ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার- বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নগরী, যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ইসলামি স্থাপত্য বহুকাল ধরেই এক অনন্য সৌন্দর্যে মিলেমিশে আছে। ১৯৮৩ সাল থেকে কয়েকটি ধাপে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো সুলতানি আমলের নগর মুহাম্মদাবাদ, যেখানে একসময় ছিল টাঁকশালের শহর, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং অসংখ্য মসজিদ, দিঘি ও পুরাকীর্তি। আরেক তথ্যমতে, বারোবাজারের প্রাচীন নাম ছিল ছাপাইনগর।
মাত্র পাঁচ থেকে ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাওয়া গেছে প্রাচীন আমলের ১৫টিরও বেশি মসজিদ; যার কারণে ঢাকা শহর এবং বাগেরহাট জেলার পর বাংলাদেশের তৃতীয় ‘মসজিদের শহর’ হিসেবে বারোবাজারকে অনায়াসেই বলা যায়। অনেকেই বারোবাজারকে দিঘি ও পুরাকীর্তির শহর বলে থাকেন।
তাই একদিনের ট্যুর প্ল্যান করে গিয়েছিলাম বারোবাজারে। ১৭ অক্টোবর ২০২৫, দিনটি ছিল শুক্রবার। যশোর জেলা হয়ে খুব সহজেই সকালে পৌঁছে গেলাম বারোবাজারে। জুমার নামাজের আগ পর্যন্ত যেসব মসজিদ এক্সপ্লোর করেছি, সেগুলোর সংক্ষিপ্ত তথ্য এখন একে একে শেয়ার করছি-
পাঠাগার মসজিদ
এই মসজিদ থেকেই দিনের মিটআপ শুরু। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব, যার মাঝেরটি অর্ধবৃত্তাকৃতির। মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট এবং পাশেই রয়েছে একটি দিঘি। জনশ্রুতি আছে- সুলতানি আমলে এই মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার, যা থেকে এর নামকরণ।
নুনগোলা মসজিদ
হাসিলবাগ এলাকায় অবস্থিত বর্গাকৃতির এই মসজিদে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি তুলনামূলক বড়। বাইরের দেয়ালে জ্যামিতিক কারুকাজ চোখে পড়ে। এটি একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক স্থাপনা।
শুকুর মল্লিক মসজিদ
বারোবাজারে আবিষ্কৃত সবচেয়ে ছোট এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকার মসজিদ। অনেকে বলেন, এটির নির্মাণশৈলী ঢাকার প্রথম মসজিদ- বিনত বিবির মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব।
পীর পুকুর জামে মসজিদ
১৫ শতকে নির্মিত এই মসজিদটি একসময় মাটিচাপা ছিল। এটি ছিল ১৫ গম্বুজবিশিষ্ট—বর্তমানে যা ধ্বংসাবশেষ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। নির্মাণশৈলী ইঙ্গিত করে, এটি সুলতানি আমলের একটি অনন্য স্থাপনা। পূর্বদিকে রয়েছে বিশাল পুকুর, যা এলাকার মানুষের কাছে পীর পুকুর নামে পরিচিত।
সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ
এই মসজিদেই জুমার নামাজ আদায় করা হয়। বারোবাজারে আবিষ্কৃত মসজিদগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীন মসজিদ। এর গম্বুজ ছিল মোট ৩৫টি এবং পশ্চিম দেয়ালে ছিল কারুকার্যখচিত সাতটি মেহরাব। নির্মাণশৈলীর ভঙ্গিমায় বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের প্রভাব স্পষ্ট।
চেরাগদানী জামে মসজিদ
এটি ব্যাপক সংস্কার হওয়ায় মূল স্থাপত্যশৈলী হারিয়ে গেছে। তবে মসজিদের পাশের বড় দিঘিটি এখনো ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে রয়ে গেছে।
জোড়বাংলা মসজিদ
৮০০ হিজরিতে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। ছোট আকারের ইট দিয়ে গড়া এই মসজিদে রয়েছে তিনটি মেহরাব। বাইরের দেয়ালে রয়েছে সূক্ষ্ম অলংকরণ। নির্মাতা ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের ছেলে শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে নুসাই।
উত্তর বেলাট জামে মসজিদ
এটি আধুনিক নকশায় নির্মিত তিনতলাবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। আকাশি ও সাদা রঙের সমন্বয় মসজিদটিকে আরও মনোরম করেছে। আধুনিক ইসলামিক স্থাপত্যের ছোঁয়া রয়েছে সর্বত্র।
গলাকাটা মসজিদ
সুলতানি আমলের অপরূপ স্থাপত্যশিল্প। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব, ছয়টি মাঝারি গম্বুজ এবং ভেতরে কালো রঙের দুটি বৃহৎ স্তম্ভ রয়েছে। বিশেষত্ব হলো- এখানে এখনো সংরক্ষিত আছে সেই আমলের তরবারি, হাতে লেখা কোরআন শরিফসহ মূল্যবান সামগ্রী।
মনোহর মসজিদ
বারোবাজারে আবিষ্কৃত দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। একসময় ভেতরে ছিল ২৪টি থাম, যা ধ্বংস হয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, এখানে ৩৫টি গম্বুজ ছিল।
গোড়ার মসজিদ
বারোবাজারের সবচেয়ে অলংকৃত মসজিদ। ১৫ শতকে নির্মিত এই স্থাপনায় রয়েছে শৈল্পিক টেরাকোটার কাজ। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব এবং মোট চারটি গম্বুজ- একটি বড় ও তিনটি ছোট।
কীভাবে যাবেন
রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের যেকোনো জেলা থেকে খুব সহজেই মসজিদের শহর বারোবাজারে পৌঁছানো যায়। আমি কীভাবে বারোবাজারে গিয়েছিলাম, তা সংক্ষেপে বলছি- ঢাকা থেকে রাতে বাসে যশোরের উদ্দেশে রওনা দিই। এরপর অটোরিকশায় পালবাড়ি বাসস্টপে পৌঁছে যাই। সেখান থেকে গড়াই বা রূপসা লোকাল বাসে চড়ে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটের যাত্রায় পৌঁছে যাই বারোবাজারে।
সতর্কতা
যশোরের বারোবাজারের প্রাচীন মসজিদ ঘুরে দেখা একটি অনন্য অভিজ্ঞতা হলেও এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান হওয়ায় কিছু সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমেই পোশাক-পরিচ্ছদে শালীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন। পুরো স্থানে নীরবতা বজায় রাখা দরকার, কারণ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা বা হাসাহাসি পরিবেশের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারে। নামাজের সময় মসজিদে প্রবেশ না করাই শ্রেয়; নামাজ আদায়রত মানুষদের বিরক্ত না করে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা উচিত। বারোবাজারের প্রায় সব মসজিদই শত শত বছরের পুরোনো, তাই স্থাপনার গায়ে হাত দেওয়া, দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়ানো কিংবা কোনো অংশে ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে, এতে প্রাচীন স্থাপনার ক্ষতি হতে পারে।
মসজিদের ভেতরে জুতা পরে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ, তাই নির্দিষ্ট স্থানে জুতা রেখে ভেতরে যেতে হবে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- আবর্জনা ফেলা বা খাবারের প্যাকেট ছড়িয়ে রাখা একেবারেই অনুচিত। ছবি তোলার সময় সচেতন থাকার প্রয়োজন রয়েছে। মানুষের বা নামাজ আদায়রত কারও ছবি তোলা উচিত নয় এবং ফ্ল্যাশ বা ড্রোন ব্যবহারে অনেক জায়গায় নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। স্থানীয় মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোও ভ্রমণ শিষ্টাচারের একটি অংশ- তাদের বাড়িঘর বা ব্যক্তিগত স্থানের ছবি তুলতে হলে আগে অনুমতি নেওয়া ভালো। শেষত, বারোবাজারের কিছু পথ অসমান হওয়ায় হাঁটার সময় সতর্ক থাকতে হবে এবং সন্ধ্যার পর আলোর স্বল্পতা তৈরি হয়, তাই দিনের আলোতেই ভ্রমণ শেষে ফেরা ভালো। এসব সতর্কতা মেনে চললে বারোবাজারের পুরোনো মসজিদ ভ্রমণ আরও নিরাপদ, আরামদায়ক এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ হবে।
শেষকথা
জ্ঞান অর্জনের বড় দুটি উপায় হলো বই পড়া এবং ভ্রমণ করা। তবে দ্বিতীয়টি আমার বেশি পছন্দের। পুরোনো স্থাপনা বিশেষ করে মসজিদ, রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি ইত্যাদি জায়গাগুলো সব সময় আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। আরও বলতে গেলে, ‘অদেখা এবং প্রাচীনকে খুঁজে বেড়াই আমি’।



