২২ গজে নাসুম আহমেদ যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা।
২২ গজের বাগানে নাসুম তারা হয়ে ধরা দেন। এবারের এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচ ছিল অস্তিত্ব রক্ষার। হারাতেই হবে। কিন্তু বাংলাদেশ যে আফগানিস্তানকে হারাবে, সেই রসদ কোথায়? গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচের একটিতে জয় পেয়েছে। কিন্তু সেটি ছিল অনেকটা জয় না পাওয়ার মতোই। হংকংকে ৭ উইকেটে হারালেও তাদের করা ৭ উইকেটে ১৪৩ রান পাড়ি দিয়েছিল ১৭.৪ ওভারে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তো পাত্তাই পায়নি। তাই আফগানিস্তানকে হারাতে পারলে অন্তত সুপার ফোরে উঠার লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে। তিন দলের পয়েন্ট সমান হয়ে গেলে তখন নেট রানরেট নিয়ামক হয়ে উঠবে। সেই খেলায় বাংলাদেশ আবার স্কুলের লাস্ট বেঞ্চের ছাত্র। কিন্তু তার আগে তো আফগানিস্তানকে হারাতে হবে?
আফগানিস্তানকে হারাতে একাদশে চারটি পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ। যে চারটি পরিবর্তনের মাঝে তিনজনই আবার প্রথম খেলেন এবারের আসরে। এই তিনজনের মাঝে একজন ছিলেন নাসুম আহমেদ। সেই নাসুমই পরে হয়ে উঠেন দলের জয়ের প্রধান কাণ্ডারি। ইনিংসের প্রথম বলে উইকেট নিয়ে দলের মনোবল চাঙ্গা করে তোলেন। পরে দাপিয়ে বেড়ান দলের বাকি সৈনিকরা। নাসুম ছিলেন অগ্রভাগে। তার বল যেন খেলতেই পারছিলেন না আফগানরা। ২৪ বলের দুই তৃতীয়াংশ (১৬টি) বলে নাসুম কোনো রানই দেননি। ৪ ওভারে একটি মেডেন নিয়ে মাত্র ১১ রান দিয়ে তিনি সাদিকউল্লাহ অটল ও ইব্রাহীম জাদরানের উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন।
নাসুমের এই নৈপুণ্য ছিল অনেকটা স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা। একে তো দলের জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, সেখানে আবার নিজের প্রথম ম্যাচ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এশিয়া কাপ খেলতে দেশ ছেড়ে আসার আগে ভয়াবহ এক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। একটি টিভি চ্যানেলে নাসুম তার বাবার প্রতি খেয়াল রাখেন না। যে কারণে তার বাবা দারোয়ানের চাকরি করছেন- এ রকম একটি সংবাদ প্রচার হয়। মুহূর্তে নিউজটি ভাইরাল হয়ে যায়। সর্বত্র নাসুমকে নিয়ে ধিক্কার দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাসুমকে আক্রমণাত্মক ভাষায় আক্রমণ করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় নাসুম বিভিন্ন মিডিয়াতে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। পরে জানা গেছে এটা তাদের পারিবারিক মতানৈক্য। ঘটনা সত্য নয়। নাসুমের চাচা চক্রান্ত করে তার বাবাকে দিয়ে এসব সাজিয়েছেন। নাসুম জানিয়েছিলেন প্রতি মাসে বাবাকে নিয়মিত টাকা দেন। বোন তার সঙ্গেই থাকেন।
এশিয়া কাপের মতো একটি আসরে ঠিক খেলতে যাওয়ার আগে এ রকম একটি ঘটনা যেকোনো খেলোয়াড়ের মনের ওপর অনেক বড় প্রভাব ফেলে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। নাসুমও তার বাইরে ছিলেন না। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর দৃঢ় মনোবল নাসুম সব প্রতিকূলতা জয় করে নিজে জয়ী হয়েছেন। দেশকে জয়ী করিয়েছেন। প্রথম দুই ম্যাচে তাকে খেলানোই হয়নি। অথচ প্রথমবার খেলতে নেমেই বাজিমাত করেন। সিরিজ বা টুর্নামেন্টের মাঝ পথে খেলতে নেমেই বাজিমাত করা নাসুমের জন্য নতুন নয়।
এশিয়া কাপ খেলতে আসার আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নেদারল্যান্ডসকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে। সেখানে নাসুম প্রথম খেলতে নামেন সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে। ব্যস, নাসুম দেখান তার দ্যুতি। ৪ ওভারে ২১ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। এমন নৈপুণ্যের পরও তাকে এশিয়া কাপের প্রথম দুই ম্যাচে একাদশের বাইরে রাখা হয়। ডাচদের বিপক্ষে খেলার আগে নাসুম আবার শেষ ম্যাচ খেলেছিলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের সিরিজের শেষ ম্যাচ। সেই ম্যাচেও তিনি নিজেকে মেলে ধরেন। ৪ ওভারে ২২ রান দিয়ে নিয়েছিলেন দুই উইকেট। ম্যাচটি বাংলাদেশ হেরেছিল ৭৪ রানের বড় ব্যবধানে। কিন্তু হারলেও ইনিংসে সেরা বোলিং ছিল নাসুমের। ৪ ওভারে ২২ রান দিয়ে দুই উইকেট নিয়েছিলেন।
নাসুম আহমেদ এ রকম নৈপুণ্য দেখালেও দলে কিন্তু নিয়মিত হতে পারেননি। কখনো কম্বিনেশনের কারণে, কখনো আবার কারও সুনজরে না থাকাতে। আবার ফর্মের কারণেও কখনো কখনো দল থেকে বাদ পড়েছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলার আগে তিনি সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছিলেন ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। তখন তার সময়টা খুব বাজে গিয়েছিল। ২০২২ সালের মার্চে এই আফগানিস্তানের বিপক্ষেই ঘরের মাঠে ৪ ওভারে ১০ রান দিয়ে চার উইকেট নেওয়ার পর তার ফর্মে ঘাটতি দেখা দেয়। যা চুইংগামের মতো ক্রমেই লম্বা হতে থাকে। উইকেটও পাচ্ছিলেন না, আবার রানও বেশি দিচ্ছিলেন। যে কারণে তিনি মাঝে টানা দুই বছর দলের বাইরে ছিলেন। আবার ফিরে আসার পর নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করছেন। যার সর্বশেষ নজির তিনি রেখেছেন আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে আফগানদের বিপক্ষে।
সব প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে নাসুম আহমেদ আবারও প্রমাণ করলেন; সুযোগ পেলে তিনি দলের অন্যতম ভরসা হতে পারেন। এক ম্যাচেই বদলে দিলেন বাংলাদেশের ভাগ্য, বদলে দিলেন নিজের অবস্থানও। ব্যক্তিগত আঘাত, সমালোচনা আর দীর্ঘদিনের অবহেলা সত্ত্বেও দৃঢ়তায় তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন সবার সামনে। আবুধাবির আলোয় তাই নাসুম কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি হয়ে উঠলেন লড়াই আর প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
পলাশ/নিলয়/