউজিল্যান্ডকে পৃষ্ঠদেশ দেখালেও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি কিন্তু তাদের উচ্ছ্বাসের ঝর্ণাধারা বইয়ে দিয়েছে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করা আসরের দ্বিতীয় আয়োজনেই চ্যাম্পিয়ন হয় নিউজিল্যান্ড। কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ভারতকে হারিয়েছিল ৪ উইকেটে। আগে ব্যাট করে ভারত ৬ উইকেটে করেছিল ২৬৪ রান। জবাব দিতে নেমে নিউজিল্যান্ড ২ বল বাকি থাকতে ৬ উইকেটে করে ২৬৫ রান। আইসিসির কোনো ইভেন্টে এটি ছিল তাদের প্রথম শিরোপা। এরপর ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত আসরে নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনাল খেলেছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আর পেরে ওঠেনি। হেরেছিল ৬ উইকেটে। নিউজিল্যান্ড আগে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ২০০ রান করে। অস্ট্রেলিয়া সেই রান অতিক্রম করে ৪৫.২ ওভারে ২০৬ রান করে। এরপর তারা ফাইনাল খেলেছিল। এবার তাদের আশাহত করে ভারত।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিউজিল্যান্ড একবারই মাত্র ফাইনাল খেলেছে ২০২১ সালে। করোনার কারণে ভারতের টুর্নামেন্ট স্থানান্তরিত হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল সেই অস্ট্রেলিয়া। নিউজিল্যান্ডের ৪ উইকেটে করা ১৭৪ রান অজিরা পাড়ি দিয়েছিল ১৮.৫ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে। নিউজিল্যান্ড ফাইনালে যে পাঁচবার হেরেছে, তার তিনবারই প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরেই নিউজিল্যান্ড ফাইনালে উঠে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২৯২১ সালে সাউদাম্পটনে অনুষ্ঠিত ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। নিউজিল্যান্ড ম্যাচ জিতেছিল ৮ উইকেটে।