ইন্টারনেটের দুনিয়ায় গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী সার্চ ইঞ্জিন গুগল তাদের দীর্ঘদিনের আইকনিক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার করছে। এর প্রধান কারণ হলো, ব্যবহারকারীদের দিন দিন বাড়তে থাকা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘ অনুরোধ।
গুগল সার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট রবি স্টেইন সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, মানুষ এখন এমন সব কঠিন প্রশ্ন করছে যার কোনো নির্দিষ্ট বা সরাসরি উত্তর ইন্টারনেটের কোথাও এককভাবে নেই। এই নতুন চাহিদা মেটাতে গুগল এখন কাস্টম ভিজ্যুয়াল, ইন্টারঅ্যাক্টিভ গ্রাফিক্স ও সরাসরি সার্চ পেজের মধ্যেই মিনি-অ্যাপ চালানোর মতো ফিচার নিয়ে কাজ করছে। এটি গুগলের গত ২৫ বছরের ইতিহাসে সার্চ ইঞ্জিনের সবচেয়ে বড় আপডেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ এখন আর আগের মতো সংক্ষিপ্ত বা সাধারণ কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে কিছু খুঁজছে না। তারা এখন চ্যাটজিপিটির মতো এআই অ্যাপগুলোর আদলে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সার্চ করতে শুরু করেছে। আগে মানুষ দুই থেকে তিনটি শব্দের মাধ্যমে কোনো কিছু খুঁজত। এখন ৫ থেকে ১০, এমনকি ১১ শব্দের দীর্ঘ বাক্যে পরিণত হয়েছে অনুরোধ।
এসইও ও মার্কেটিং-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান সেমরাস তাদের বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ইন্টারনেটে কথোপকথনের ভঙ্গিতে খোঁজার হার ৫ শতাংশ থেকে অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এখনো অনেকে তিন শব্দের প্রথাগত পদ্ধতিতে সার্চ করছেন। অবশ্য দীর্ঘ বাক্যের সার্চের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
গুগল ও চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণের মধ্যে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। সেমরাস প্রায় এক বিলিয়ন ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছে।
সেখানে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটির রেফারেল ট্রাফিকের ২০ শতাংশ সরাসরি গুগলে যায়। মানুষ সাধারণত সরাসরি কোনো তথ্য জানতে বা লেনদেনের প্রয়োজনে এখনো গুগল ব্যবহার করে।
অন্যদিকে দীর্ঘ কোনো তথ্যের সারসংক্ষেপ তৈরি করা, বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে জটিল তুলনা করা অথবা কোনো বিষয়ের খসড়া তৈরির জন্য মানুষ চ্যাটজিপিটির মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। গুগল তাদের সার্চ বক্স বড় করছে, যেন ব্যবহারকারীরা আরও বেশি টেক্সট লিখতে পারেন।
এর পাশাপাশি ছবি, ফাইল বা ব্রাউজার ট্যাব যুক্ত করে খোঁজার কাজকে আরও সহজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ছবি তুলে বা ফোনের স্ক্রিনে কোনো কিছু বৃত্ত দিয়ে মার্ক করে খোঁজার প্রবণতা গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এআই মোডে বা কথোপকথনমূলক সার্চের হার প্রতি প্রান্তিকে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।
এআইয়ের প্রভাব কেবল সার্চ ইঞ্জিনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এটি সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আইতানা লোপেজের মতো এআই তৈরি ইনফ্লুয়েন্সার বা প্রভাবশালী চরিত্ররা এখন বিপুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
লোপেজের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে দেখা যায়, তিনি গ্ল্যামারাস ইভেন্টে যাচ্ছেন, জিমে শরীরচর্চা করছেন বা বিউটি টিপস দিচ্ছেন। তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ ছুঁইছুঁই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, লোপেজ কোনো বাস্তব মানুষ নন। তিনি পুরোপুরি এআই দিয়ে তৈরি একটি চরিত্র।
বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে এই এআই চরিত্রদের সঙ্গে কাজ করতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। কারণ এই ডিজিটাল চরিত্রগুলো মানুষের চেয়ে অনেক সস্তা। যেকোনো নির্দিষ্ট প্রচারের জন্য এদের সহজেই প্রয়োজনমতো রূপান্তর করা যায়।
বিলিয়ন ডলার বয় নামের একটি সংস্থার তথ্যমতে, প্রায় ৮০ শতাংশ বিপণনকারী এখন এআই-তৈরি কন্টেন্টের পেছনে তাদের বাজেট বাড়িয়েছেন।
অনলাইন কেনাকাটার জগতেও এআই এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব ঘটাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের রিটেইল বা খুচরা কেনাকাটার সাইটগুলোতে এআই পরিষেবার মাধ্যমে আসা ট্রাফিক প্রায় ৩৯৩ শতাংশ বেড়েছে। গুগল এই সপ্তাহে একটি বিশেষ ‘ইউনিভার্সাল শপিং কার্ট’ চালু করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটের বিভিন্ন আলাদা দোকানের পণ্য একটিমাত্র কার্টে যুক্ত করতে পারবেন।
অন্যদিকে অ্যামাজন তাদের ‘রুফাস’ নামক শপিং অ্যাসিস্ট্যান্টকে ‘অ্যালেক্সা ফর শপিং’ টুলের অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে ক্রেতারা সার্চ বারেই এআইকে পণ্যের গুণমান যাচাই বা দামের ইতিহাস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারছেন। মেটা এবং ওপেনএআইও পিছিয়ে নেই, তারাও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শপিং টুল যুক্ত করছে।
এআইয়ের এই দ্রুত বিস্তার মানুষের মনে একধরনের উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মানুষের চাকরি কমে যাওয়া, তথ্যের নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। তবে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া অধ্যাপক জোসেফ টুরো মনে করেন, এআই এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, এআইয়ের দেওয়া সরাসরি উত্তরের কারণে অনেক সময় মানুষ মূল ওয়েবসাইটের লিংকে ক্লিক করছে না। এতে ওয়েবসাইটে সরাসরি ট্রাফিক কমলেও এসইও বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। তাদের মতে, ট্রাফিক কমলেও যারা ওয়েবসাইটে আসছেন, তারা অনেক বেশি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আসছেন। ফলে কেনাকাটা সম্পন্ন করা বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করার হার আগের চেয়ে বেড়েছে।
এআই বর্তমান ইন্টারনেটের রূপরেখাকে এমনভাবে পরিবর্তন করছে যে আগামী ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ডিজিটাল পৃথিবীতে রূপ নিতে পারে। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সূত্র: সিএনএন