মাঠে নিজেদের প্রমাণ করে যাচ্ছেন, অথচ সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার, মাছুরা পারভীনদের জন্য জাতীয় দলের দরজা খুলছে না। খুলবে কি করে! এই তারকারা যে ইংলিশ কোচ পিটার বাটলারের চক্ষুশূল।
সাবিনা, কৃষ্ণা, মাছুরারা এক যুগেরও বেশি সময় জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাদের পায়েই রচিত হয়েছে অনেক অনেক ইতিহাস। অথচ বাটলারের গুডবুকে নেই তারা। ফিটনেস, পারফরম্যান্স ও শৃঙ্খলা– নানা সময়ে এই তিনটি কারণ সাবিনাদের বাদ দেওয়ার পেছনে যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এই খেলোয়াড়রা যেখানেই সুযোগ পাচ্ছেন, নিজেদের প্রমাণ করে যাচ্ছেন। ভুটানের লিগে তারা পারফর্ম করেছেন। সবশেষ ফুটসাল দলের হয়ে দেশকে সাফ শিরোপা উপহার দিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ আরেকবার দিয়েছেন সাবিনারা। তাই তো অনেক ফুটবল বিশ্লেষকই বাটলারের যুক্তি মানতে পারছেন না। বরং তারা এই খেলোয়াড়দের যোগ্য সম্মান জানানোর দাবি তুলছেন।
জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক ডিফেন্ডার নার্গিস খাতুন তো সরাসরিই বলছেন, ‘সিনিয়র যে কজন দলের বাইরে এখন, তাদের যে পারফরম্যান্সের জন্য বাদ দেওয়া হয়েছে, বিষয়টা কিন্তু এ রকম না। একটা ঝামেলা তৈরি হয়েছিল, এর পর থেকে তাদের আর ডাকা হয়নি।’ এই ঝামেলার বিষয়টি সবারই জানা। কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধের একগাদা অভিযোগ এনে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন ১৮ জন ফুটবলার। যাদের বেশির ভাগই ২০২২ ও ২০২৪ সাফ জয়ী দলের অংশ ছিলেন। সিনিয়র খেলোয়াড়দের এই বিদ্রোহ নিয়ে তখন অনেক তোলপাড় হয়েছে। পরে বাফুফের মধ্যস্থতায় সেই বিদ্রোহের অবসানও হয়। ঋতুপর্ণা, তহুরা, মারিয়াসহ ১২-১৩ ‘বিদ্রোহি’ ফুটবলারকে আবার দলে ডাকেন বাটলার। তবে সাবিনা, কৃষ্ণা, মাছুরাসহ ৫-৬ জন থেকে যান উপেক্ষিত। কৃষ্ণা-মাছুরাদের বয়স সবে ২৪-২৫। শুধুমাত্র সাবিনার বয়সই ত্রিশের কোটা পেরিয়েছে। এরপরও এই খেলোয়াড়দের এখনই শেষ দেখছেন বাটলার।
নার্গিস বলছেন, ‘আমার কাছে মনে হয় দেশের কথা চিন্তা করে যার যতখানি সামর্থ্য আছে দেশকে দেওয়ার, সেই জায়গাটা যেন বিবেচনা করা হয়। আমি বলব, সিনিয়র যে কজন বাইরে আছেন, তাদের নিয়ে যেন ভাবা হয়। পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন যেন হয়। তাহলে দলটা আরও শক্তিশালী হতে পারে।’
আগামী মার্চে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে অংশ নেবে বাংলাদেশ। সেই আসরে সাবিনার মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারকে অপরিহার্য মনে করেন অনেকে। কৃষ্ণা, মাছুরার বিষয়টিও তাই। বাংলাদেশ ফুটবলের কিংবদন্তি শেখ মোহাম্মদ আসলামের মতে, ‘এই মেয়েরা তো অনেকবারই নিজেদের প্রমাণ করেছে। তাদের তো নিজেদের নতুন করে প্রমাণের কিছু নেই। এরা আমাদের সোনার মেয়ে। দীর্ঘসময় এই মেয়েরা জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছে। দেশকে অনেক সাফল্য এনে দিয়েছে। তাদের বিদায়টা কেন এত করুণ হবে, আমি এটাই ভেবে পাই না। আমি বলব তাদের যেন যোগ্য সম্মান দেওয়া হয়।’
কাছ থেকে দেখা হয়নি বলে ইংলিশ কোচ পিটার বাটলারের কোচিং দর্শন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি আসলাম। তবে হাই প্রোফাইল কোচ বলে তাকে নারী ফুটবলের হর্তাকর্তা বানিয়ে দেওয়ার পক্ষে নন এই কিংবদন্তি, ‘আমি বলব তাকে (বাটলার) যেন আরও চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যে রাখে বাফুফে। যেন প্রয়োজনে লাগামটা টেনে ধরা যায়।’
এদিকে জাতীয় দল গতকাল থেকে এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি শুরু করেছে। জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রথম দিনের অনুশীলন সেরেছে তারা। সকালে অনুশীলন হলেও বাফুফে প্রথমিক দল জানিয়েছে রাতে। পিটার বাটলার ২৯ জন ফুটবলারকে প্রাথমিক দলে ডেকেছেন। সেই তালিকায় সাবিনা, কৃষ্ণা, মাছুরাদের নাম নেই। তা ছাড়া বাটলার জাতীয় দলকে ঢাকায় রেখে অনূর্ধ্ব-১৯ দল নিয়ে নেপাল গেছেন। উদ্দেশ্য–সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ। অর্থাৎ এশিয়ান কাপের আগে জাতীয় দলের প্রস্তুতির চেয়ে যেন বয়সভিত্তিক দলই বাটলারের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। এ নিয়েও ফুটবলাঙ্গনে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।