হংকংয়ের বিপক্ষে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে জিতেও যেন বাংলাদেশ দল হেরে গেছে! তাহলে কি হংকংয়ের বিপক্ষে এই জয়ে কাঁটা ছিল? হয়তো তাই? নতুবা ম্যাচ জেতার পর সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রতিনিধি হয়ে কথা বলতে আসা তাওহিদ হৃদয় যেভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়েছে, তা হয়তো তার খেলোয়াড়ি জীবনে নতুন এক অভিজ্ঞতা যোগ হয়েছে! হংকংয়ের বিপক্ষে ৭ উইকেটের জয় নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন উঠেছে রান তাড়া করার মনোভাব নিয়ে। এশিয়া কাপের ‘বি’ গ্রুপকে বলা হচ্ছে ডেথ গ্রুপ। সুপার ফোরে যাওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কার যেকোনো একটি দলকে ছিটকে পড়তে হবে। যে কারণে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপের অপর দল হংকং যেন বাকি তিন দলের ভোজন।
বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-আফগানিস্তান সুপার ফোরে যাওয়ার প্রশ্নে নিজেদের করণীয় কাজটি অর্থাৎ নেট রানরেট বাড়িয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে হংকংয়ের বিপক্ষে তাদের নিজ নিজ ম্যাচ। এই কাজটি হংকংয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ ভালোভাবে করে রাখতে পারেনি। হংকংয়ের ৭ উইকেটে করা ১৪৩ রান বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে ১৭.৪ ওভারে। এই কাজটি আবার বেশ ভালোভাবে করে রেখেছে আফগানিস্তান। হংকংয়ের বিপক্ষে ৯৪ রানে ম্যাচ জিতে আফগানিস্তান তাদের নেট রানরেট অনেক বাড়িয়ে রেখেছে + ৪.৭০০। সেখানে বাংলাদেশের নেট রানরেট + ১.০০১। আফগানিস্তান এগিয়ে আছে + ৩.৬৯৯। শ্রীলঙ্কা এখনো মাঠে নামেনি। আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের মিশন শুরু হবে। কোনো কারণে এই তিন দলের পয়েন্ট সমান হয়ে গেলে তখন এই নেট রানরেটই সুপার ফোরে যাওয়ার প্রশ্নে প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের জন্য তখন এটি বড় এক হুমকি হয়ে উঠবে। কারণ হংকংয়ের বিপক্ষে (১৫ সেপ্টেম্বর ম্যাচ) শ্রীলঙ্কাও তাদের নেট রান বাড়ানোর প্রয়োজনীয় কাজটি করে রাখাতে ভুল করবে না। যে কারণে হংকংয়ের বিপক্ষে নিজেদের নেট রানরেট বাড়িয়ে রাখতে না পারার কারণে তাওহিদ হৃদয়কে এ রকম প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়েছে। খুবই ঠাণ্ডা মাথায় তাওহিদ হৃদয় নিজেদের ম্যাচ জেতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করা রুখতে। যে কারণে এক পর্যায়ে তিনি সমাধানের পথ দেখিয়ে দেন সরাসরি তিনটি ম্যাচ জেতার। তিনি বলেন, ‘রানরেট নিয়ে এত নেতিবাচক ভাবছি কেন আমরা? যদি তিনটা ম্যাচ জিতি, তাহলে তো রানরেটের ব্যাপার থাকছে না।’ সমীকরণ সহজ করে রাখতে বাংলাদেশকে তাই আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিততেই হবে। হারলেই পড়বে সেই কঠিন সমীকরণের মুখে।
নেট রানরেট নিয়ে যখন এত প্রশ্ন উঠেছে, তখন তাওহিদ হৃদয় জানিয়েছিলেন ম্যাচ জেতাটা ছিল মুখ্য, যাতে করে কোনো কারণে ম্যাচ হাত ছাড়া না হয়। যেকোনো দলের বিপক্ষে জয় মনোবল বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশ আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নামবে সেই জয়ের মনোবল নিয়ে। এই মনোবলে বাড়তি প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাওয়া সাম্প্রতিক সাফল্য। যে সাফল্য লিটন দাসরা পেয়েছেন শ্রীলঙ্কা সফরে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে। এই সিরিজ জয় বাংলাদেশ দলের জন্য অন্যরকম টনিক হিসেবেও কাজ করবে। কারণ এবারে বাংলাদেশ দলের লঙ্কা সফর ছিল পূর্ণাঙ্গ। টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ হাত ছাড়া হওয়ার পর টি-টোয়েন্টি সিরিজও শুরু করেছিল হার দিয়ে। পরে দারুণভাবে ফিরে এসে শেষ দুই ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই সাফল্য দলকে যে দারুণভাবে বুস্টআপ করবে তা বোঝা যায় তানজিম সাকিবের কথায়, ‘শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আমরা এক্সট্রা একটা কনফিডেন্স নিয়ে নামব।’
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের এই সিরিজ জয় পরে দলের জন্য দারুণ উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করতে থাকে। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ২-১ ব্যবধানে হারানোর পর নেদারল্যান্ডসকে হারায় ২-০ ব্যবধানে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই সিরিজ থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দল ১০ ম্যাচ খেলে ৮টিতেই জয়ী হয়েছে। তাই নেট রানরেটের বিষয়টি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাংলাদেশ দল আজ অনেক বেশি উজ্জীবিত থাকবে। উজ্জীবিত থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশ দল আজ খুব বেশি সাবধানীও। আবুধাবির প্রচণ্ড তাপমাত্রা এড়াতে গতকাল তারা কোনো অনুশীলনই করেনি। দলকে রাখা হয়েছে বিশ্রামে। এমন কি ম্যাচের আগের দিন নিয়মানুযায়ী সংবাদ সম্মেলন করা হয়ে থাকে। এই সংবাদ সম্মেলনও এড়াতে বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকে হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচ শেষেই ‘প্রি-ম্যাচ’ সংবাদ সম্মেলন করে রাখা হয়। যেখানে এসেছিলেন তানজিম হাসান সাকিব। আর এভাবে আয়োজনের কারণে এসিসির পক্ষ থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুরের আগে প্রকাশ বা প্রচার না করার জন্য নির্দেশও দেওয়া হয়।
আজকের ম্যাচ যেখানে বাংলাদেশের জন্য অনেকটা চ্যালেঞ্জ, সেখানে শ্রীলঙ্কার মিশন শুরু হবে। দুই দলই চাইবে নিজ নিজ কাজটি করে রাখতে। জয়-পরাজয়ের মাঝে দুই দলের সাম্প্রতিক লড়াই কিন্তু নিদাহাস ট্রফির পর অন্য রকম উত্তেজনায় চলে গিয়েছে। সেখানে নতুন করে পারদ সৃষ্টি হয় ২০২৩ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে সেই বিখ্যাত ‘টাইমড’ আউট নিয়ে। তবে তানজিম সাকিবের দৃষ্টি ম্যাচ জেতার দিকে। তিনি বলেন, ‘রাইভেলারি আসলে থাকবে। একটা টুর্নামেন্টে আপনি যেকোনো টিমের এগেইনেস্টে খেলেন না কেন জেতাটা মুখ্য বিষয়।’ শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক চারিথ আসালাঙ্কাও মনে করেন সে রকম এবং তারা জেতার জন্য খেলবেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যে প্রস্তুতি তাতে করে বোলাররা কিন্তু বেশ ভালোভাবে লেটার মাকর্স পেয়ে উতরে যাবেন। কারণ তারা প্রতিপক্ষ আগে ব্যাট করলে তাদের খুব বেশি রান করতে দেননি। এর ফলে ব্যাটাররা কিন্তু সেভাবে নিজেদের ব্যাটিং অনুশীলন করতে পারেননি। ডাচদের বিপক্ষে থেকে শুরু করে হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচ পর্যন্ত শুধুমাত্র টপ ও মিডল অর্ডারের ব্যাটারই ব্যাটিং করতে পেরেছেন। এদিকে লিটন দাস আবার নেতৃত্ব পাওয়ার পর থেকেই টস জিতলে বোলারদের হাতে বল তুলে দিচ্ছেন। আজও যদি টস ভাগ্য তার পক্ষে যায়, হয়তো একই কাজ করবেন। তখন বোলারদের দায়িত্ব হবে সেই আগের কাজটির পুনরাবৃত্তি করে প্রতিপক্ষকে অল্প রানে আটকে রাখা। তাহলে ব্যাটারদের কাজটি সহজ হবে। টার্গেট বেশি হলে কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য তখন চ্যালেঞ্জটা কঠিন হয়ে পড়বে।
পলাশ/নিলয়/