ভারতের টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক দলের জন্য শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। পরিবর্তনের এই সময়ের কেন্দ্রে রয়েছেন এক পরিচিত মুখ- শ্রেয়াস আইয়ার। আড়াই বছরেরও বেশি সময় পর ভারতের টি-টোয়েন্টি দলে ফিরে তিনি শুধু জায়গাই পাননি, পেয়েছেন নেতৃত্বের দায়িত্বও। আগামী জুন ও জুলাইয়ে আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফরে ভারতকে নেতৃত্ব দেবেন তিনি, সূর্যকুমার যাদবের উত্তরসূরি হিসেবে।
দায়িত্ব পাওয়া শ্রেয়াসের জন্য নিছক একটি নিয়োগ নয়; এটি এক অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প। খুব বেশি দিন আগে নয়, যখন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত একটি মৌসুম, তিন সংস্করণেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) নজরকাড়া প্রদর্শন তাকে আবারও নির্বাচকদের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে এনেছে।
সেই আস্থারই প্রতিফলন এখন ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের টি-টোয়েন্টি দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব। নতুন যুগের এই যাত্রায় শ্রেয়াসের পাশে রয়েছেন তিলক বর্মা। সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া এই বাঁহাতি ব্যাটারকে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় মুখ হিসেবে দেখছে নির্বাচকরা। গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন তিলক। এখন তাকে ভারতের ভবিষ্যৎ সাদা বলের ক্রিকেট পরিকল্পনার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে নতুন দলের সবচেয়ে আলোচিত নামটি সম্ভবত বৈভব সূর্যবংশী। মাত্র ১৫ বছর বয়সে অধিকাংশ কিশোর যেখানে স্কুলের পড়াশোনা, বোর্ড পরীক্ষা কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানে বৈভব প্রস্তুতি নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে পা রাখার জন্য।
তার উত্থান যেন রূপকথার মতো। কয়েক মাস আগেও তিনি ছিলেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে আলোচিত এক প্রতিভা। আর এখন তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে উত্তেজনাকর তরুণ নামগুলোর একজন। ভারতের জাতীয় দলে প্রথম ডাক পাওয়া তার ক্যারিয়ারের আরেকটি বিশাল মাইলফলক হতে পারে। আপাতত তিনি একজন লাজুক কিশোর, যার হাতে একটি ব্যাট, হৃদয়ে একটি স্বপ্ন এবং কাঁধে কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিত সাইকিয়া অবশ্য এই প্রতিভাবান তরুণকে নিয়ে সতর্ক। তার ভাষায়, ‘আমরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব সতর্ক। আমাদের নির্বাচক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা তার প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।’
দলের গঠনও স্পষ্টভাবে বলে দেয়- ভারত একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিভার ঘাটতি নেই মোটেও। উইকেটরক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতার ভরসা হয়ে আছেন সাঞ্জু স্যামসন ও ইশান কিষাণ। অন্যদিকে অভিষেক শর্মা, তিলক ভার্মা এবং নীতীশ কুমার রেড্ডি টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারে এনে দিচ্ছেন আক্রমণাত্মক ও নির্ভীক ক্রিকেটের প্রতিশ্রুতি।
শিভম দুবের শক্তিশালী ব্যাটিং এখনও দলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, বিশেষ করে পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে। একই সঙ্গে অক্ষর প্যাটেল ও ওয়াশিংটন সুন্দর সেই ভারসাম্য ও নমনীয়তা এনে দিচ্ছেন, যা আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
বোলিং বিভাগেও রয়েছে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেল। মোহাম্মদ সিরাজ ও আর্শদীপ সিং নেতৃত্ব দেবেন পেস আক্রমণে। তাদের সঙ্গে হার্শিত রানা ও প্রিন্স যাদব যোগ করবেন বাড়তি গতি এবং তরুণ উদ্যম। স্পিন বিভাগে রবি বিষ্ণোই ও বরুণ চক্রবর্তী ভিন্নধর্মী দক্ষতা এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রমাণিত উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য নিয়ে থাকছেন দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে।
আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফর হয়তো কোনো ক্রিকেটারের পুরো ক্যারিয়ার নির্ধারণ করবে না। কিন্তু এই সফরগুলো হয়তো দেখিয়ে দেবে ভারতীয় ক্রিকেট আগামী দিনে কোন পথে এগোতে চায়।
একদিকে রয়েছেন একজন প্রত্যাবর্তনকারী নেতা, যিনি নিজের জায়গা আরও শক্ত করতে চান। অন্যদিকে একজন তরুণ সহ-অধিনায়ক, যাকে ভবিষ্যতের বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। আর তাদের পাশে রয়েছে একদল উদীয়মান ক্রিকেটার, যারা সম্ভাবনাকে স্থায়ী সাফল্যে রূপ দিতে অপেক্ষা করছে।
নামগুলো ইতোমধ্যে কাগজে লেখা হয়ে গেছে। এখন বাকি শুধু মাঠের লড়াই। ইংল্যান্ডের গ্রীষ্ম শুরু হলেই শুরু হবে নতুন ভারতের প্রকৃত পরীক্ষা।
ভারত টি-টোয়েন্টি দল: শ্রেয়াস আইয়ার (অধিনায়ক), তিলক বর্মা (সহ-অধিনায়ক), অভিষেক শর্মা, সাঞ্জু স্যামসন (উইকেটরক্ষক), ইশান কিষাণ (উইকেটরক্ষক), শিভম দুবে, নিতিশ কুমার রেড্ডি, অক্ষর প্যাটেল, ওয়াশিংটন সুন্দর, বরুণ চক্রবর্তী, বৈভব সূর্যবংশী, রবি বিষ্ণুই, মোহাম্মদ সিরাজ, হর্ষিত রানা, আর্শদীপ সিং এবং প্রিন্স যাদব।
অনিক/