সাকিব ছিলেন ক্রিকেটের ফেরিওয়ালা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলে বেড়াতেন। ভারতের আইপিএল, অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিপিএল, পাকিস্তানের পিএসএল। কিন্তু এখন আর এসব জায়গা থেকে সব সময় তার ডাক আসে না। অনেকটাই ব্রাত্য তিনি।
একসময় আইপিএলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন সাকিব। কিন্তু এখন ডাকই পান না। বিগব্যাশেও খেলেছেন। কিন্তু সেখানেও ডাক আসে না। সিপিএলে (ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) একসময় নিয়মিত থাকলেও মাঝে দুই বছর আর খেলার সুযোগ পাননি। দুই বছর বিরতির পর আবার তিনি সুযোগ পেয়ে এবার খেলছেন অ্যান্টিগা ও বারবুডা ফ্যালকনসের হয়ে। পিএসএল (পাকিস্তান সুপার লিগ) এবার খেলেছেন শেষের দিকে দুটি ম্যাচ লাহোর কালান্দার্সের হয়ে। অবশ্য গ্লোবার সুপার লিগে দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে খেলেছেন নিয়মিত। অথচ একসময় এসব ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলার জন্য সাকিব জাতীয় দলে খেলতে চাননি। ছুটি নিয়ে খেলতে গিয়েছেন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। কিন্তু ফর্মের ঘাটতি বড় বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি আসরে খেলা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
খেলোয়াড়ি জীবনে ফর্মের উত্থান-পতন হতেই পারে। সাকিবের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। কিন্তু ফর্মহীনতায় তিনি বেশি দিন ভোগেননি। চুইংগামের মতো টেনে লম্বা হতে দেননি। স্বীয় প্রতিভার ছাপ রেখে তিনি ফিরেছেন নিজের চেনা রূপে। কিন্তু এবারের ফর্মহীনতা ম্যারাথন হয়ে উঠেছে। ব্যাট হাতে যেমন রান নেই, তেমনি বল হাতে নেই উইকেট। আগে ব্যাট হাতে ভালো করতে না পারলেও বল হাতে পুষিয়ে দিয়েছেন। কিংবা বল হাতে ব্যর্থ হলে ব্যাট হাতে সফল হয়েছেন। খেলোয়াড়ি জীবনের সায়াহ্নে এসে তার এই লম্বা ফর্মহীনতা যেন তিনি শেষের ডাক শুনতে পাচ্ছেন।
সাকিবের ফর্মের সঙ্গে এ রকম লম্বা যুদ্ধ শুরু হয়েছে গত বছর ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। পটপরিবর্তনের সময় দেশে ছিলেন না। নিরাপত্তার কারণে এরপর তিনি আর দেশেই আসতে পারেননি। দেশে না এসেই পাকিস্তান ও ভারত গিয়ে জাতীয় দলের সঙ্গে দুটি করে চারটি টেস্ট খেলেছিলেন। সব কটি টেস্টেই তিনি ব্যাট হাতে সফল হতে পারেননি। সর্বোচ্চ রান ছিল চেন্নাইয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৩২। তিনটি ইনিংসে দুই অঙ্কের ঘরে আউট হয়েছিলেন। একটি ছিল আবার ০। বল হাতে উইকেট পেয়েছিলেন দুই সিরিজে ৯টি। পাকিস্তানের বিপক্ষে পাঁচটি এবং ভারতের বিপক্ষে চারটি। ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ রানে পেয়েছিলেন চার উইকেট।
এই টেস্টের আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলে অবসর নিবেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকেও অবসর নেবেন। আর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষেই তিনি শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। তার মানে সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার তখন শেষের দিকে। কিন্তু টেস্ট ও ওয়ানডে থেকে অবসর নেওয়ার সেই সুযোগ তিনি আর পাননি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে। ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুবাইও চলে এসেছিলেন। দুবাই আসার পর তার কাছে সংবাদ যায় নিরাপত্তার শঙ্কার কারণে তিনি যেন দেশে না আসেন। জীবন যাত্রার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সাকিবের খেলোয়াড়ি জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা এখনো বিদ্যমান।
বড় বড় আসরে ডাক না পাওয়ায় সাকিব ঝুঁকে পড়েন অখ্যাত লিগগুলোর দিকে। কারণ তার হাতে এখন অখণ্ড সময়। নামিদামি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হোক আর অখ্যাত লিগ হোক সাকিব কিন্তু নৈপুণ্য দেখাতে পারছেন না। যেমন, গত মাসে তিনি জর্জটাউনে ক্যারিবিয়ান ম্যাক্স ৬০ আসরে মিয়ামি ব্লেজের হয়ে খেলেছিলেন। পাঁচ ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে তার সর্বোচ্চ রান ছিল ২৯। মোট রান করেছিলেন ৪২। বল হাতে উইকেট ছিল পাঁচটি। সেরা বোলিং ছিল ১১ রানে ২ উইকেট। এর আগে গ্লোবাল টি-টোয়েন্টিতে তিনি চার ম্যাচ খেলে রান করেছিলেন ৭২। বলার মতো রান পারফরম্যান্স ছিল একটি ম্যাচেই। সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিকের বিপক্ষে ব্যাট হাতে অপরাজিত ৫৮ রানের ইনিংস খেলার পর বল হাতে ১৩ রানে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। এই আসরে তার মোট উইকেট ছিল ৫টি। তারও আগে তিনি খেলেছিলেন পিএসএলে লাহোর কালান্দার্সের হয়ে শেষের দিকে। এলিমিনেটের রাউন্ডে করাচি কিংসের বিপক্ষে ১ ওভারে ৪ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন। ব্যাট করার আর সুযোগ পাননি, দল ৬ উইকেটে জিতে যাওয়ায়। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের বিপক্ষে ৯৫ রান ম্যাচ জিতে দল ফাইনালে উঠে গেলেও সাকিব ছিলেন ফ্লপ। ব্যাট হাতে রানই করতে পারেননি। বল হাতে ৩ ওভারে ২৭ রান দিয়ে উইকেট শূন্য থাকেন। যে কারণে তাকে ফাইনালে আর নামানোরই সাহস করেনি লাহোর কালান্দার্স।
সাকিবের না খেলাটাও ছিল তার জন্য বিব্রতকর। কারণ সেরা একাদশে তার নামা রাখা হয়েছিল ‘যদি’ বসিয়ে। সিকান্দার রাজা নটিংহ্যামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট শেষ করেই ২৪ মে রওনা দিয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দেন। টস করার আগে যদি তিনি এসে না পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য সাকিবকে সেরা একাদশে রাখা হয়েছিল। কিন্তু টসের ১০ মিনিট আগে স্টেডিয়ামে পৌঁছে গেলে দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তির পরও সিকান্দার রাজাকেই একাদশে রেখে সাকিবকে বাদ দেওয়া হয়। সময়ের প্রেক্ষাপটে কী নির্মম বাস্তবতা দেখেন সাকিব। একসময় যেকোনো দলের জন্য সাকিব ছিলেন পরম আকাঙ্ক্ষার, সেই সাকিব হয়ে পড়েন অপাঙ্ক্তেয়! এদিকে দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সেই সিকান্দার রাজাই ৭ বলে অপরাজিত ২২ রানের ইনিংস খেলে দলের জয়ে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সাকিব এখন খেলছেন সিপিএলে অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডা ফ্যালকনের হয়ে। সেখানেও তিনি ম্রিয়মাণ। ৫ ম্যাচের চারটিতে ব্যাট করে রান করেছেন ১১, ১৩, ৭ ও ৮। বল হাতে উইকেট পেয়েছেন মাত্র একটি। অপর ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে মাঠেই গড়াতে পারেনি। সেই সাকিব সামনে খেলবেন যুক্তরাষ্ট্রের মাইনর লিগে আটলান্ট ফায়ারের হয়ে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি উন্নয়নমূলক লিগ। মানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগের অনেক নিচে। মাইনর লিগের মান বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যেকোনো আসরে দল না পাওয়া নাসির হোসেন খেলেছেন এই লিগ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এভাবেই চলছে একসময়ে তিন ফরম্যাটেই বিশ্বের নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার সাকিবের ক্রিকেট জীবন!
পলাশ/নিলয়/